দশম খণ্ড
তত্তিরীয়োপনিঃদ্
শঙ্করভাষ্য-সমেতা।
( দ্বিতীয় ভাগ)
কড়ক
অনূদিত ও সম্পাদিত।
প্রকাশক শ্রীক্ষীরোদ চন্দ্র মজুমদার। ২১,১ ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা। সন ১৩৩২ সাল।
All rights reserved. |
ভগবৎকৃপায় আজ অনেক দিন পর তৈত্তিরীয় উপনিষদের দ্বিতীয় ভাগ মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইল; এবং এই খণ্ডেই তৈত্তিরীয় উপনিষদ সমাপ্ত হইল। প্রকাশকের পরিবর্তনই এরূপ অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটিবার প্রধান কারণ। পূর্ব্বে শ্রীযুক্ত অনিলচন্দ্র দত্ত মহাশয় উপনিষদের প্রকাশক ছিলেন, এখন তাঁহার নিকট হইতে স্বনামখ্যাত প্রসিদ্ধ পুস্তক-প্রকাশক শ্রীযুক্ত আশুতোষ দেব মহাশয় উপ- নিষদ্ প্রকাশের সম্পূর্ণ ভার গ্রহণ করিয়াছেন। এখন হইতে তিনিই অবশিষ্ট উপনিষদ্গুলির মুদ্রণ ও প্রকাশ কার্য্য সম্পাদন করিবেন। আশা করি, সহৃদয় পাঠকবর্গ এখনও পূর্ব্বের ন্যায়, উপনিষৎপাঠে অনুরাগ-প্রদর্শনপূর্ব্বক আমাদের কার্য্যে উৎসাহ প্রদান করিতে কৃপণতা করিবেন না। ইহার পর আমরা শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ প্রকাশ করিব।
আলোচ্য তৈত্তিরীয় উপনিষদখানি কৃষ্ণচতুর্ব্বেদীয় তৈত্তিরীয় শাখার অন্তর্গত ব্রাহ্মণোপনিষদ্। একই যজুর্ব্বেদ যে, শুক্র কৃষ্ণভেদে দ্বিবিধ, তাহা আমরা ঈশোপনিষদের ভূমিকা-মধ্যে বিস্তৃতভাবে বিবৃত করিয়াছি।
তৈত্তিরীয় উপনিষদখানি তিন ভাগে বিভক্ত হইয়াছে। সেই ভাগগুলি বল্লী নামে অভিহিত। তন্মধ্যে প্রথম ভাগের নাম শিক্ষাবল্লী, দ্বিতীয় ভাগের নাম ব্রহ্মানন্দবল্লী, তৃতীয় ভাগের নাম ভৃগুবল্লী। শিক্ষাবল্লীতে প্রধানতঃ বর্ণাদির উচ্চারণ প্রণালী, উদাত্তাদি স্বরচিন্তা, এবং বর্ণাদি-উচ্চারণের অনুকূল কণ্ঠতালু প্রভৃতি স্থানগত প্রযত্ন-বিশেষ ও তদুপযোগী আরও অনেক বিষয় বর্ণিত হইয়াছে। পাঠকগণ মনে করিতে পারেন যে, উপনিষদ্ শাস্ত্র-অর্থ- প্রধান; সুতরাং তদ্বিষয়েই মনোনিবেশ করা আবশ্যক; ঔপনিষদ শব্দোচ্চারণ যে-কোন প্রকারে করিলেই চলিতে পারে, সেই ভ্রান্ত-ধারণা দূরীকরণার্থই উপনিষদের মধ্যে এই শিক্ষাবল্লীর সমাবেশ করা আবশ্যক হইয়াছে। বুঝিতে হইবে, সংহিতা-ভাগের ন্যায় উপনিষদ্ভাগেরও শব্দোচ্চারণের পারিপাট্য পরিজ্ঞান থাকা একান্ত আবশ্যক; নচেৎ শব্দ-শক্তি কখনও তাহার নিকট আত্মপ্রকাশ করে না। এইজন্যই প্রথমে শিক্ষাবিষয়ক উপদেশ পরিসমাপ্ত করিয়া, তৃতীয় অনুবাক হইতে অধিলোকাদি-ভেদে সগুণ ব্রহ্মবিষয়ক বিবিধ উপাসনা প্রণালী প্রদর্শিত হইয়াছে।
দ্বিতীয় ব্রহ্মানন্দবল্লীতে প্রধানতঃ সর্ব্বানর্থের নিদানভূত অজ্ঞান নিবৃত্তির উদ্দেশ্যে সর্ব্বোপাধিবিনির্ম্মুক্ত আত্মদর্শনের কথা উত্তমরূপে বিবৃত করা হইয়াছে। অধিকন্তু, অন্নময় প্রভৃতি যে পঞ্চ কোশে আবৃত থাকায় নিত্যনিরাময় চিদানন্দ ব্রহ্মস্বরূপ আত্মাও আপনার স্বরূপ পরিজ্ঞানে বিমূঢ় হইয়া আছে, সেই পঞ্চ কোশের স্বরূপ ও স্বভাবাদি প্রদর্শনপূর্ব্বক বিবেক-জ্ঞানের পথ নিষ্কণ্টক- ভাবে উন্মুক্ত করা হইয়াছে।
অতঃপর, ভৃগুবল্লী নামক তৃতীয় অধ্যায়ে পিতা-পুত্রের উপাখ্যানচ্ছলে ব্রহ্ম- বিদ্যা বর্ণিত হইয়াছে। ব্রহ্মজিজ্ঞাসু পুত্র ভৃগু নিজের পিতা বরুণের নিকট যাইয়া ব্রহ্মতত্ত্ব জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, এবং পুত্রবৎসল পিতা বরুণ আপনার প্রিয়- পুত্রকে যথাযথভাবে ব্রহ্মবিদ্যার স্বরূপ ও রহস্য অতি উত্তমরূপে বুঝাইয়া দিয়া- ছেন। আখ্যায়িকাচ্ছলে বিবৃত হওয়ায় বিষয়ের জটিলতা অপেক্ষাকৃত মন্দী- ভূত হইয়াছে, এবং অপরাপর জিজ্ঞাসুগণের পক্ষেও ব্রহ্মবিদ্যা বুঝিবার পক্ষে বিশেষ সুবিধা হইয়াছে।
উপনিষদের মধ্যে তৈত্তিরীয় উপনিষদ্ অনতিবিস্তীর্ণ হইলেও সারবান্ ও প্রামাণিক গ্রন্থ। জগদ্গুরু শঙ্কর প্রভৃতি আচার্য্যগণ ইহাকে অবিসংবাদিত প্রমাণরূপে গ্রহণ করিয়াছেন। ইহার বিষয়-সংকলন-প্রণালী অতি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল। যেরূপভাবে বক্তব্য বিষয় বর্ণনা করিলে জিজ্ঞাসুগণ অনায়াসে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে, এই উপনিষদে ঠিক সেই ভাবেই বিষয়গুলি ব্যাখ্যাত হইয়াছে; তাহার ফলে গ্রন্থের উপাদেয়তা ও লোকপ্রিয়তা সমধিক বৃদ্ধি পাইয়াছে। শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য ইহার উপর ভাষ্য-ব্যাখ্যা রচনা করিয়া ইহাকে আরও উজ্জ্বল ও গৌরবময় করিয়াছেন। সহৃদয় পাঠকগণ নিজেরাই একথার সত্যতা উপলব্ধি করিতে পারিবেন; সুতরাং এ সম্বন্ধে আমার আর অধিক কথা বলিবার প্রয়োজন নাই। ইতি—
শ্রীদুর্গাচরণ সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ।
ভবানীপুর, ভাগবত চতুষ্পাঠী।
৩য় মাঘ—১৩৩২।
| বিষয় | পৃষ্ঠা |
|---|---|
| ১। | মঙ্গলাচরণ......... ৯।১. |
| ২। | শিক্ষার ব্যাখ্যা—বর্ণ ও স্বরাদি কখন...... ১৩।১. |
| ৩। | সংহিতার উপনিষদ্ কখন...... ১৬।১. |
| ৪। | জ্যোতিঃ, বিদ্যা, প্রজ্ঞা ও অধ্যাত্মাদি উপাসনা নির্দেশ... ১৯।১. |
| ৫। | শ্রী ও মেধাবর্দ্ধক জপনীয় কতিপয় মন্ত্র প্রদর্শন... ২২।১২ |
| ৬। | স্বারাজ্য ফলের জন্য ব্যাহৃতিরূপে ব্রহ্মোপসনা... ৩০।১. |
| ৭। | সাক্ষাৎসম্বন্ধে ব্রহ্মোপলব্ধির স্থান—হৃদয়াকাশের বিষয় বর্ণন ৩৭।৮. |
| ৮। | ব্যাহৃতিরূপী ব্রহ্মের পঙ্ক্তি-পৃথিব্যাদিরূপে উপাসনা কখন ৪৩।৮. |
| ৯। | সর্ব্বোপাসনার অঙ্গভূত প্রণবোপাসনার বিধান... ৪৭।১. |
| ১০। | পূর্ব্বোক্ত উপাসনায় অসমর্থ বা অকৃতকার্য্য ব্যক্তির পক্ষে অবশ্য অবলম্বনীয় কর্ম্মের বিধান... ৫০।১. |
| ১১। | পূর্ব্বোক্ত সাধনানুষ্ঠানে নিতান্ত অসমর্থের পক্ষে অবশ্য পঠণীয় মন্ত্র কখন...... ৫৪।১ |
| ১২। | ব্রহ্ম-জ্ঞান লাভের পূর্ব্বে সমাবর্তনাভিলাষী শিষ্যের প্রতি আচার্য্যকর্তৃক অবশ্য পালনীয় কতিপয় কার্য্যের উপদেশ ব্রহ্মানন্দবল্লী। ৫৭।১ |
| ১। | মঙ্গলাচরণ......... ৭৯।১- |
| ২। | নিরুপাধিক আত্মদর্শনের উপদেশ এবং উনুদ্দেশ্যে আকাশাদি সৃষ্টিক্রম বর্ণনা ও পুচ্ছ ব্রহ্মের স্বরূপ নির্দেশ... ৮১।৮ |
| ৩। | অন্নময়াদি পঞ্চকোশের সহযোগে পক্ষিরূপে আত্মনিদ্দেশ... ১০৬।১ |
| ৪। | জগতের সৃষ্টিপূর্ব্বকালীন অবস্থা-নির্দেশপূর্ব্বক ব্রহ্মের সর্ব্বা- শ্রয়ত্ব কথন... ১৪৯।১১ |
| ৫। | ব্রহ্মের সর্ব্বনিয়স্তত্ব কথন এবং সর্ব্বাতিশয় আনন্দরূপতা জ্ঞাপন ১৫৬।২২ |
| ৬। | ব্রহ্মের অজ্ঞেয়তা কথন... ১৭৯।১৫ |
| ভৃগুবল্লী।.. | |
| ১। | মঙ্গলাচরণ ও ভৃগু-বরুণ সংবাদ—ব্রহ্মেরতটস্থ লক্ষণ নির্দেশ ১৮৪।১ |
| ২। | তপস্যার ব্রহ্মজ্ঞানসাধনতা ও তপঃপ্রভাবে অন্ন-প্রাণাদিরূপে ভৃগুর ব্রহ্মবিজ্ঞান লাভ...... ১৮৯।১ |
| ৩। | অন্ননিন্দার দোষ কখন এবং অন্নসঞ্চয়ের উপযোগিতা ও বিনিয়োগ ব্যবস্থা প্রদর্শন...... ১৯৫।২০ |
| ৪। | অতিথি-সংকার ও অতিপিকে অন্নদানের প্রশংসা... ১৯৯।২৪ |
| ৫। | বাক্ প্রভৃতিতে ক্ষেমাদিভাবে ব্রহ্মচিন্তার উপদেশ... ২০২।৫ |
| ৬। | ‘নম’ ইত্যাদিরূপে আত্মচিন্তা ও তাহার মহিমা কথন... ২১৩।৯ |
অপাধিজ্যোতিসং..., ১৯ অথাধিবিদ্যং... ১৯ অথাধিপ্রজং... ১৯ অধ্যাত্মম্... ২০ অন্নং ন নিন্দ্যাৎ... ১৯৫ অন্নং ন পরিচক্ষীত... ১৯৭ অন্নং বহু কুব্বীত... ১৯৮ অন্নং ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ... ১৮৯ অন্নাদ্বৈ প্রজাঃ... ১০৬ অসদা ইদমগ্র আসীৎ... ১৪৯ অসন্নেব স ভবতি... ১৩০ অহংবৃক্ষস্য রেরিবা... ৫৪ অহমন্নমহমন্নম্... ২১৩ আ আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ ১৯৩ আবহন্তী বিতশ্বানা... ২৫ আমায়ন্ত...... ১৬ ঋ ঋতং চ স্বাধ্যায়-প্রবচনে... ৪৯ ও ওমিতি ব্রহ্ম... ৪৭ ত তন্নম ইত্যুপাসীত... ২০৬ দ দেব-পিতৃকার্য্যাভ্যাং... ৬১ ন ন কংচন বসতো... ১৯৯ প পৃথিব্যন্তরিক্ষং... ৪৩ প্রাণংদেবা অনুপ্রাণন্তি.. ১১৩ প্রাণো ব্রহ্মেতি... ১৯০ ব ব্রহ্মবিদাগ্নোতিপর,... ৮১
ভীষাস্মাদ্বাতঃ... ১৫৬ ভূর্ভবঃ সুবরিতি... ৩০ ভুগুর্বৈ বারুণিঃ... ১৮৪ ম মনোব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ... ১৯১ মহ ইতি ব্রহ্ম...... ৩১ মহ ইত্যাদিত্যঃ... ৩১ ষ য এবংবেদ...... ২০২ যতো বাচো নিবর্তন্তে... ১১৯ যতো বাচো নিবর্তন্তে... ১৭৯ যশ ইতি পশুষু... ২০৪ যশো জনেহসানি... ২৭ যশ্চন্দসামৃষভো... ২২ যে তত্র ব্রাহ্মণাঃ সম্মশিনঃ... ৬৩ ব বিজ্ঞানং ব্রহ্মেতি... ১৯১ বিজ্ঞানং যজ্ঞং তনুতে... ১২৩ বেদমনূচ্যাচার্য্যো...... ৫৭ শ শং নো মিত্রঃ... ৯৭ শং নো মিত্রঃ... ৭৭ শীক্ষাং ব্যাখ্যাস্যামঃ... ১৩ শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য... ১৫৭ ““... ১৫৭ স স একো মনুষ্যগন্ধর্ব্বাণা... ১৫৬ স য এবংবিদ্...... ২১০ স য এষোহন্তহৃদয়... ৩৭ স যশ্চায়ং পুরুষে... ১৫৭ সহ নাববতু...... ৭৯ সহ নৌ যশঃ... ১৬ সুরবিত্যাদিত্যে... ৩৯ সমাপ্রা।
বিশিষ্ট আনন্দময় ব্রহ্মাত্মা যখন প্রত্যক্ষতই অনুভবগোচর, তখন তদ্বিষয়ে ‘ব্রহ্ম নাই বলিয়া কোন আশঙ্কাই আসিতে পারে না; সুতরাং আশঙ্কা- নিবৃত্তির জন্য ‘কোন লোক ব দ ব্রহ্মকে অসৎ বলিয়া জানে, তবে সে নিজেই অসৎ হইয়া পড়ে;[কারণ, ব্রহ্মই ত আত্মা।’ এই ‘মন্ত্রের উল্লেখ করা সঙ্গত হয় না। তাহার পর, ‘ব্রহ্মই প্রতিষ্ঠা পুচ্ছ’ এই বাক্যে ব্রহ্মের যে, প্রতিষ্ঠারূপে পৃথক্ উল্লেখ, তাহাও যুক্তিসঙ্গত হয় না। অতএব এই আনন্দময় পদার্থ বস্তুতঃ কার্য্যশ্রেণীরই অন্তর্গত, ঠিক পরমাত্মা নহে। ৩
উপাসনা ও কর্ম্মের ফল স্বরূপ যে, আনন্দ, তাহারই বিকার বা পরিণাম হইতেছে আনন্দময়। সেই আনন্দময় কোশটী বিজ্ঞানময় কোশেরও অভ্যন্তর- বর্তী; কেন না, শ্রুতিতে বিজ্ঞানময়কে যজ্ঞাদি কর্ম্মের হেতু বলা হইয়াছে; কাজেই কর্ম্মফল আনন্দের বিকারভূত আনন্দময় কোশটী বিজ্ঞানময়েরও অন্তর হওয়াই উচিত। কেন না, জ্ঞান ও কর্ম্মের ফল সাধারণতঃ ভোক্তার জন্যই সৃষ্ট হইয়া থাকে; সুতরাং ভোক্তা সর্ব্বাপেক্ষা পরবর্তী, অতএব আনন্দময় আত্মাও পূর্ব্ববর্তী সমস্ত কোশ অপেক্ষা অন্তরতম। বিশেষতঃ প্রিয়মোদাদির লাভই বিদ্যা ও কর্ম্মের উদ্দেশ্য বা প্রয়োজন। প্রিয়াদি প্রাপ্তির আশায়ই উপাসনা ও কর্ম্মের অনুষ্ঠান হইয়া থাকে। এই কারণে প্রিয়াদি ফলসমূহ স্বভাবতই আত্মার সন্নিহিত অর্থাৎ প্রিয়াদি ফলের সঙ্গে আত্মারই ঘনিষ্ট সম্বন্ধ, কাজেই ফল-সম্বন্ধ থাকায় বিজ্ঞানময় অপেক্ষাও ইহার।(‘আনন্দময়ের) অভ্যন্তরবর্ত্তিত্ব উপপন্ন হয়। কারণ, স্বপ্নসময়ে প্রিয়-মোদাদি বিষয়ক সংস্কারবিশিষ্টরূপেই এই আনন্দময় আত্মা বিজ্ঞানময় কোশে আশ্রিত বলিয়া অনুভূত হইয়া থাকে। ৪
অভীষ্ট পুত্রাদি-সন্দর্শন জনিত যে, প্রিয়: আনন্দ বিশেষ), তাহাই উক্ত আনন্দময় আত্মার শিরঃ অর্থাৎ মস্তকস্থানীয়, কেন না,[আনন্দের মধ্যে] উহাই প্রথম। প্রিয় বস্তু লাভে যে, হর্ষ উপস্থিত হয়, তাহার নাম মোদ।[তাহা তাহার দক্ষিণ পক্ষ]। উক্ত হর্ষই যখন[প্রিয়সম্ভব উপভোগ দ্বারা] উৎকর্ষ লাভ করিয়া থাকে, তখন প্রমোদ নামে অভিহিত হয়, তাহাই উহার] উত্তর পক্ষ। আনন্দ অর্থ সাধারণ সুখমাত্র। তাহাই প্রিয় প্রভৃতি সুধাংশসমূহের আত্মা, কেন না, উহা সমস্ত সুখেই অনুস্যুত(নিয়ত সম্বন্ধ) রহিয়াছে। আনন্দ অর্থ পরব্রহ্ম; কারণ, শুভ কর্ম্মের ফলে, পুত্রমিত্রাদি বিভিন্ন বিষয়ে উৎপন্ন উক্ত আনন্দস্বরূপ ব্রহ্ম অন্তঃকরণে প্রতিফলিত হইয়া থাকেন। অন্তঃকরণের বৃত্তিই, ব্যবহারক্ষেত্রে ‘সুখ’ বলিয়া প্রসিদ্ধ। স্বকৃত কর্ম্মই উক্তবিধ আনন্দ
১৭
বিষয়ে বৃত্তিসমুৎপাদক; সেই কৰ্ম্ম সাধারণতঃ অনবস্থিত অর্থাৎ ক্ষণিক; এই কারণে তদনুগত সুখও ক্ষণিক(অনিত্য)। তমোগুণের নিবারক তপস্যা, বিদ্যা(উপাসনা), ব্রহ্মবর্চ্চস(ব্রহ্মণ্য তেজঃ) ও শ্রদ্ধাদ্বারা সেই অন্তঃকরণ যে সময় নির্মলতা প্রাপ্ত হয়, সেই সময়ই সেই বিশুদ্ধ অন্তঃকরণে কোন কোন আনন্দ উৎকর্ষ প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ বিপুলতা প্রাপ্ত হয়। এই উপনিষদেও পরে বলিবেন যে, ‘তিনি রসস্বরূপ; এই জীব সেই রস লাভ করিয়াই আনন্দিত হয়। এই রসই অপরকে আনন্দিত করে; অপর সমস্ত ভূত(প্রাণী) এই আনন্দেরই অংশমাত্র উপভোগ করিয়া থাকে’ ইতি। এই প্রকার সিদ্ধান্তানুসারেই কামপ্রশমনের উৎকর্ষানুসারে উত্তরোত্তর আনন্দেরও শতগুণে উৎকর্ষ বলা হইবে(১)। ৫
এই ভাবে আপেক্ষিক উৎকর্ষসম্পন্ন আনন্দময় আত্মা অপেক্ষাও উক্ত ব্রহ্ম পর(শ্রেষ্ঠ), যে ব্রহ্ম ইতঃপূর্ব্বে ‘সত্য জ্ঞান ও অনন্ত লক্ষণান্বিত বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন, যাঁহার বোধ-সৌকর্য্যার্থ অন্নময় প্রভৃতি পাঁচটা কোণ উল্লিখিত হইয়াছে; যাহা সেই পঞ্চ কোশ অপেক্ষাও আভ্যন্তরীণ দুর্বিজ্ঞেয়, এবং যাহা দ্বারা সেই কোশ সমূহ আত্মবান্ হইয়া থাকে, সেই ব্রহ্মই পুচ্ছ স্বরূপ প্রতিষ্ঠা। সেই ব্রহ্মই অবিদ্যাকল্পিত সমস্ত দ্বৈত প্রপঞ্চের অবসানস্থান। যেখানে আর দ্বৈত সম্বন্ধ নাই সেই অদ্বৈত ব্রহ্মই সকলের প্রতিষ্ঠা। কেন না, আনন্দময় আত্মাও ঐ স্থানেই অভিন্নরূপে পরিসমাপ্ত হইয়া থাকে। অবিদ্যা কল্পিত সমস্ত দ্বৈত জগতের অবসান স্থান এক অদ্বিতীয় প্রতিষ্ঠা পুচ্ছস্বরূপ সেই ব্রহ্ম নিশ্চয়ই আছেন। সে বিষয়েও এই একটা শ্লোক আছে—॥ ৩২ ॥
ইতি ব্রহ্মানন্দবল্লী পঞ্চমানুব্যাক্যের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৫ ॥
অসন্নেব স ভবতি। অসদ্ ব্রহ্মেতি বেদ চেৎ। অস্তি ব্রহ্মেতি চেদ্বেদ। সন্তমেনং ততো বিদুরিতি। অস্তি ব্রহ্মেতি চেদ্বেদ। সন্তমেনং ততো বিদুারাতি। তস্যৈষ এব শারীর আত্মা, যঃ পূর্ব্বস্য। অথাতোহনুপ্রশ্নাঃ,- উতাবিদ্বানমুং লোকং প্রেত্য। কশ্চন গচ্ছতী ৩। আহো বিদ্বানমুং লোকং প্রেত্য। কশ্চিৎ সমন্নতা ৩ উ। সোহকাময়ত। -বহু স্যাং প্রজায়েয়েতি। স তপোহতপ্যত। স তপস্তপ্তা। ইদঞ্চ সর্বমসূজত। যদিদং কিঞ্চ। তৎ সৃষ্ট্বা। তদেবানুপ্রাবিশৎ। তদনুপ্রবিশ্য। সচ্চ ত্যচ্চাভবৎ। নিরুক্তঞ্চানিরুক্তঞ্চ। নিলয়নঞ্চানিলয়নঞ্চ বিজ্ঞানঞ্চবিজ্ঞানঞ্চ। সত্যঞ্চানৃতঞ্চ সত্যমভবৎ। যদিদং কিঞ্চ। তৎ সত্যমিত্যা- চক্ষতে। তদপ্যেষ শ্লোকো ভবতি ॥১ ॥৩৩॥
সরলার্থঃ-চেং যদি)[কশ্চিৎ] ব্রহ্ম অসৎ, অবিদ্যমানম্ আকাশ- কুসুমতুল্যং) ইতি বেদ;[তদা] সঃ(জ্ঞাতা) এব অসন্(অবিদ্যমানসমঃ) ভবতি,[আত্মনঃ বন্ধস্বরূপত্বাৎ]। তথা, চেৎ(যদি) ব্রহ্ম অস্তি(সৎ- বিদ্যমানম) ইতি বেদ, ততঃ এনং(সদ্বহবিজ্ঞানাদেব ব্রহ্মসত্ববেদিনং) সন্তৎ ‘বিদ্যমানং সত্যরূপিণং) বিদুঃ(বিজানীযুঃ) ইতি। যঃ(আনন্দময়ঃ), এষঃ এব তস্য পূর্বস্থ্য(বিজ্ঞানময়স্ত), শারীর:(শরীরে-বিজ্ঞানময়ে ভবঃ) আত্মা। অতঃ ‘যম্মাদেবং, তস্মাৎ), অপ(শিষ্যশিক্ষায়া অনন্তরম) অনু(আচার্য্যোক্ত্য-’ নন্তরম্) প্রশ্নাঃ(বক্ষ্যমানলক্ষণাঃ ভবন্তি)-কশ্চন(কশ্চিৎ) অবিদ্বান্ (অনাত্মস্থঃ)। উত(অপি; প্রেত্য(মৃত্যা) ‘অমং লোকং(পরমাত্মানং) গচ্ছতী গচ্ছতি, প্রশ্নার্থা পুতিঃ) ‘অথবা ন গচ্ছতি?]; আহো(অথবা) কশ্চিৎ বিদ্বান্ উত(প্রশ্নে) প্রেত্য অমৃং লোকং(পরমাত্মানং) সমশ্নতা(সমশ্নতে ভঙেক্ট)?[অথবা ন?]।[ এতদুত্তরার্থমুপক্রমতে ‘সোহকাময়ত’ ইত্যাদিঃ]। সঃ( পরমাত্মা)
অকাময়ত(ঐচ্ছৎ),[অহং] বহু(প্রভূতৎ) স্যাম্(ভবেয়ম্), প্রজায়েয় (উৎপন্নো ভবেয়ম্) ইতি।[অনন্তরং] সঃ(পরমাত্মা) তপঃ(জ্ঞানং) অতপ্যত(সৃষ্ট্যুপযোগিনং সংকল্পং) কৃতবান্ আলোচিতবানিত্যর্থঃ)। সঃ তপঃ তপ্ত।(পূর্ব্বোক্তরূপম্ আলোচ্য ইদং সর্ব্বম্ অসৃজত(উৎপাদিতবান্)। [কিং তৎ?] ইদং(চরাচরং) যৎ কিঞ্চ(যৎ কিমপি), তৎ সর্ব্বম্ অসৃজত ইত্যর্থঃ)। তৎ(চরাচরং জগৎ) সৃষ্ট্বা, তৎ এব অনুপ্রাবিশৎ(তত্রৈব প্রবিবেশ)। তৎ অনুপ্রবিশ্য সৎ(মূর্ত্তং আকৃতি বিশিষ্টং) চ, ত্যং(অমূর্ত্তং আকৃতিরহিতং) চ, নিরুক্তং(দেশ-কালাদিবিশিষ্টতয়া ইদমিথমিতি উত্তং) চ, অনিরুক্তং(তদ্বিপ- রীতং) চ, নিলয়নং(আশ্রয়স্থানং) চ, অনিলযনং(তদ্বিপরীতং) চ বিজ্ঞানং (বিশেষেণ জ্ঞানবৎ) চ অবিজ্ঞানং অচেতনং) চ, সত্যং(ব্যবহারিকং সত্যং) চ অন্যৎ(অসত্যং) চ[কিং বহুনা,] যং হদং কিঞ্চ, তৎ সর্ব্বং][যস্মাৎ] সত্যং(সত্যাখ্যং ব্রহ্ম) অভবৎ,[তস্মাৎ] তৎ। ব্রহ্ম) সত্যম্ ইতি আচক্ষতে (কথয়ন্তি)[ব্রহ্মবিদঃ]। তৎ ‘তস্মিন্ বিষযে অপি এষঃ শ্লোকঃ ভবতি ॥ ১৷৷৩৩৷৷
মূলানুবাদ। যদি কেহ ব্রহ্মকে অসৎ(অসত্য) বলিয়া জানে, তবে সে লোক নিজেই অসৎ(অসত্য বলিয়া প্রতিপন্ন) হয়;[কারণ, ব্রহ্ম ও আত্মা একই বস্তু; সুতরাং ব্রহ্ম অসৎ হইলে, আত্মাই অসৎ হইয়া পড়ে]। আর যদি কেহ ব্রহ্মকে সৎ বলিয়া জানে, তবে তাঁহাকেও পণ্ডিতগণ সৎ বলিয়াই জানেন। এই আনন্দ- ময় কোশই পূর্ব্বোক্ত ‘বিজ্ঞানময়ের’ শরীরাধিষ্ঠিত আত্মা।
[যেহেতু আত্মাই সত্য ব্রহ্ম;] সেইহেতু অতঃপর, আচার্য্য- প্রদত্ত উপদেশের পর শিষ্যগণের এই প্রকার প্রশ্ন হইয়া থাকে।— অবিদ্বান্ লোকও মৃত্যুর পর ঐ আত্মাকে প্রাপ্ত হয়? কিংবা প্রাপ্ত হয় না? অথবা বিদ্বান্ লোকও মৃত্যুর পর ঐ আত্মাকে লাভ করে? কিংবা করে না?[এখন উক্ত প্রশ্নের উত্তর প্রদানার্থ ভূমিকা করিতেছেন—]।
সেই পরমাত্মা কামনা করিলেন অর্থাৎ আলোচনা করিলেন— আমি বহু অনেক প্রকার হইব, এবং আমি উৎপন্ন হইব। তাহার
পর, তিনি তপস্যা করিলেন;(তপস্যা অর্থই জ্ঞান বা চিন্তা।) তিনি তপস্যা করিয়া এই চরাচর যাহা কিছু, তৎসমুদয় সৃষ্টি করিলেন। তিনি সে সমুদয় সৃষ্টি করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন। তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়া তিনি সৎ(মূর্ত্তিবিশিষ্ট) ও অসৎ(মূর্ত্তিহীন) হইলেন; এবং নিরুক্ত(দেশকালাদি পরিচ্ছন্নরূপে কথিত) ও অনিরুক্ত(পূর্ব্ববিপরীত), নিলয়ন(আশ্রয়স্থান) ও অনিলয়ন (অনাশ্রয় বস্তু), বিজ্ঞান(চেতন) ও অবিজ্ঞান(অচেতন), সত্য (ব্যবহারিক সত্য) ও অসত্যাদি এই যাহা কিছু, সেই সত্য ব্রহ্ম তৎসমুদয়রূপে প্রকটিত হইলেন। ব্রহ্ম এই সমস্তরূপে প্রকটিত হইয়াছেন বলিয়াই, ব্রহ্মবিদ্গণ তাঁহাকে ‘সত্য’ নামে অভিহিত করিয়া থাকেন। উক্ত বিষয়েও এইরূপ শ্লোক(মন্ত্র) আছে ॥১॥৩৩॥
শাঙ্কর-ভাষ্যম্। অসন্নের অসৎসম এব; যথা অসন অপুরুষার্থসম্বন্ধী, এবং স ভবতি অপরুষার্থসম্বন্ধী। কোহসৌ যঃ অসৎ অবিদ্যমান’ বন্ধ ইতি বেদ বিজানাতি, চেদ্ যদি। তদ্বিপর্যযেণ যৎ সর্ববিকল্পাস্পদং সর্বপ্রবৃত্তিবীজং সর্ববিশেষপ্রত্যস্তমিতমপি অস্তি তদ্বহ্মেতি বেদ চেৎ। কৃতঃ পুনবাশঙ্কা তন্না- স্তিত্বে? ব্যবহারাতীতত্বং ব্রহ্মণ ইতি কমঃ। ব্যবহারবিষয়ে হি বাচারম্ভণ- মাত্রে অস্তিত্বভাবিতবুদ্ধিঃ তদ্বিপরীতে ব্যবহারাতীতে নাস্তিত্বমপি প্রতিপদ্যতে। যথা ‘ঘটাদির্যব্যবহারবিষয়তয়োপপন্নঃ—সন, তদ্বিপবীতঃ অসন’ ইতি প্রসিদ্ধম, এবং তৎসামান্যাদিহাপি স্যাৎ ব্রহ্মণো নাস্তিত্বং প্রত্যাশঙ্কা। তস্মাদুচ্যতে—অস্তি ব্রহ্মেতি চেদ্বেদেতি।।
কিং পুনঃ স্যাৎ তদস্তীতি বিজ্ঞানতঃ? তদাহ-সন্তং বিদ্যমানং ব্রহ্মস্বরূপেণ পরমার্থসদাত্মাপন্নম এনম এবংবিদং বিদুঃ ব্রহ্মবিদঃ। ততঃ তস্মাদস্তিত্ববেদনাং সঃ অন্যেষাং ব্রহ্মবদ্বিজ্ঞেয়ো ভবতীত্যর্থঃ। অথবা যো নাস্তি ব্রহ্মেতি মন্যতে, স সর্ব্বস্যৈব সম্মার্গস্থ্য বর্ণাশ্রমাদিব্যবস্থালক্ষণস্থ্য নাস্তিত্বং প্রতিপদ্যতে; ব্রহ্মপ্রতি পত্যর্থত্বাত্তস্থ্য। অতো নাস্তিকঃ সঃ অসন্ অসাধুরুচ্যতে লোকে। তদ্বিপবীতঃ সন যঃ অস্তি ব্রহ্মেতি চেদ্বেদ, স তদ্ব্রহ্মপ্রতিপত্তিহেতুং সম্মার্গং বর্ণাশ্রমাদিব্যবস্থা-
লক্ষণং শ্রদ্দধানতয়া যথাবৎ প্রতিপদ্যতে যস্মাৎ, ততঃ তস্মাৎ সন্তং সাধুমাগস্থম এনং বিদুঃ সাধবঃ। তস্মাদস্তীত্যেব ব্রহ্ম প্রতিপত্তব্যমিতি ব্যাক্যার্থঃ ।২ শরীরে বিজ্ঞানময়ে ভবঃ শারীর আত্মা। এনং বিদুঃ সাধবঃ। তস্মাদত্যেতদার্থ তস্য পূর্ব্বস্থ্য বিজ্ঞানময়স্য এষ এব শরীরে বিজ্ঞানময়ে ভবঃ শারীর আত্মা। কোহসৌ? য এষ আনন্দময়ঃ। তৎ প্রতি নাস্ত্যাশঙ্কা নাস্তিত্বে। অপোচ- সর্ববিশেষদ্বাত্ত ব্রহ্মণো নাস্তিত্বং প্রত্যাশঙ্কা যক্তা; সর্ব্বসাম্যাচ্চ ব্রহ্মণঃ। যম্মাদেবম্, অতঃ তস্মাৎ অথ অন্য উত্তরং শ্রোতুঃ শিষ্যস্য অনুপ্রশ্নাঃ আচার্য্যোক্তিম অনু এতে পন্নাঃ। সামান্যং হি ব্রহ্ম আকাশাদিকারণত্বাৎ বিদুষঃ অবিদুষশ্চ। অতঃ অবিদু- যোহপি ব্রহ্মপ্রাপ্তিরাশঙ্ক্যতে --উত অপি অবিদ্বান্ অমং লোকং পরমাত্মানম্ ইতঃ প্রেত্য কশ্চন, চনশব্দঃ অপ্যর্থে, অবিদ্বানপি গচ্ছতি প্রাপ্নোতি? কিংবা ন গচ্ছতি? ইতি দ্বিতীয়োহপি প্রশ্নো দ্রষ্টব্যঃ, অনুপ্রশ্না ইতি বহুবচনাৎ। বিদ্বাংহং প্রত্যন্যৌ প্রশ্নৌ--যদ্যবিদ্বান্ সামান্যং কারণমপি বন্ধ ন গচ্ছতি, অতো বিদুষোহপি বন্ধাগমননাশঙ্ক্যতে; অতন্ত, প্রতি প্রশ্নঃ--আহো বিদ্বানিতি। উকারং চ বক্ষ্যমাণমধস্তাদপক্বস্য তকাবং চ পূর্ব্বস্মাৎ উত শব্দাদ্ব্যাসজ্য ‘আহো ইত্যেতস্মাৎ পূর্ব্বম্ উতশব্দং সংযোজ্য পৃচ্ছতি-উতাহো বিদ্বানিতি। ৩ প্রেত্য অমং লোকং সমশ্রুতে প্রাপ্নোতি। পূর্ব্বম্ উতশব্দং সংযোত। বিদ্বান্ ব্রহ্মবিদপি কশ্চিৎ ইতঃ প্রেত্য অমুৎ লোকং সমশ্নুতে প্রাপ্নোতি। সমশ্নুতে উ ইত্যেবং স্থিতে, অয়াদেশে যলোপে চকৃতে, অকারস্য প্লুতিঃ- সমশ্নুতা ৩উ ইতি। বিদ্বান্ সমশ্নুতে অমৃং লোকম্; কিংবা, যথা অবিদ্বান্, এবং বিদ্বানপি ন সমশ্নুতে ইত্যপবঃ প্রশ্নঃ। দ্বাবেব বা প্রশ্নৌ বিদ্বদবিদ্বদ্বিষয়ৌ; বহুবচনং তু সামর্থ্য প্রাপ্তপ্রশ্নান্তরাপেক্ষয়া ঘটতে। ‘অসদ্রহ্মেতি বেদ চেৎ’ ‘অস্তি ব্রহ্মেতি চেদ্বেদ’ ইতি শ্রবণাদস্তি নাস্তীতি সংশযঃ। ততোহর্থপ্রাপ্তঃ কিমস্তি নাস্তীতি প্রথমোহনুপ্রশ্নঃ। বন্ধণোহপক্ষপাতিত্বাৎ অবিদ্বান্ গচ্ছতি ন গচ্ছতীতি দ্বিতীয়ঃ। ব্রহ্মণ: সমত্বেইপি অবিদষ ইব বিদুষোহপ্যগমনমাশঙ্ক্য কিং বিদ্বান্ সমশ্নুতে ন সমশ্নুতে ইতি তৃতীয়োহনুপ্রশ্নঃ ।৪ সমস্যাতে। তত্রাস্তিত্বমের তাবদুচ্যতে। সমশ্নুতে ন সমশ্নুতে হিতং ‘এতেষাং প্রতিবচনাথ উত্তবো গ্রন্থ আবভ্যতে। তত্রাস্তিত্বমেব তাবদুচ্যতে। যচ্চোক্তৎ ‘সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম ইতি, তত্র চ কথং সত্যত্বমিত্যেতদ্বক্তব্যমিতি ইদমুচ্যতে। সব্বোক্ত্যৈব সত্যত্বমুচ্যতে। উক্তং হি সদেব সত্যমিতি; তস্মাৎ সব্বোক্ত্যৈব সত্যত্বমুচ্যতে। কপমেবমর্থতা অবগম্যতে অন্য গ্রন্থস্য? শব্দানুগমাৎ। অনেনৈব হ্যর্থেনান্বিতানি উত্তরবাক্যানি ‘তৎ সত্যমিত্যাচক্ষতে” “যদেব আকাশ আনন্দো ন স্যাৎ” ইত্যাদিনি।৫ কল্পাৎ? যদন্তি, তদ্বিশেষতো কণ আনন্দো ন ৩২ তব অসদেব ব্রহ্মত্যাশঙ্ক্যতে। কস্মাৎ? যদন্তি, তদ্বিশেষতো
গৃহ্যতে; যথা ঘটাদি। যন্নান্তি, তন্নোপলভ্যতে; যথা শশবিষাণাদি। তথা নোপলভ্যতে ব্রহ্ম, তস্মাদ্বিশেষতোহগ্রহণাৎ নাস্তীতি। তন্ন; আকাশাদিকারণত্বাদ ব্রহ্মণঃ, ন নাস্তি ব্রহ্ম। কস্মাৎ? আকাশাদি হি সব্বং কাৰ্য্যৎ ব্রহ্মণো জাতং গৃহ্যতে; যম্মাচ্চ জায়তে কিঞ্চিৎ, তদন্তীতি দৃষ্টং লোকে; যথা ঘটাম্বুরাদিকারণং মৃদ্বীজাদি; তস্মাদাকাশাদিকারণত্বাদস্তি ব্রহ্ম। ন চাসতো জাতং কিঞ্চিদ্ গৃহ্যতে লোকে কাৰ্য্যম্। অসতশ্চেৎ নামরূপাদি কার্য্যম্, নিরাত্মকত্বান্নোপলভ্যেত; উপলভ্যতে তু; তম্মাদস্তি ব্রহ্ম। অসতশ্চেৎ কাৰ্য্যং গৃহ্যমাণমপি অসদন্বিতমের স্যাৎ; নচৈবম্; তস্মাদস্তি ব্রহ্ম। তত্র “কথমসতঃ সজ্জায়েত“ইতিশ্রুত্যন্তরম্ অসতঃ সজ্জন্মাসম্ভবমশ্বাচষ্টে ন্যায়তঃ। তস্মাৎ সদেব ব্রহ্মেতি যুক্তম্।৬
তদ যদি মৃদ্বীজাদিবং কারণৎ স্যাৎ, অচেতনং তহি। ন; কাময়িতৃত্বাৎ। নচি কাময়িত্ব অচেতনমস্তি লোকে। সর্ব্বজ্ঞং হি ব্রহ্মেত্যবোচাম; অতঃ কাময়িতৃত্বোপপত্তিঃ। কাময়িতৃত্বাদম্মদাদিবদনাপ্তকামমিতি চেৎ; ন, স্বাতন্ত্র্যাৎ। যথা অন্যান পরবশীকৃত্য কামা দদোষাঃ প্রবর্তয়ন্তি, ন তথা ব্রহ্মণঃ প্রবর্তকাঃ কামাঃ। কথং তহি? সত্যজ্ঞানলক্ষণাঃ স্বাত্মভূতত্বাদ্বিশুদ্ধাঃ। ন তৈর্ব্রহ্ম প্রবর্ত্যতে, তেষান্ত তৎপ্রবর্তকং ব্রহ্ম প্রাণিকম্মাপেক্ষয়া। তস্মাৎ স্বাতন্ত্র্যং কামেযু ব্রহ্মণঃ; অতো ন অনাপ্তকামৎ ব্রহ্ম। সাধনান্তরানপেক্ষত্বাচ্চ। যথা অন্যেষামনাত্মভূতা ধম্মাদিনিমিত্তাপেক্ষাঃ কামাঃ স্বাত্মব্যতিরিক্ত-কাৰ্য্যকারণ- সাধনান্তরাপেক্ষাশ্চ, ন তথা ব্রহ্মণঃ। কিংতহি? স্বাত্মনোনহন্যাঃ। তদেতদাহ— সোহকাময়ত।৭
স আত্মা, যম্মাদাকাশঃ সম্ভুতঃ, অকাময়ত কামিতবান্। কথম্? বহু প্রভূতৎ স্যাং ভবেয়ম্। কথমেকস্যার্থান্তরাননুপ্রবেশে বহুত্বং স্যাদিতি? উচ্যতে-প্রজায়েয় উৎপদ্যেয়। নহি পুত্রোৎপত্তেরিবার্থান্তরবিষয়ং বহুভবনম্। কথং তহি? আত্মস্থানভিব্যক্ত-নামরূপাভিব্যক্ত্যা। যদা আত্মস্তেহনভিব্যক্তে নামরূপে ব্যাক্রি যেতে, তদা আত্মস্বরূপাপরিত্যাগেনৈব ব্রহ্মণোহপ্রবিভক্তদেশকালে সর্ব্বাবস্থান্ত ব্যাক্রিয়েরিতে। তদেতল্লামরূপব্যাকরণ ব্রহ্মণো বহু ভবনম্। নান্যথা নিববযবস্তু ব্রহ্মণো বহুদ্বাপত্তিরুপপদ্যতে অল্পত্বং বা, যথা আকাশস্যাল্লত্বং বহুত্বঞ্চ বস্তুন্তরকৃত মেব। অতঃ তদ্দ্বারেণৈবাাত্মা বহু ভবতি। নহি আত্মনোঽন্যদনাত্মভূতং তৎপ্রবিভক্তদেশকালং সূক্ষ্মং ব্যবহিতং বিপ্রকৃষ্টং ভূতং ভবদ্ভবিষ্যদ্বা বস্তু বিশ্বতে। অতো নামরূপে সর্ব্বাবস্থে ব্রহ্মণৈবাত্মবতা; ন ব্রহ্ম তদাত্মক। তে
তৎপ্রত্যাখ্যাণে ন স্ত এবেতি তদাত্মকে উচ্যেতে। তাভ্যাঞ্চোপাধিভ্যাং জ্ঞাতৃষ্ণের-জ্ঞানশব্দার্থাদি-সর্ব্বসংব্যবহারভাগ, ব্রহ্ম ॥৮ স আত্মা এবংকামঃ সন্ তপোতপ্যত। তপইতি জ্ঞানমুচ্যতে, “যস্য জ্ঞানময়ং তপঃ” ইতিশ্রুত্যন্তরাৎ। আপ্তকামত্বাচ্চ ইতরস্যাসম্ভব এব তপসঃ। তৎ তপঃ অতপ্যত তপ্তবান্, সৃজ্যমানজগদ্রচনাদিবিষয়ামালোচনামকরো- দাত্মেত্যর্থঃ। স এবমালোচ্য তপস্তপ্ত। প্রাণিকৰ্ম্মাদিনিমিত্তানুরূপমিদং সর্ব্বং জগৎ দেশতঃ কালতো নাম্না রূপেণ 5 যথানুভবৎ সর্ব্বৈঃ প্রাণিভিঃ সর্ব্বাবস্থৈরনুভূয়মানম্ অসৃজত সৃষ্টবান্। যদিদং কিঞ্চ-বৎ কিঞ্চেদমবিশিষ্টম্, তদিদং জগৎ সৃষ্ট্বা কিমকরোদিতি? উচ্যতে, তদেব সৃষ্টং জগৎ অনু- প্রাবিশদিতি।৯ তত্রৈতচ্চিন্ত্যম্- কথমনুপ্রাবিশদিতি। কিম্, যঃ স্রষ্টা, স তেনৈবাঘনানু- প্রাবিশৎ? “উত অন্যেনেতি? কিংতাবদ্ যুক্তম্? ক্বাপ্রত্যয়শ্রবণাৎ, যঃ স্রষ্টা, স এবানুপ্রাবিশদিতি। ননু ন সক্তং মৃদ্বচ্চেৎ কারণৎ ব্রহ্ম, তদাত্মকত্বাৎ কার্য্যন্ত। কারণমের হি কার্য্যাত্মনা পরিণমতে, অতোহপ্রবিষ্টস্যৈব কার্য্যোৎ পত্তেরুদ্ধং পৃথকারণস্য পুনঃ প্রবেশোহনুপপন্নঃ। নহি ঘটপরিণামব্যতিরে কেণ মৃদো ঘটে প্রবেশোহস্তি। যথা ঘটে চূর্ণাত্মনা মৃদোহনুপ্রবেশঃ, এবমনেনাত্মনা নামরূপকার্য্যে অনুপ্রবেশ আত্মন ইতি চেৎ; শ্রুত্যন্তরাচ্চ “অনেন জীবেনাত্মনায় পবিশ্য” ইতি নৈবং যুক্তম্, একত্বাদ্র হ্মণঃ। মৃদাত্মনস্ত অনেকত্বাৎ সাবয়বত্বাচ্চ যক্তো ঘটে মৃদশ্চূর্ণাত্মনা অনুপ্রবেশঃ, মৃদশ্চূর্ণস্য অপ্রবিষ্ট- দেশত্বাচ্চ। ন ত্বাত্মন একত্বে সতি নিরবয়বত্বাদপ্রবিষ্টদেশাভাবাচ্চ প্রবেশ উপপদ্যতে। কথং তহি প্রবেশঃ স্যাৎ যুক্তশ্চ প্রবেশঃ, শ্রুতত্ত্বাৎ- “তদেবায়ুপ্রাবিশৎ” ইতি।.. সাবয়বমেবাস্ত তহি; সাবয়বত্বাৎ মুখে হস্তপ্রবেশবং নামরূপকার্য্যে জীবাত্ম- ‘নানুপ্রবেশো যুক্ত এবেতি চেৎ, ন; অশন্যদেশত্বাৎ। নহি কাৰ্য্যাত্মনা পরিণতস্য নামরূপকাৰ্য্যদেশব্যতিরেকেণাত্মশূন্যঃ পদেশোহস্তি, সঃ প্রবিশেষ্জীবাত্মনা। কারণমেব চেৎ প্রবিশেৎ, জীবাত্মত্বং জহ্যাৎ, যথা ঘটো মৃৎপ্রবেশে ঘটত্বং জহাতি। “তদেবানুপ্রাবিশৎ” ইতি চ শ্রুতেন কারণানুপ্রবেশো যুক্তঃ কাৰ্য্যান্তরমেব স্যাদিতি চেৎ --তদেবানুপ্রাবিশদিতি জীবাত্মরূপং কার্য্যং নামরূপ পরিণতং কাৰ্য্যান্তরমেবাপস্তত ইতি চেৎ; ন; বিরোধাৎ। নহি ঘটো ঘটান্তরমা- পদ্যতে, ব্যতিরেকশ্রুতিবিরোধাত। জীবন্ত নামরূপকার্য্যাবত্যিরকানুবাদিত্বা
শ্রুতয়ো বিরুয্যেরন্; তদাপতৌ মোক্ষাসম্ভবাচ্চ। নহি যতো মুচ্যমানঃ, তদেবাপদ্যতে; নহি শৃখলাপত্তিবন্ধস্য তঙ্করাদেঃ।১০
বাহাত্তর্ভেদেন পরিণতমিতি চেৎ-তদেব কারণং ব্রহ্ম শরীরাদ্যাধায়ত্বেন তদন্তজীবাত্মনা আধেয়ত্বেন চ পরিণতম্-ইতি চেৎ; বহিষ্ঠস্ত্য প্রবেশোপপত্তেঃ। নহি যো যস্যান্তঃস্থঃ, স এব তৎপ্রবিষ্ট উচ্যতে। বহিষ্ঠস্ত্যানুপ্রবেশঃ স্যাৎ, প্রবেশশব্দার্থস্যৈবং দৃষ্টস্বাং-যথা গৃহং কৃত্বা প্রাবিশদিতি। জলসূর্য্যকাদি- প্রতিবিম্ববৎ প্রবেশঃ স্যাদিতি চেৎ. ন, অপরিচ্ছিন্নত্বাদমূর্ত্তত্বাচ্চ। পরিচ্ছিন্নস্ত্য মূর্ত্তস্যান্যস্তানত্র প্রসাদস্বভাবকে জলাদৌ সূর্য্যকাদি প্রতিবিম্বোদয়ঃ স্যাৎ, ন আত্মনঃ; অমূর্ত্তত্বাৎ, আকাশাদিকারণস্যাত্মনো ব্যাপকত্বাৎ তদ্বিপ্রকৃষ্টদেশ-প্রতি- বিম্বাধার-বস্ত্বন্তরাভাবাচ্চ প্রতিবিম্ববং প্রবেশো ন যুক্তঃ। ১১
এবং তর্হি নৈবাস্তি প্রবেশঃ; ন চ গত্যন্তরমুপলভামহে, ‘তদেবানুপ্রাবিশৎ” ইতি শ্রুতেঃ। শ্রুতিশ্চ নোহতীন্দ্রিয়বিষয়ে বিজ্ঞানোৎপত্তৌ নিমিত্তম্। নচাস্মাদ্বাক্যাদ যত্নবতামপি বিজ্ঞানমুংপদ্যতে। হন্ত তর্হি অনর্থকত্বাদপোহ- মেতদ্বাক্যম্ “তৎ সৃষ্ট্বা তদেবানুপ্রাবিশং” ইতি; অন্যার্থত্বাৎ। কিমর্থমস্থানে চর্চ্চা? প্রকৃতো হন্যো বিবক্ষিতোহস্ত বাক্যস্যার্থোহস্তি; স স্মর্তব্যঃ - “ব্রহ্মবিদা- প্লোতি পরম্।” ‘সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম” “যো বেদ নিহিতং গুহায়াম্” ইতি। তদ্বিজ্ঞানং চ বিবক্ষিতম্; প্রকৃতং চ তৎ। ব্রহ্মস্বরূপানুগমায় চ আকাশান্তন্নময়াস্তং কাৰ্য্যং প্রদর্শিতম্; ব্রহ্মাবগমশ্চারন্ধঃ। তত্র অন্নময়াদাত্মনোঽন্যোহন্তর আত্মা প্রাণময়:, তদন্তস্মনোময়ো বিজ্ঞানময় ইতি বিজ্ঞানগুহায়াং প্রবেশিতঃ; ৩এ চানন্দময়ো বিশিষ্ট আত্মা প্রদর্শিতঃ। অতঃ পরমানন্দময়লিঙ্গাধিগমদ্বারেণ- আনন্দবিবৃদ্ধ্যবসান আত্মা। ব্রহ্ম পুচ্ছং প্রতিষ্ঠা সর্ব্ববিকল্পাস্পদো নির্ব্বিকল্পোহ- ভ্যামেব গুহায়ামধিগন্তব্য ইতি তৎপ্রবেশঃ প্রকল্পাতে ॥১২
নহি অন্যত্রোপলভ্যতে ব্রহ্ম, নির্বিশেষত্বাৎ; বিশেষসম্বন্ধো হি উপলব্ধিহেতু- দৃষ্টঃ—যথা রাহোশ্চন্দ্রার্কবিশেষসম্বন্ধঃ। এবম্ অন্তঃকরণ-গুহাত্মস সম্বন্ধো ব্রহ্মণ উপলব্ধিহেতুঃ, সন্নিকর্ষাৎ, অবভাসাত্মকত্বাচ্চ অন্তঃকরণস্য। যথা চ আলোকবিশিষ্ট-ঘটাদ্যপলব্ধিঃ, এবং বুদ্ধিপ্রত্যয়ালোকবিশিষ্টাত্মোপলব্ধিঃ স্যাৎ; তস্মাদুপলব্ধিহেতৌ গুহায়াং নিহিতমিতি প্রকৃতমেব। তদ্বৃত্তিস্থানীয়ে দ্বিহ পুনঃ ‘তৎ সৃষ্ট্বা তদেবানুপ্রাবিশৎ’ ইত্যুচ্যতে। তদেবেদমাকাশাদিকারণং কার্য্যং ন। তনুপ্রবিষ্টনিবাসগুহায়ং যুক্তে দুই শ্রোত মন্ত্র বিজ্ঞাত্রিত্যেবং বিশেষত্বপ-
১৮
ভ্যতে। স এব তস্য প্রবেশঃ, তস্মাদস্তি তৎকারণং ব্রহ্ম। অতঃ অস্তিত্বাদন্তীত্যেবোপলব্ধব্যৎ তৎ। ১৩ তৎ কার্য্যমনুপ্রবিশ্য; কিম্? সচ্চ মূর্তং, ত্যচ্চ অমূর্তম্ অভবৎ। মূর্তামূর্তে হি অব্যাকৃতে নামরূপে আত্মস্থে অন্তর্গতেনাত্মনা ব্যাক্রিয়্যেতে মূর্তামূর্তশব্দবাচ্যে। তে আত্মনা ত্বপ্রবিভক্তদেশকালে ইতি কৃত্বা আত্মা তে অভবদিত্যুচ্যতে। কিঞ্চ, নিরুক্তঞ্চানিরুক্তঞ্চ, নিরুক্তং নাম নিষ্কষ্য সমানাসমানজাতীয়েভ্যঃ দেশকাল- বিশিষ্টতয়া ইদং তদিত্যুক্তম্; অনিরুক্তং তদ্বিপরীতম্; নিরুক্তানিরুক্তে অপি মূর্তামূর্তয়োরের বিশেষণে। যথা সচ্চ ত্যচ্চ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে। তথা নিলয়নং চানিলয়নং চ। নিলয়নং নীড়ং আশ্রয়ো মূর্তস্যৈব ধৰ্ম্মঃ; অনিলয়নং তদ্বি- পরীতম্ অমূর্তস্যৈব ধৰ্ম্মঃ। ত্যদনিরুক্তানিলয়নানি অমূর্তধৰ্ম্ম: ত্বহপি ব্যাকৃতবিষয়া- ণ্যেব, সর্গোত্তরকালভাবশ্রবণাং। ত্যদিতি প্রাণাদ্যনিরুক্তং তদেবানিলয়নঞ্চ। অতো বিশেষণানি অমূর্তস্য ব্যাকৃতবিষয়াণ্যেবৈতানি। বিজ্ঞানং চেতনম্; অবিজ্ঞানং তদ্রহিতমচেতনং পাষাণাদি। ১২
সত্যঞ্চ ব্যবহারবিষয়ম্, অধিকারাৎ; ন পরমার্থসত্যম্; একমেব হি পরমার্থ- সত্যং ব্রহ্ম। ইহ পুনর্ব্যবহারবিষয়মাপেক্ষিকং সত্যম্, মৃগঃফণিকাদ্যনৃতাপেক্ষয়া উদকাদি সত্যমুচ্যতে। অনূতং চ তদ্বিপরীতম। কিং পুনঃ? এতৎ সর্ব্ব- মভবৎ, সত্যং পরমার্থসত্যম, কিং পুনস্তং? ব্রহ্ম ‘সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম” ইতি পকুতত্ত্বাৎ। ১৫
যস্মাৎ সং ত্যদাদিকং মূর্ত্তামুত্তধম্মজাতং সং কিঞ্চেদং সদ্ভাববিশিষ্টং বিকারজাতম্ একমেব সচ্ছ্বস্ববাচ্যং ব্রহ্ম অভবৎ, তদ্ব্যতিরেকেণাভাবাৎ নামরূপ বিকারস্য, তস্মাৎ তদ্বন্ধ সত্যমিত্যাচক্ষতে ব্রহ্মবিদঃ। ১৬
অস্তি নাস্তীত্যনুপ্রশ্নঃ প্রকৃতঃ, তস্য প্রতিবচনবিষয়ে এতদুক্তম্ “আত্মাকাময়ত বহু শ্যাম্” ইতি। স যথাকামঞ্চ আকাশাদি কাৰ্য্যং সৎতাদাদিলক্ষ্য; সৃষ্ট্বা তদনু- প্রবিশ্য, পশ্যন্ শশন্মশ্বানো বিজানন বহুবভবং, তস্মাত্তদেবেদমাকাশাদিকারণং কাযাস্থং পরমে ব্যোমন্ হৃদষগুহায়া: নিহিতৎ তৎপ্রত্যয়াবভাসবিশেষেণোপলভ্য- মানমস্তীত্যেবং বিজানীয়াদিত্যুক্তং ভবতি। তৎ এতস্মিন্নথে ব্রাহ্মণোক্তে এষ শ্লোকঃ মন্ত্রো ভবতি, যথা পূর্ব্বেষন্নময়াদ্যান্তপ্রকাশকাঃ পঞ্চস্বপি এবং সর্ব্বান্তর- তমাত্মাস্তিত্বপ্রকাশকোহপি মন্ত্রঃ কার্য্যরাবেণ ভবতি ॥১।১৩৩।
ইতি ব্রহ্মানন্দবন্যাং ষষ্ঠানুবাক্যতাম্ ॥ ৩ ॥
ক্যাঁচাপুত্র।(ঐ, কঃ) কঃ—অঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ, কঃ,
মিথ্যা পদার্থ যেমন কোন প্রকার প্রয়োজন-সাধক হয় না, তেমনি সেই লোকও পুরুষের প্রয়োজন-সারনে সক্ষম হয় না। সেই লোকটা কে? না, যে কোন লোক যদি ব্রহ্মকে অসৎ—অবিদ্যমান(অস্তিত্বশূন্য) বলিয়া জানে। আর— যাহা সর্ব্ববিধ বিকার বা সর্ব্ববিধ ভেদের আশ্রয়ভূত ও সর্ব্বপ্রকার প্রবৃত্তির বীজ- স্বরূপ এবং সর্ব্বপ্রকার বিশেষণবর্জিত, সেই ব্রহ্মকেও যদি ‘অস্তি’(সৎ) বলিয়া জানে—। ভাল, আত্মার অনস্তিত্বে আশঙ্কার কারণ কি? আমরা রলি, ব্রহ্মের ব্যবহারাতীতত্বই কারণ। অভিপ্রায় এই যে, সাধারণতঃ লোকসকল ব্যবহারযোগ্য বাক্যারব্ধ বিকার, বস্তুকেই ‘অস্তি’ বা সৎ বলিয়া জানে; তাদৃশ সংস্কারবদ্ধ লোকসমূহ সর্ব্বব্যবহারাতীত ব্রহ্ম বিষয়ে নাস্তিত্ব বুদ্ধিই পোষণ করিয়া থাকে; যেমন ঘটাদি বস্তুসমূহ যতক্ষণ ব্যবহারযোগ্য থাকে, ততক্ষণই ‘সং’ রূপে(বিদ্যমানরূপে) ব্যবহৃত হয়, তদ্বিপরীত অবস্থায়(ব্যবহারের অযোগ্য অবস্থায়)। অসৎ বলিয়া প্রসিদ্ধ হয়, এই প্রকার—সেই সাম্যানুসারে ব্যবহারাতীত ব্রহ্ম সম্বন্ধেও নাস্তিত্বের(অসত্বের) আশঙ্কা হইতে পারে, সেই আশঙ্কা নিবারণের নিমিত্ত ‘অস্তি ব্রহ্মেতি চেৎ বেদ’ বলা হইতেছে।১
ভাল ব্রহ্মের অস্তিত্ববিৎ পুরুষের কি হয়? তদুত্তরে বলিতেছেন, এবংবিধ জ্ঞানসম্পন্ন এই পুরুষকে সৎ ব্রহ্মস্বরূপে বিদ্যমান অর্থাৎ পরমার্থ সত্য আত্ম- ভাবাপন্ন বলিয়া ব্রহ্মবিদগণ মনে করেন। সেই বন্ধাস্তিত্ব-বিজ্ঞানের ফলে সে লোক নিজেও ব্রহ্মের ন্যায় অপর লোকের বিজ্ঞেয় হয়। অথবা, যে লোক ব্রহ্ম নাই বলিয়া মনে করে, সে লোক বস্তুতঃ বর্ণাশ্রমাদি ব্যবস্থাপূর্ণ সমস্ত সংপথেরই নাস্তিত্ব সাধন করে; কারণ, ব্রহ্মানুভূতি লাভ করাই বর্ণাশ্রমাদি ব্যবস্থাপাত্মক সংপথের মুখ্য প্রয়োজন। অতএব জগতে সেরূপ নাস্তিক লোক অসৎ অর্থাৎ অসাধু বলিয়া কথিত হয়; এবং তাহার বিপরীত যে লোক ‘বন্ধ ‘অস্তি’ ‘সৎ’। এইরূপ জানে, প্রভূউপক্ষে সে লোক শ্রদ্ধা- সহকারে ব্রহ্মজ্ঞানের হেতুভূত বর্ণাশ্রমাদি ব্যবস্থাময় সৎ-পথই আশ্রয় করে! সেইহেতু এই প্রকার লোককে সাধুগণ ‘সৎ’ বলিয়া জানেন। অতএব সমস্তটা বাক্যের তাৎপর্য্যার্থ এই যে, ব্রহ্মকে ‘অস্তি’ বলিয়াই জানিতে হইবে। ২
ইহাই পূর্ব্বোক্ত বিজ্ঞানময়ের শারীর—শরীরাধিষ্ঠিত আত্মা। ইহা কে? না, যাহা এই আনন্দময়। এই আনন্দময়ের নাস্তিত্ব নাই সত্য; কিন্তু ব্রহ্ম সর্ব্বপ্রকার বিশেষণবর্জ্জিত বিধায় তাঁহার সম্বন্ধেও নাস্তিত্ব শঙ্কা যুক্তিযুক্তই
বটে। যেহেতু এইরূপ অবস্থা, সেই হেতু, অনন্তর আচার্য্য-বচন লক্ষ্য করিয়া শ্রোতা বা শিষ্যের এই সমুদয় প্রশ্ন হইয়া থাকে। আকাশাদি সর্ব্ববস্তুর কারণবিধায় বিদ্বান্ ও অবিদ্বান্ উভয়ের পক্ষেই ব্রহ্ম সমান; সুতরাং অবধানের পক্ষেও ব্রহ্মপ্রাপ্তি[ প্রথম প্রশ্নে] আশঙ্কিত হইতেছে, ‘কোন অবিদ্বান্ পুরুষও কি মৃত্যুর পর এই পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হয়? ‘কিংবা প্রাপ্ত হয় না?’ এইটা দ্বিতীয় প্রশ্ন বলিয়া বুঝিতে হইবে; কেন না, ‘অনুপ্রশ্নাঃ’ পদে বহুবচন প্রদত্ত হইয়াছে;[ প্রশ্নের বহুত্ব রক্ষার নিমিত্তই, দুইটা কথায় চারিটা প্রশ্ন বুঝিতে হইবে, নচেৎ, বহুবচনের সার্থকতা থাকে না। বিদ্বানের সম্বন্ধে অপর দুইটা প্রশ্ন।[ প্রশ্নের কারণ এই যে,] ব্রহ্ম সাধারণতঃ সর্ব্বকারণ হইয়াও যখন অবিদ্বান্ লোকের অলভ্য, তখন বিদ্বানের পক্ষেও অলভ্য হইতে পারেন, এই আশঙ্কায় বিদ্বানের সম্বন্ধে প্রশ্ন হইতেছে যে, ‘আহো বিদ্বান’ ইতি। পূর্ব্বোক্ত ‘উত’ শব্দের ‘ত’ ও পরবর্তী ‘উ’ এই দুইটা অক্ষরের যোগে ‘উত’ শব্দ নিষ্পন্ন করিয়া এবং তাহা এখানকার ‘আহো’ পদের অগ্রে স্থাপন করিয়া ‘উতাহো বিদ্বান্’ এইরূপ প্রশ্নবাক্য রচনা করিতে হইবে। ৩ কোনও বিদ্বান্-ব্রহ্মবিদ্ পুরুষও এখান হইতে প্রয়াণ করিয়া(মরিয়া) ঐ লোককে(আত্মাকে) প্রাপ্ত হয় কি? অর্থাৎ বিদ্বান্ লোক কি ঐ আত্মাকে প্রাপ্ত হয়? অথবা অবিদ্বানের ন্যায় বিদ্বান্ও আত্মলোক প্রাপ্ত হয় না? ইহা অপর একটা(চতুর্থ) প্রশ্ন। অথবা বিদ্বান্ ও অবিদ্বানের সম্বন্ধে কেবল দুইটা মাত্রই প্রশ্ন। উক্ত প্রশ্নদ্বয়ের ফলেই আরও দুইটা প্রশ্ন আসিয়া পড়ে; তদনুসারেও প্রশ্নবাক্যে বহুবচন উপপন্ন হইতে পারে। অভি- প্রায় এই যে, ‘অসৎ ব্রহ্মেতি চেৎ বেদ’ অর্থাৎ ব্রহ্মকে যদি অসৎ বলিয়া জানে’ ও ‘অস্তি ব্রহ্ম ইতি চেৎ বেদ’ অর্থাৎ ব্রহ্ম আছেন-সৎ,‘এইরূপ যদি জানে’ এই প্রশ্নদ্বয় শ্রবণেই ব্রহ্মের অস্তিত্ব-নাস্তিত্ব বিষয়েও সংশয় উপস্থিত হয়; সুতরাং এই একই বাক্যার্থ হইতে ব্রহ্মের অস্তিত্ব-নাস্তিত্ব বিষয়ে প্রথম প্রশ্ন। তাহার পর, ব্রহ্ম যখন পক্ষপাতশূন্য, তখন অবিদান্ লোকও তাঁহাকে প্রাপ্ত হয়, বা হয় না, এই হইল দ্বিতীয় প্রশ্ন। আর ব্রহ্ম যখন সকলের নিকটই সমান, তখন বোধ হয় অবিদানের ন্যায় বিদ্বান্ও ব্রহ্মকে লাভ করে না, এইরূপ আশঙ্কানুসারে তৃতীয়, আব একটা প্রশ্ন হইল বিদ্বান্ পুরুষ ব্রহ্মকে ভোগ করে কিনা? ইতি। ৪ উপরে যে, তিনটা প্রশ্ন প্রদর্শিত হইল, তাহারই উত্তর-প্রদানার্থ পরবর্তী
গ্রন্থ আরব্ধ হইতেছে। এখন প্রথমতঃ অস্তিত্বের কথাই বলা হইতেছে। এই যে; আপত্তি করা হইয়াছিল—সত্যং জ্ঞানম্ অনন্তং ব্রহ্ম’ এই বাক্যে ব্রহ্মকে যে, ‘সত্য’ বলা হইয়াছে তাহা কি প্রকারে উপপন্ন হয়, সে কথা বলিতে হইবে ইত্যাদি। তাহার এইরূপ উত্তর বলা যাইতেছে,—তাহার ‘সব’-(অস্তিত্ব) কখন দ্বারাই সত্যত্বও কথিত হইয়াছে। কেন না, পূর্ব্বেই কথিত হইয়াছে যে, ‘সৎ’ বস্তুই প্রকৃত সত্য; সুতরাং ব্রহ্মের ‘সত্ত্ব’ নির্ধারণেই সত্যতাও নির্দিষ্ট হইয়া যায়। ভাল, উক্ত গ্রন্থা-শের ওরূপ অভিপ্রায় বুঝা যায় কিসে? [উত্তর,] ঐরূপ অর্থানুগত শব্দ হইতেই উহা[বুঝা যায়]। দেখ, পরবর্তী বাক্যগুলি ঐরূপ অর্থ-বোধনেই তৎপর—‘তাহাকেই সত্য বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন’ ‘এই আকাশ(বন্ধ) যদি আনন্দস্বরূপ না হইতেন’ ইত্যাদি। ৫
এখানে প্রথমতঃ ব্রহ্মকে অসৎ(অসত্য) বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। কারণ?[কারণ এই যে] যাল ‘অস্তি’[সং), তাহাত নিশ্চয়ই বিশেষভাবে জ্ঞানগোচর হইয়া থাকে; যেমন ঘট প্রভৃতি বস্তু। আর যাহা নাই-অসৎ, তাহা উপলব্ধিগোচর হয় না; যেমন শশকের শৃঙ্গ প্রভৃতি। ব্রহ্মও উপলব্ধি- গোচর হন না; উপলব্ধিগোচর হন না বলিয়াই ব্রহ্মও নাই-অসৎ। না, তাহা নহে; যেহেতু ব্রহ্মই আকাশাদি সর্ব্বভূতের কারণ।[অসৎ কখনই কারণ হইতে পারে না; অতএব] ব্রহ্ম অসৎ নহে। কারণ? আকাশ প্রভৃতি সমস্ত জন্য পদার্থই ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন বলিয়া গ্রহণ করা হইয়া থাকে। যাহা হইতে কোন কিছু উৎপন্ন হয়, জগতে তাহা সৎ ‘অস্তি’ রূপেই(সৎরূপেই) দৃষ্ট হয়; যেমন ঘটের কারণ মৃত্তিকা, এবং অঙ্কুরের কারণ বীজ; অতএব আকাশাদির কারণত্বনিবন্ধনই ব্রহ্ম ‘অস্তি’ বা সৎ-পদবাচ্য। জগতে অসৎ (অবিদ্যমান) হইতে উৎপন্ন কোন কার্য্য দেখিতে পাওয়া যায় না। যদি নাম-রূপময় এই জগৎ অসৎ কারণ হইতেই উৎপন্ন হইত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই উহাও অসৎ-অবস্তু হইত; সুতরাং উপলব্ধির বিষয় হইত না; অথচ জগৎ সকলের নিকটই উপলব্ধির বিষয় হইয়া থাকে; অতএব জগৎকারণ ব্রহ্ম নিশ্চয়ই সৎ। বিশেষতঃ কার্য্য জগৎ যদি অসৎ হইতেই উৎপন্ন হইত, তাহা হইলে প্রতীতিকালে উহা অসৎ-সম্বন্ধ রূপেই প্রতীত হইত, অথচ সেরূপে ত কখনও প্রতীত হয় না; অতএব ব্রহ্ম সৎ। বিশেষতঃ ‘অসৎ হইতে সতের উৎপত্তি কিরূপে হইতে পারে?’ ইত্যাদি অপর শ্রুতি ত যুক্তি দ্বারাই অসৎ
হইতে সহৎপত্তির অসম্ভাবনা প্রদর্শন করিয়াছেন। অতএব ব্রহ্ম যে, নিশ্চয়ই সৎ, একথা যুক্তিযুক্ত। ৬ ভাল কথা, সেই ব্রহ্ম যদি মৃত্তিকা ও বীজের ন্যায় জগতের কারণ হন, তাহা হইলে তিনি ত অচেতন হইয়া পরেন? না, তিনি অচেতন নহেন; যেহেতু তিনি কাময়িতা(কামনা করেন)। জগতে কোন অচেতনেই কামনা করিবার ক্ষমতা দৃষ্ট হয় না। অথচ ব্রহ্ম যে সর্ব্বজ্ঞ(চেতন), সে কথা আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি; সুতরাং তাঁহার পক্ষেই কামনা করা উপপন্ন হয়। যদি বল, তিনিও যখন কামনা করেন, তখন আমাদের ন্যায় তিনিও অনাপ্তকাম, অর্থাৎ’ পূর্ণকাম নহেন; না, সে আপত্তি হইতে পারে না; কেন না, তিনি স্বতন্ত্র। অভিপ্রায় এই যে, কামাদি দোষরাশি অপর সকলকে যেরূপ বশীভূত করিয়া বিভিন্ন কার্য্যে প্রবর্তিত করে, ব্রহ্মের কামনারাশি সেরূপ প্রবর্তক হয় না। তবে কিরূপ হয়? না, সত্য ও জ্ঞানময় কামনা তাঁহার আত্মভূত; সুতরাং বিশুদ্ধ(নিত্য নির্দোষ); সেই সমুদয়ের দ্বারা ব্রহ্ম কখনও পরিচালিত হন না; পরন্তু প্রাণিগণের প্রাক্তন কৰ্ম্মানুসারে স্বয়ং ব্রহ্মই সে সমুদয়ের প্রবর্তনা করিয়াথাকেন। অতএব বুঝিতে হইবে যে, সর্ব্ব কাম্য বিষয়েই ব্রহ্মের স্বাধীনতা; কাজেই ব্রহ্মকে অনাপ্তকাম বলা যাইতে পারে না। বিশেষতঃ তাহার কার্য্যে ‘অপর সাধনের অপেক্ষা না থাকাও ইহার অপর হেতু; অর্থাৎ অপর সকলের কামনাসমূহ যেরূপ স্বতন্ত্র ধর্মবিশেষ এবং পুণ্য পাপানুসারে দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি সাধনান্তর-সাপেক্ষ হইয়া থাকে, ব্রহ্মের কামনা কিন্তু সেরূপ নহে। তবে কিপ্রকার? না ব্রহ্ম হইতে অনন্ত (অনতিরিক্ত); ‘সঃ অকাময়ত’ বাক্য এই অভিপ্রায়ই ব্যক্ত করিতেছে। ৭[‘সঃ অকাময়ত’ বাক্যের] ‘সঃ’ অর্থে আত্মা, যাহা হইতে আকাশ সমুৎপন্ন হইয়াছে। তিনি কমনা করিলেন। কি প্রকার? না, আমি নহ-অনেকপ্রকার হইব। ভাল, কোন একটা বস্তু অপর বস্তুর মধ্যে প্রবেশ না করিলে বহু হইবে কিরূপে? তদুত্তরে বলিতেছেন জাত হইব-উৎপন্ন হইব। এখানে আত্মার বহু হওয়া অর্থ যে, পুত্রাদি উৎপত্তির ন্যায় অন্য বস্তু হইয়া যাওয়া, তাহা নহে; তবে কি? না, আপনার ভিতরে যে সমস্ত নাম ও রূপ অনতিব্যক্ত অবস্থায় বিদ্যমান রহিয়াছে, সেই সমুদয় নাম ও রূপসমূহ অভিবাক্ত করা, অর্থাৎ আত্মাতে সূক্ষ্মাবস্থায় অবস্থিত নাম রূপাত্মক জগৎকে অভিব্যক্ত করাই তাহার ভবন বা উৎপত্তি। তিনি যে সময় আত্মস্থিত
অনভিব্যক্ত নাম ও রূপরাশিকে অভিব্যক্ত করেন, সে সময়ও ব্রহ্মের স্বীয় রূপ পরিত্যক্ত হয় না, এবং ঐ নাম ও রূপ সকল অবস্থায় এবং সকল স্থানে ও সকল সময়েই ব্রহ্মের সহিত অবিযুক্ত থাকিয়াই পশ্চাৎ অভিব্যক্ত হইয়া থাকে। এই যে, নাম ও রূপরাশির অভিব্যক্তি সাধন, ইহাই বন্ধের বহুভবন অন্য প্রকার নহে। তাহা না হইলে, আকাশের ন্যায় নিরাকার ব্রহ্মের কখনই বহুত্ব বা অল্পত্ব উপপন্ন হইতে পারে না। নিরাকার আকাশের যে, অল্পত্ব - ব বহুত্ব ব্যবহার হয়, তাহা নিশ্চয়ই অপর বস্তুদ্বারা সম্পাদিত হয়; উহা (ঔপাধিক(স্বাভাবিক নহে)। অতএব নিরাকার আত্মাও কথিত প্রকারেই বই হইয়া থাকেন,[স্বরূপতঃ নহে]। কেন না, আত্মার অতিরিক্ত অনাত্মভূত এমন কোনও ভূত ভবিষ্যৎ বা বর্তমান সূক্ষ্ম বস্তু নাই, যাহা তাঁহা হইতে ভিন্ন দেশে বা ভিন্ন কালে সন্নিহিত বা দূরবর্তীভাবে অবস্থান করে। অতএব জাগতিক নাম ও রূপ(আকৃতি) সকল অবস্থাতেই একমাত্র ব্রহ্মদ্বাহাই আত্মলাভ করিয়া থাকে, কিন্তু ব্রহ্ম কখনও নামরূপাত্মক নহে(১)। ব্রহ্ম ব্যতিরেকে নাম ও রূপ আত্মলাভই করিতে পারে না; এইজন্য তদুভয়কে ব্রহ্মাত্মক বলা হইয়া থাকে। উক্ত নাম ও রূপাত্মক উপাধি দ্বারাই ব্রহ্ম স্বয়ং জ্ঞাতা, জ্ঞেয় ও জ্ঞান প্রভৃতি সর্ব্বপ্রকার ব্যবহারভাগী হইয়া থাকেন। ৮
সেই আত্মা এইরূপ কামনাসম্পন্ন হইয়া তপস্যা করিয়াছিলেন। ‘তপঃ’ শব্দে জ্ঞান অর্থ বুঝাইতেছে, কেন না, অন্য শতিতে আছে—‘জ্ঞানই যাঁহ র ‘তপঃ’। বিশেষতঃ তিনি নিজে আপ্তকান(পূর্ণকাম), সুতরাং তাঁহার পক্ষে অন্যপ্রকার তপস্যা করা সম্ভবও হয় না। ‘তিনি তপঃ অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন’ অর্থ—পরমাত্মা জগৎ-রচনা প্রভৃতি কর্ত্তব্য বিষয়ে আলোচনা করিয়াছিলেন। ৯
(:) তাৎপর্য্য—সমুদ্র ও তরঙ্গ ইহার দৃষ্টান্ত। সমুদ্র হইতে উৎপন্ন ফেন ও তরঙ্গ কখনই সমুদ্রের অতিরিক্ত পৃথক্ বস্তু নহে, পরন্তু ঐ সমুদয় বিষয় সমুদেরই অবস্থাবিশেষ মাত্র। অথচ ঐ সমুদয় ফেন তরঙ্গ হইতে সমুদ্র স্বতই ভিন্ন বা পৃথক্ বস্তু। কেন না, ফেন তরঙ্গাদি অবস্থাসমুদয় যেরূপ সমুদ্রের সত্তার উপর নির্ভর করে, সমুদ্র সেরূপ কখনই ফেন তরঙ্গাদির সত্তার উপর আত্মনির্ভর করে না। ঠিক এইপ্রকার ব্রহ্ম হইতে সমুৎপন্ন নামরূপাত্মক জগৎও ব্রহ্মসত্তার উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ব্রহ্মসতারট সম্পূর্ণ অধীন; এই কারণে নাম ও রূপ ব্রহ্ম হইতে অতিরিক্ত বা পৃথক্ বস্তু নহে; কিন্তু ব্রহ্ম কখনও নাম ও রূপের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিয়া আত্মলাভ করে না; এইজন্য তিনি নামকপের অতিরিক্ত স্বতন্ত্র বল।
তিনি এইরূপ আলোচনার পর, প্রাণিগণের প্রাক্তন কৰ্ম্মানুসারে সর্ব্বপ্রাণীর সর্ব্বাবস্থায় দেশ, কাল, নাম ও রূপাদিবিশিষ্টরূপে অনুভূয়মান এই সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিলেন; অবিশেষে সমস্ত বস্তুই সৃষ্টি করিলেন। তিনি এই জগৎ সৃষ্টি করিয়া কি করিলেন? হ্যাঁ, বলা হইতেছে - নিজের সৃষ্ট সেই জগতের প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে তিনি প্রবেশ করিলেন। ৯
অতঃপর, তিনি যে কিরূপে প্রবেশ করিয়াছিলেন, তদ্বিষয়ে চিন্তা করিয়া দেখা উচিত। যিনি সৃষ্টি করিলেন, তিনি কি নিজ রূপেই প্রবেশ করিলেন? অথবা অন্যরূপে? ইহার মধ্যে কোন খক্ষটা যুক্তিসঙ্গত?[উত্তর-] এখানে আনন্তর্য্য-বোধক(এক-কর্তৃত্বা-বোধক) ‘ক্ত্বা’ প্রত্যয়(সৃষ্ট্বা) নির্দেশ থাকায় বুঝা যাইতেছে যে, যিনি সৃষ্টকর্ত্তা, তিনি নিজের স্বরূপ রক্ষা করিয়াই প্রবেশ করিয়াছিলেন। এরূপ অর্থ না করিলে ‘ক্ত্বা’ প্রত্যয়ের অর্থ সঙ্গত হয় না।
ভাল, একথাও ত যুক্তিসঙ্গত হয় না; কেন না, ব্রহ্ম যদি ঘটোপাদান মৃত্তিকার ন্যায় জগতের উপাদান কারণ হইতেন, তাহা হইলে, কার্য্য বস্তুমাত্রই যখন কারণাত্মক(উপাদান-কারণস্বরূপ), তখন ত কারণস্বরূপ ব্রহ্মই ফলতঃ কার্য্যরূপে পরিণত হইয়াছেন বলিতে হইবে। অতএব উৎপত্তিকালে অপ্রবিষ্ট কারণেরই যে, আবার উৎপত্তর পরে কার্য্যে প্রবেশ, তাহাও উপপন্ন হয় না। কেন না, মৃত্তিকার ঘটাকারে পরিণাম ব্যতীত ঘটমধ্যে প্রবেশ কোথাও হয় না। যদি বল, মৃত্তিকা যেরূপ চূর্ণরূপে ঘটাভ্যন্তরে প্রবেশ করে, সেইরূপ স্রষ্টাও এই আত্মারূপেই নাম রূপময় দৃশ্যমান কার্য্যপ্রপঞ্চে (বিশ্বের মধ্যে) প্রবেশ করিয়াছেন। একথার সমর্থক অন্য শ্রুতিও আছে— যথা—‘এই জীবাত্মারূপে[ পঞ্চভূতের মধ্যে] অনুপ্রবিষ্ট হইয়া’ ইত্যাদি।
না, একথাও যুক্তিসঙ্গত হয় না; যেহেতু ব্রহ্ম(অখণ্ড বস্তু); মৃত্তিকা কিন্তু এক নহে—অনেকাত্মক এবং সাবয়ব; সুতরাং তাহার পক্ষে চূর্ণাদিরূপে ঘটমধ্যে প্রবেশ করা যুক্তিসঙ্গত হয়; বিশেষতঃ মৃত্তিকাচূর্ণের অগ্রবিষ্ট স্থানও আছে, যেখানে সে প্রবেশ করিবে, কিন্তু আত্মার পক্ষে তাহা সম্ভব হয় না; কারণ, আত্মা এক, নিরবয়ব এবং তাঁহার অপ্রবিষ্ট স্থানেরও অভাব। অতএব তাহার প্রবেশ কখনও উপপন্ন হয় না। ভাল, তাহা হইলে কিপ্রকারে প্রবেশ সম্ভব হইতে পারে? প্রবেশ হওয়াও আবশ্যক; কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন তিনি সৃষ্ট করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন’ ইত্যাদি।
যদি বল, তাহা হইলে ব্রহ্ম বরং সাবয়বই হউক। সাবয়ব হইলে মুখে হস্ত- প্রবেশর ন্যায় ব্রহ্মেরও জীবরূপে নাম-রূপাত্মক কাৰ্য্যপ্রপঞ্চের মধ্যে প্রবেশ করা যুক্তিযুক্তই হইতে পারে। না, যুক্তি-সঙ্গত হয় না; কারণ, বন্ধশূন্য কোন স্থানই নাই। কেন না, কার্য্যাকারে পরিণত ব্রহ্মের নামরূপের অতিরিক্ত আত্ম শূন্য এমন কোনও স্থান নাই, যেখানে তাহার জীবাত্মারূপে প্রবেশ করা সম্ভব হইতে পারে। কার্য্য জীব যদি কারণেই প্রবেশ করে, তাহা হইলে ত জীব নিশ্চয়ই জীবভাব ত্যাগ করিবে। যেমন ঘট যখন মৃত্তিকায় প্রবেশ করে, তখন সে নিজের ঘটত্বই পরিত্যাগ করে। অথচ ‘তাহার মধ্যেই প্রবেশ করিলেন,’ এই শ্রুতিবাক্যানুসারে কারণের মধ্যে প্রবেশ করা যুক্তিযুক্তও হয় না। এই ভয়ে যদি প্রবেশকারীকেও একটা স্বতন্ত্র বস্তু বলিয়া স্বীকার কর, অর্থাৎ জীবাত্মাও যদি জগতের ন্যায় একটা স্বতন্ত্র কার্য্য(উৎপন্ন) পদার্থ হয়, এবং সেই জীবরূপ কাৰ্য্য পদার্থই নাম-রূপাকারে পরিণত জগৎরূপ অপর কার্য্য-বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করিয়া থাকে, ইহাই যদি উক্ত ‘তুদেবানুপ্রাবিশৎ’ শ্রুতির অর্থ বলিতে ইচ্ছা কর, তাহাও পার না; কারণ, তাহা হইলে বিরোধ উপস্থিত হয়। কেন না, একটা ঘট কখনও অপর ঘটের মধ্যে প্রবেশ করে না। অভিপ্রায় এই যে, দুইটা ঘটই মৃত্তিকা হইতে উৎপন্ন কার্য্যস্বরূপ; উহাদের মধ্যে একটার যেমন অপরটাতে প্রবেশ করা অসম্ভব, কার্য্যরূপে স্বীকৃত জীবের পক্ষেও তেমনই জগৎ-কার্য্যে প্রবেশ করা অসম্ভব হইয়া পড়ে। বিশেষতঃ এ পক্ষে ব্যতিক্রমতা-বোধক শ্রুতি বিয়োগও উপস্থিত হয়। যে সমস্ত শ্রুতিতে নামরূপাত্মক জগৎ হইতে জীবের পার্থক্য প্রতিপাদিত হইয়াছে, সেহ সুমুদয় শ্রুতি বিরুদ্ধ হইতে পারে, এবং জীবের জগৎ-প্রবেশ স্বীকার করিলে মুক্তি-লাভেরও সম্ভব থাকে না। কারণ, যাহা হইতে মুক্ত হইতে হইবে, তৎপ্রাপ্তি কখনও যুক্তিসঙ্গত মুক্তি হয় না। বন্ধনগ্রস্ত অস্করাদির পক্ষে শৃঙ্খলপ্রাপ্তি কখনই মুক্তি হইতে পারে না। ১০
যদি বল, একই ব্রহ্ম বাহ্য ও আভ্যন্তরভাবে পরিণত হইয়াছেন, অর্থাৎ সেই কারণস্বরূপ ব্রহ্মই শরীরপ্রভৃতি আধার বা আশ্রয়রূপে এবং তদন্তর্ব্বর্তী আধের(আশ্রিত) জীবাত্মারূপেও পরিণত হইয়াছেন। না, তাহাও হইতে পারে না; কারণ, বাহু অনাত্ম-পদার্থের পক্ষেই সেরূপ প্রবেশ সঙ্গত হইতে পারে। কেন না, যে যাহার অভ্যন্তরেই আছে, তাহাকেই আবার ‘তন্মধ্যে প্রবেশ করিল’ বলা যাইতে পারে না।
১৯
বাহিরে স্থিত বস্তুরই প্রবেশ হইতে পারে; কারণ, ব্যবহারক্ষেত্রে প্রবেশ- শব্দের ঐরূপ অর্থই দৃষ্ট হয়; যেমন ‘গৃহে প্রবেশ করিয়াছিল’ ইত্যাদি। যদি বল, জলে যেমন সূর্য্যাদির প্রতিবিম্ব-পাত হয়, তেমনি প্রবেশ ত হইতে পারে। না, তাহাও হইতে পারে না; কারণ, ব্রহ্ম অপরিচ্ছিন্ন(সর্ব্বব্যাপী) ও অমূর্ত্ত(নিরবয়ব)। পরিচ্ছিন্ন ও মূর্ত্তস্বরূপ ভিন্ন পদার্থেরই তদ্ভিন্ন স্বচ্ছ- স্বভাব জলাদি পদার্থ মধ্যে সূর্য্যকাদিরূপ প্রতিবিম্বোদয় সম্ভবপর হয়, কিন্তু আত্মার সেরূপ প্রতিবিম্বপাত হইতে পারে না; কারণ, আত্মা অমূর্ত্তপদার্থ, এবং আকাশাদির উৎপত্তিস্থান বলিয়া সর্ব্বব্যাপীও বটে। বিশেষতঃ তাঁহা হইতে ব্যবহিত প্রদেশ ও প্রতিবিম্বাধার অপর বস্তু না থাকায় প্রতিবিম্বের ন্যায় প্রবেশ করা যুক্তিসম্মতও নহে। ১১
ভাল কথা, তাহা হইলে প্রবেশই নাই, এরূপ স্বীকার করা ব্যতীত “তদেবানুপ্রাবিশৎ” শ্রুতির অন্য কোন পথত দেখা যায় না। শ্রুতিই আমাদের ইন্দ্রিয়াতীত বিষয়ে জ্ঞানলাভের উপায়; অথচ উক্ত প্রবেশবোধক বাক্য হইতে চেষ্টা করিয়াও কোন জ্ঞান লাভ করিতে পারা যায় না। ভাল, এই শ্রুতি যখন কোন সঙ্গতার্থই বুঝাইতেছে না, তখন অনর্থকত্ববিধায় ‘তৎ সৃষ্টা তদেবানুপ্রাবিশৎ’ এই শ্রুতি পরিত্যাগ করাই ভাল। না, এ কথা বলিতে পারা যায় না; যেহেতু ঐ বাক্যের অর্থই অন্যপ্রকার। অস্থানে এরূপ চর্চার আবশ্যক কি? উক্ত বাক্যের বিবক্ষিত(তাৎপর্য্যের বিষয়ীভূত) অন্যপ্রকার অর্থ আছে; সেই অর্থই এখানে স্মরণ করিতে হইবে—‘ব্রহ্মবিদ্ ব্যক্তি পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হন’ ‘এহ্ম সত্য, জ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ’ ‘গুহানিহিত ব্রহ্মকে যিনি জানেন’ ইত্যাদি। ইহা ব্রহ্মেরই প্রকরণ, এবং ব্রহ্মবিজ্ঞানই শ্রুতির অভিপ্রেত। সেই ব্রহ্মেরই স্বরূপাবগতির উদ্দেশ্যে এখানে আকাশ হইতে অল্পময় পর্যন্ত কার্য্যপ্রপঞ্চ প্রদর্শিত হইয়াছে, এবং ব্রহ্মানুভূতির কথাও অর্ধবন্ধ হইয়াছে। এস্থলে অল্পময় আত্মারও অন্তরস্থ অন্য আত্মা প্রাণময়, তাহারও অন্তরস্থ আত্মা বিজ্ঞানময়, ইত্যাদিরূপে আত্মাকে বিজ্ঞান-গুহাতে প্রবেশ করান হইয়াছে। সেই স্থানে ‘আনন্দময়’ শব্দে পূর্ব্বাপেক্ষা বিশিষ্ট আত্মা প্রদর্শিত হইয়াছে। অতএব সাধারণতঃ যে সমস্ত কারণে আনন্দের উৎকর্ষ অনুমিত হয়, সেই সমস্ত কারণ দর্শনে বুঝিতে পারা যায় যে, সেই পরিবর্দ্ধমান আনন্দের অবসানস্থান হইতেছে আত্মা। ‘ব্রহ্মপুচ্ছং প্রতিষ্ঠা’ এই শ্রুতি-কথিত সর্ব্বপ্রকার বিকল্পের আশ্রয়ভূমি আত্মাকে নির্বিকল্প
নিব্বিশেষরূপে এই গুহামধ্যেই উপলব্ধি করিতে হইবে, এই গূঢ় উদ্দেশ্য আপনের জন্যই আত্মার গুহমধ্যে সন্নিবেশ কল্পনা করা হইয়াছে। ১২
হৃদয়-গুহার অন্যত্র ব্রহ্মের উপলব্ধি বা অনুভব হয় না বা হইতে পারে না; কেন নী, ব্রহ্ম স্বরূপতই নির্বিশেষ(সর্ব্বপ্রকার বিশেষণ-বজ্জিত), সবিশেষ পদার্থের সহিত সম্বন্ধ হইলেই নির্বিশেষ পদার্থেরও উপলব্ধি দেখিতে পাওয়া যায়; যেমন, চন্দ্র ও সূর্য্যের সহিত সংবন্ধবশতঃ অদৃশ্য রাহুর দর্শন হয়; অতএব বিশেষণ-সংবন্ধই নির্বিশেষ পদার্থের অনুভূতির কারণ। এই প্রকার অন্তঃকরণরূপ গুহার সহিত আত্মার যে সম্বন্ধ, তাহাই ব্রহ্মোপলব্ধির নিদান; কারী, ব্রহ্ম তখন অন্তঃকরণের সন্নিহিত থাকিয়া প্রকাশ সম্পাদন করেন। যেমন আলোকসংযুক্ত ঘটাদি দৃশ্য পদার্থের উপলব্ধি হয়, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিরূপ আলোক-সংযোগেই আত্মারও উপলব্ধি হইতে পারে। অতএব ব্রহ্মোপলব্ধির হেতুভূত বুদ্ধিগুহায় যে, ব্রহ্ম নিহিত আছেন, ইহাই এখানে প্রকৃত বা প্রস্তাবিত (অপ্রকৃত বা প্রাসঙ্গিক কথা নহে।। সেই প্রস্তাবিত বিষয়েরই বৃত্তি বা ব্যাখ্যাস্থানীয় এই শ্রুতিতে পুনর্ব্বার ‘তিনি সৃষ্টি করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন’ এই কথা অভিহিত হইয়াছে। আকাশাদির কারণীভূত ব্রহ্ম এইরূপে আকাশাদি কার্য্য সৃষ্টি করিয়া বৃদ্ধিরূপ গুহার অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হইয়াই, যেন সেখানে দ্রষ্টা শ্রোতা মত্তা ও বিজ্ঞাতা, এই প্রকার সবিশেষভাবে প্রতীতিগোচর হইয়া থাকেন। ইহাই ব্রহ্মের প্রবেশ;[কিন্তু মানুষ যেমন গৃহে প্রবেশ করে, তেমন প্রবেশ নহে।] অতএব নিশ্চয়ই কারণস্বরূপ সেই ব্রহ্ম আছেন; আছেন বলিয়াই তাঁহাকে ‘অস্তি’(সৎ) বলিয়াই অনুভব করিতে হইবে(অসংরূপে নহে)। ১৩
ভাল, তিনি কার্য্যমধ্যে প্রবেশ করিয়া কি[করিলেন]? তিনি সং মূর্ত্তিবিশিষ্ট ও ত্যৎ অমূর্ত্ত হইলেন। মূর্ত্ত ও অমূর্ত্ত উভয়ই আভার মধ্যে বিদ্যমান ছিল, কেবল নাম ও রূপ অভিব্যক্ত ছিল না; এখন অন্তঃপ্রবিষ্ট আত্মা সেই মূর্ত্তামূর্ত্তশব্দবাচ্য দ্বিবিধ পদার্থেরই নাম ও রূপ ব্যক্ত করিলেন মাত্র। সেই নাম-রূপাতিব্যক্ত মূর্ত্ত ও অমূর্ত্ত পদার্থগুলি কস্মিন্কালে বা কোন স্থানেও আত্মার সহিত বিযুক্ত নহে; এই অভিপ্রায়েই ‘আত্মা মূর্ত্ত ও অমূর্ত্ত হইলেন’ বলা হইতেছে। অপিচ, তিনি নিরুক্ত ও অনিরুক্ত[হইলেন]। নিরুক্ত অর্থ—যাহাকে সজাতীয় ও বিজাতীয় সমস্ত পদার্থ হইতে পৃথক্ করিয়া বিশেষ বিশেষ দেশকালাদিবিশিষ্টরূপে ‘ইদং তৎ’(ইহা সেই বস্তু) বলিয়া
নির্দেশ করা গিয়াছে, তাহা; আর অনিরুক্ত অর্থ-নিরুক্তের বিপরীত, (যাহাকে ‘ইহা সেই বস্তু’ বলিয়া নির্দেশ করিতে পারা যায় নাই, তাঁহা)। এই ‘নিরুক্ত’ ও ‘অনিরুক্ত’ পদ দুইটাও পূর্ব্বোক্ত মূর্ত্ত ও অমূর্ত্তের বিশেষণ। ‘সৎ’ ও ‘ত্যৎ’ পদের অর্থ যেরূপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ; ‘নিলয়ন’ ও ‘অনিলয়ন’ পদের অর্থও সেইরূপই। নিলয়ন অর্থ-নীড়(পাখীর বাসা) অর্থাৎ আশ্রয়স্থান, তাহা মূর্ত্তপদার্থেরই ধর্ম্ম; আর অনিলয়ন অর্থ-নিলয়নের বিপরীত(অনাশ্রয়ত্ব, তাহাও অমূর্ত্ত পদার্থেরই ধর্ম্ম বা স্বভাব। ‘ত্যৎ’ ‘অনিরুক্ত’ ও ‘অনিলয়ন’ এই তিনটা অমূর্ত্তপদার্থের ধর্ম্ম হইলেও,[বুঝিতে হইবে] ব্যাকৃতবিষয়কই অর্থাৎ নামরূপাতিব্যক্ত অবস্থারই ধর্ম্ম; কেন না, উক্ত ধর্ম্মগুলি সৃষ্টির পরবর্তী ধর্ম্মরূপে উক্ত হইয়াছে। ‘ত্যৎ’ পদের অর্থ প্রাণ প্রভৃতি; তাহাই আবার অনিরুক্ত ও অনিলয়ন। অতএব উক্ত বিশেষণসমূহ ব্যাকৃত অমূর্ত্ত- সম্বন্ধেই অভিহিত। ‘বিজ্ঞান’ অর্থ-চেতন; ‘অবিজ্ঞান’ অর্থ-তদ্বিপবীত অচেতন পাষাণ প্রভৃতি। ১৪
‘সত্য’ অর্থ এখানে ব্যবহারিক সত্য; কেন না, এখানে তাহারই প্রস্তাব চলিতেছে, অতএব উহা পরমার্থ সত্য নহে; কারণ, ব্রহ্মই একমাত্র পরমার্থ সত্য,(তদ্ভিন্ন সমস্তই ব্যবহারিক সত্য)। এখানেও সেই ব্যবহারিক সত্য; উহা আপেক্ষিক সত্যমাত্র, যেমন মৃগতৃষ্ণার অসত্য জলের তুলনায় ব্যবহারিক জলকে সত্য বলা হইয়া থাকে(ইহাও ঠিক সেই মত)। ‘অনৃত’ অর্থ — উক্তপ্রকার সত্যের বিপরীত। আর কি? না, সেই পরমার্থ সত্যই এই সমুদয় হইয়াছিলেন। সেই পরমার্থ সত্য বস্তুটী কে? না, ব্রহ্ম; কারণ, ‘সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম’ বাক্যে তিনিই প্রস্তুত বা নিদ্দিষ্ট হইয়াছেন। ১৫
যেহেতু সৎপদবাচ্য একমাত্র ব্রহ্মই মূর্ত্ত ও অমূর্ত্তধর্ম্ম ‘সৎ ত্যৎ’ প্রভৃতি নিখিল বিকারাত্মক বস্তুরূপে প্রকটিত হইয়াছিলেন; এবং যেহেতু নামরূপাত্মক বিকারময় বস্তুসমূহের ব্রহ্ম ব্যতিরেকে অস্তিত্বই নাই; সেই হেতু ব্রহ্মবিদ্গণ ব্রহ্মকেই ‘সত্য’(পরমার্থ সত্য) বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। ১৬
‘ব্রহ্ম সৎ, কি অসৎ’ এই বিষয়ে প্রথমতঃ প্রশ্ন আরব্ধ হইয়াছিল, তাহার প্রত্যুত্তরে বলা হইয়াছে ‘আত্মা কামনা করিয়াছিলেন—আমি বহু হইব’ ইতি। তিনি নিজের কামনানুসারে ‘সং ত্যৎ’ স্বরূপ(মূর্তামূর্তম) আকাশাদি কার্য্যপ্রপঞ্চ সৃষ্টি করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করত দর্শনাদি ক্রিয়াযোগে দ্রষ্টা, শ্রোতা, মননকর্ত্তা ও বিজ্ঞাতা হইয়াছিলেন। সেই কারণেই অর্থাৎ এই প্রকার
বিশ্বসৃষ্টি কাৰ্য্যাদি দর্শনেই বুঝিতে হইবে যে, আকাশাদির কারণীভূত ও কার্য্যপ্রপঞ্চে প্রবিষ্ট ব্রহ্ম পরম ব্যোমপদবাচ্য হৃদয়-গুহায় নিহিত আছেন; এবং তদ্বিষয়ক বিশিষ্ট চিন্তার ফলে তিনি অনুভূতও হন; অতএব তাঁহাকে ‘অস্তি’ (সৎ--সত্য) বলিয়াই জানিবে। এই ব্রাহ্মণ ভাগে যে বিষয় কথিত হইল, তদ্বিষয়ে এই একটা শ্লোকও(মন্ত্রও) আছে। বুঝিতে হইবে যে, পূর্ব্বোক্ত অন্নময়াদি পঞ্চকোশের আত্মত্ব-প্রকাশক যেমন মন্ত্র আছে, তেমনি সর্ব্বান্তরতম অর্থাৎ অন্নময়াদি পঞ্চকোষাপেক্ষাও অন্তস্থ আত্মার অস্তিত্ব-প্রকাশক মন্ত্রও নিশ্চয়ই আছে; কার্য্যদর্শনে তাহার অস্তিত্ব অনুমিত হয়।(১) ॥ ১ ॥ ৩৩ ॥
ইতি ব্রহ্মানন্দবজ্রীর ষষ্ঠানুবাকের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৬ ॥
অসখা ইদমগ্র আসীৎ। ততো বৈ সদজায়ত। তদা- জ্ঞানং স্বয়মকুরুত। তস্মাত্তৎ সুকৃতমুচ্যত ইতি।
যদ্বৈ তৎ সুকৃতম্। রসো বৈ সঃ। রসঞ্চহ্যেবায়ং লব্ধা- নন্দী ভবতি। কো হ্যেবান্যাৎ কঃ প্রাণ্যাৎ। যদেষ আকাশ- আনন্দো ন স্যাৎ। এষ হ্যেবানন্দয়াতি। যদা হ্যেবৈষ এতস্মিন্ন- দৃশ্যেহনাত্ম্যোহনিরুক্তেহনিলয়নেহভয়ং প্রতিষ্ঠাং বিন্দতে। অথ সোহভয়ং গতো ভবতি। যদা হ্যেবৈষ এতস্মিন্ন দরমন্তরং কুরুতে। অথ তস্য ভয়ং ভবতি। তত্ত্বের ভয়ং বিদুষোহ- মন্থানস্য। তদপ্যেষ শ্লোকো ভবতি ॥৩৪॥
ইতি ব্রহ্মানন্দবল্ল্যাং সপ্তমোহনুবাকঃ ॥ ৭ ॥
সরলার্থঃ-ইদং(প্রত্যক্ষগোচরঃ জগৎ) অগ্রে। সৃষ্টেঃ পূর্ব্বং, অসৎ(অনভিব্যক্ত নামরূপতয়া অবিদ্যমানকল্পম্ ব্রহ্মস্বরূপম্) আসীৎ ততঃ(অসতঃ) বৈ(এব) সৎ(প্রবিভক্তনামরূপাত্মকং ব্যাকৃতং) অজায়ত (উৎপন্নম্)। তৎ(ব্রহ্ম’) স্বরং আত্মানং অকুরুত(আত্মানমেব সজপৎ কৃতবৎ); তস্মাৎ[হেতোঃ] তৎ(ব্রহ্ম) সুকৃতম্(সুষ্ঠু কৃতম্) উচ্যতে [ঋষিভিঃ] ইতি। যৎ তৎ সুকৃতং, সঃ(তৎ সুকৃতং) বৈ(এব) রসঃ (তৃপ্তিহেতুঃ আনন্দরূপঃ)। অয়ং(জীবঃ) হি রসং এব লব্ধা(প্রাপ্য) আনন্দী(সুখী) ভবতি। আকাশে(গুহারূপে হৃদয়াকাশে নিহিতঃ) এষ (আত্মা) যদি আনন্দঃ(তৃপ্তিহেতুঃ) ন স্যাৎ(নৈব ভবেৎ),[তদা] কঃ হি এব অন্যাৎ(অপানবায়ুষ্টাং কুৰ্য্যাং), কঃ হি এব প্রাণ্যাৎ(প্রাণচেষ্টাং বা কুৰ্য্যাৎ),[ন কোহপীতি ভাবঃ]। হি(যস্মাৎ, এষঃ(গুহাহিত আত্মা) এব আনন্দয়াতি(আনন্দয়তি জগজ্জীবান্ সুখয়তীত্যর্থঃ)। এষঃ(জীবঃ) এব হি যদা(যস্মিন্ কালে) অদৃষ্টে(দর্শনাতীতে) অনাত্ম্যে(অশরীরে) [অতএব] অনিরুক্তে(অনির্বচনীয়ে) অনিলয়নে(নিরাধারে’ সর্বপ্রকার- বিকার-ধর্মরহিতে) এতস্মিন্(আত্মনি) অভয়ং(সংসারভয়রহিতৎ যথা স্যাৎ, তথা) প্রতিষ্ঠাৎ(আত্মভাবেন স্থিতিং) বিন্দতে(লভতে), অথ (অনন্তরং) সঃ(আত্মপ্রতিষ্ঠো জনঃ) অতয়ৎ গতঃ(প্রাপ্তঃ) ভবতি(তদা ভয়হেতোরজ্ঞানস্ত নিবৃত্তে):)।[পক্ষান্তরে] এষঃ(জীবঃ) এব যদা এতস্মিন্ (আত্মনি) অরং(অল্পং) উৎ(অপি) অন্তরং(ছিদ্রং ভেদদর্শনং) কুরুতে, অথ(তম্ভেদদর্শনানন্তরং) তস্য(ভেদদর্শিনঃ) অমন্বানস্য(অবিবেকিনঃ) বিদুষঃ(আত্মভেদং বিজানতঃ) তৎ(ব্রহ্ম, এব তু(পুনঃ) ভয়ং(ভয়কারণং ভবতি। তৎ(তস্মিন্ বিষয়েহপি) এষঃ শ্লোকঃ(মন্ত্রঃ) ভবতি ॥ ১ ॥ ৩৪ ॥
মূলানুবাদ।—এই জগৎ উৎপত্তির পূর্ব্বে অসৎ- অনভিব্যক্ত নামরূপ ব্রহ্মস্বরূপে ছিল। সেই অসৎ-পদবাচ্য ব্রহ্ম হইতে এই সৎ নামরূপাভিব্যক্ত জগৎ অভিব্যক্ত হইল; তিনি নিজেই নিজকে এইপ্রকার করিলেন।[যেহেতু তিনি নিজকে এইরূপ করিয়াছিলেন,] সেই হেতু তিনি ‘সুকৃত’ নামে অভিহিত হন। যিনি সেই সুকৃত, তিনিই রসস্বরূপ অর্থাৎ তৃপ্তিকর আনন্দস্বরূপ। জীব এই রস লাভ করিয়াই আনন্দী(সুখী) হইয়া থাকে।
হৃদয়াকাশে নিহিত এই আত্মা যদি আনন্দরূপ না হইত, তাহা ইইলে কোন লোক অপান ক্রিয়া করিত? কোন লোকই বা প্রাণচেষ্টা করিত? অর্থাৎ তাহা হইলে কেহই প্রাণাপান-ব্যাপার করিত না। এই জীব যখন দর্শনের অবিষয় অশরীর অনিরুক্ত (অনির্বাচ্য) ও অনিলয়ন বা অনাধার এই ব্রহ্মেতে নির্ভয়ে স্থিতি লাভ করে, অর্থাৎ ব্রহ্মভাবে অবস্থিতি করে, তখন অভয় (সর্ব ভয়ের নিবৃত্তি), প্রাপ্ত হয়; আর জীব যখন উক্তপ্রকার ব্রহ্মেতে অল্পমাত্রও ভেদদর্শন করে, তখন তাহার ভয় হয়। আত্মভেদদর্শী প্রাকৃত বিদ্বানের নিকট সেই অভয় ব্রহ্মই ভয়ঙ্কর হইয়া থাকেন। উপনিষৎকথিত এই বিষয়ে এই শ্লোকও(মন্ত্রও) আছে। ১ ॥ ৩৪ ॥
শাকরভাষ্যম্। -অসদ্বা ইদমগ্র আসীং। অসদিতি ব্যাকৃতনামরূপ- বিশেষবিপরীতরূপম্ অব্যাকৃতং ব্রহ্মোচ্যতে; ন পুনরত্যন্তমেবাসৎ। ন হসতঃ সজ্জন্মান্তি। ইদমিতি নামরূপবিশেষবদ্ব্যাকৃতং জগৎ; অগ্রে পূর্ব্বৎ প্রাগুৎপত্তেঃ, ব্রহ্ম এবাসচ্ছন্দবাচ্যমাসীৎ। ততঃ অসতঃ বৈ সৎ প্রবিভক্তনামরূপবিশেষম্ অজায়ত উৎপন্নম্। কিং ততঃ প্রবিভক্তং কার্য্যমিতি-পিতুরিব পুত্রঃ? নেত্যাহ। তৎ অসচ্ছন্দবাচ্যং স্বয়মের আত্মানমের অকরুত কৃতবৎ। যম্মাদেবম্, তস্মাৎ তৎ ব্রহ্মৈব সুকৃতং স্বয়ং কর্ত্তু উচ্যতে। স্বয়ং কর্ত্তু ব্রহ্মেতি প্রসিদ্ধং লোকে, সর্ব্বকারণত্বাৎ। যম্মাত্মা স্বয়মকরোৎ সর্ব্বং সর্ব্বাত্মনা, তস্মাৎ পুণ্যরূপেণাপি তদেব ব্রহ্ম কারণং সুকৃতমুচ্যতে। সর্ব্বথাপি তু ফলসম্বন্ধাদিকারণং সুকৃত- শব্দবাচ্যৎ প্রসিদ্ধং লোকে। যদি পুণ্যং যদি বান্যৎ, সা প্রসিদ্ধিনিত্যে চেতন- কারণে সত্যুপপদ্যতে। তস্মাদস্তি ব্রহ্ম সুকৃতপ্রসিদ্ধোরিতি।১
ইতশ্চাস্তি। কুতঃ? রসত্বাৎ। কুতো বসত্ব প্রসিদ্ধিব্রহ্মণঃ? ইত্যত আহ-যদ্বৈ তৎ সুকৃতং, রসো বৈ সঃ। রসো নাম তৃপ্তিহেতুরানন্দকরো মধুরান্নাদিঃ প্রসিদ্ধো লোকে। রসমেব হি খন্বয়ং লব্ধা প্রাপ্য আনন্দী সুখী ভবতি। নাসত আন্ব- হেতুত্বং দৃষ্টং লোকে। বাহ্যানন্দসাধনরহিতা অপি অনীহা নিরেষণা ব্রাহ্মণা বাহুরসলাভাদিব সানন্দা দৃপ্তন্তে বিদ্বাংসঃ, নূন বঞ্চৈব বসন্তেষাম্। তস্মাদস্তি তং তেষামানন্দকারাং বসনদ বক্ষ।
ইতশ্চান্তি; কুতঃ? প্রাণনাদিক্রিয়দর্শনাৎ। অয়মপি হি পিণ্ডো জীবতঃ প্রাণেন প্রাণিতি অপানেনাপানিতি। এবং বায়বীয়া ঐন্দ্রিয়কাশ্চ চেষ্টাঃ সংহতৈঃ কার্য্যকরণৈনির্ব্বর্ত্যমানা দৃশ্যন্তে। তচ্চৈকার্থবৃত্তিত্বেন সংহননং নান্তরেণ চেতনমসংহতং সম্ভবতি, অন্যত্রাদর্শনাৎ। তদাহ যদ্ যদি এবঃ আকাশে পরমে ব্যোন্নি গুহায়াং নিহিত আনন্দো ন স্যাৎ ন ভবেৎ, কো হেব লোকে অন্নাদপান- চেষ্টাং কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ। কঃ প্রাণ্যাং প্রাণনং বা কুৰ্য্যাৎ; তন্মাদস্তি তদ্ব্রহ্ম, যদর্থাঃ কার্য্যকরণপ্রাণনাদিচেষ্টাঃ, তৎকৃত এব চ আনন্দো লোকস্য। কুতঃ? এব হেব পর আত্মা আনন্দয়াতি আনন্দয়তি সুখয়তি লোকং ধর্মানুরূপম্। স এবাত্মানন্দরূপোহবিদ্যয়া পরিচ্ছিন্নো বিভাব্যতে প্রাণিভিরিত্যর্থঃ।৩
ভয়াভয়হেতুত্বাদ্বিদ্বদবিদুযোরস্তি তদ্ব্রহ্ম। সদ্বস্বাশ্রয়ণেন হুতয়ং ভবতি; নাসদ্বত্ত্বাশ্রয়ণেন তয়নিবৃত্তিরুপপদ্যতে। কথমভয়হেতুত্বমিতি? উচ্যতে-যদ জেব যম্মাদেষ সাধক এতস্মিন্ ব্রহ্মণি-কিংবিশিষ্টে? অদৃশ্যে দৃশ্যৎ নাম দ্রষ্টব্যৎ বিকারঃ, দর্শনার্থত্বাদ্বিকারস্ত; ন দৃশ্যম্ অদৃশ্যং অবিকার ইত্যর্থঃ। এতস্মিন্নদৃশ্যে অবিকারে২বিষয়ভূতে, অনাত্ম্যে অশরীরে; যম্মাদদৃশ্যম্, তন্মাদনাত্ম্যৎ, যম্মাদনাত্ম্যৎ, তন্মাদনিরুক্তম্; বিশেষো হি নিরুচ্যতে; বিশেষশ্চ বিকারঃ; অবিকারঞ্চ এন্ধ, সর্ববিকারহেতুত্বাৎ; তন্মাদনিরুক্তম্। যত এবং, তন্মাদনিলয়নং নিলয়নং নীড় আশ্রয়ঃ, ন নিলয়নম্ অমিলয়নম্ অনাধারং, তস্মিন্নেতস্মিন্নদৃশ্যে হনান্যেহনিরুক্তেহনিলয়নে সর্ব্বকাৰ্য্যধৰ্ম্মবিলক্ষণে ব্রহ্মণীতি বাক্যার্থঃ। অভয়মিতি ক্রিয়াবিশেষণম্। অভয়ামিতি বা লিঙ্গান্তরং পরিণম্যতে। প্রতিষ্ঠাং স্থিতিমাত্ম- ভাবং বিন্দতে লভতে। ৪
অথ তদা স তস্মিন্ নানাত্বস্তু ভয়হেতোরবিদ্যাকৃতস্যাদর্শনাদভয়ং গতো ভবতি। স্বরূপপ্রতিষ্ঠো হুসৌ যদা ভবতি, তদা নান্যৎ পণ্ডতি নান্যচ্ছৃণোতি নান্যদ্বিজানাতি। অন্যস্য হন্যতো ভয়ং ভবতি, নাম্নত এবাত্মনো ভয়ং যুক্তম্; তর্ম্মাদাত্মৈবার্ণনোঽভয়কারণম্। সর্ব্বতো হি নির্ভয়া ব্রাহ্মণা দৃশ্যন্তে সৎসু ভয়হেতুষু; তচ্চাযুক্তম্ অসতি ভয়ত্রাণে ব্রহ্মণি। তস্মাৎ তেষামভয়দর্শনাদস্তি তদভয়কারণং ব্রহ্মেতি। ৫
কদা অসৌ অভয়ং গতো ভবতি সাধকঃ? যদা নান্যং পশ্যতি, আত্মনি চ অন্তরং ভেদং ন কুরুতে, তদা অভয়ং গতো ভবতীত্যভিপ্রায়ঃ। যদা পুনরবিদ্যাবস্থায়াৎ, হি যস্মাৎ এবঃ অবিদ্যাবান্ অবিদ্যয়া প্রত্যুপস্থাপিতং বস্তু তৈমিবিক-দ্বিতীয় চন্দ্রবং পশ্যতি আত্মনি চৈতস্মিন ব্রহ্মণি, উত অপি,
অরং অল্পমপি, অন্তরৎ ছিদ্রং ভেদদর্শনং কুরুতে; ভেদদর্শনমেব হি ভয়কারণম্; অল্পমপি ভেদং পশ্যতীত্যর্থঃ। অথ তস্মাৎ ভেদদর্শনাদ্ধেতোঃ তস্য ভেদদর্শিনঃ, আত্মনো ভয়ং ভবতি। তন্মাদাত্মৈবাত্মনো ভয়কারণমবিদুষঃ। তদেতদাহ— তদ্ ব্রহ্ম দ্বেব ভয়ং ভেদদর্শিনো বিদুষঃ - ঈশ্বরোহন্যঃ মজ্ঞ, অহমন্যঃ সংসারীত্যেবং বিদুষঃ ভেদদৃষ্টমীশ্বরাখ্যং তদেব ব্রহ্ম অল্পমপি অন্তরং কুর্ব্বতঃ ভয়ং ভবতি একত্বেনামস্থানস্থ্য। তন্মাদ্বিদ্বানপ্যবিদ্বানেবাসৌ, যোহয়ম্ একমভিন্নমাত্মতত্ত্বং ন পশ্যতি।৬
. উচ্ছেদ-হেতুদর্শনাদ্ধি উচ্ছেদ্যাভিমতস্ত ভয়ং ভবতি; অনুচ্ছেদ্যো হি উচ্ছেদ- হেতুঃ; তত্র অসত্যুচ্ছেদহেতৌ উচ্ছেদ্যে ন তদ্দর্শনকার্য্যৎ ভয়ং যুক্তম্। সর্ব্বং চ জগন্তয়বদ্ দৃশ্যতে। তস্মাৎ জগতো ভয়দর্শনাদ্ গম্যতে—নুনং তদন্তি ভয়- কারণমুচ্ছেদহেতুরনুচ্ছেদ্যাত্মকম্, যতো জগদ্বিভেতীতি। তদদেতস্মিন্নপ্যর্থে এষ শ্লোকঃ ভবতি ॥১৪৩৪৷৷
ভাষ্যানুবাদ। ‘অসৎ বৈ ইদম্ অগ্র আসীৎ’ ইতি। এখানে ‘অসৎ’ পদে বিশেষ বিশেষরূপে নামরূপাভিব্যক্ত বস্তুর বিপরীত-ভাবাপন্ন ব্রহ্মকে বুঝাই- তেছে, কিন্তু অত্যন্ত অসৎ অস্তিত্ববিহীন অর্থ বুঝাইতেছে না। কারণ, অসৎ হইতে সতের জন্ম কোথাও প্রসিদ্ধ নাই। ‘ইদম্’ পদের অর্থ-বিশেষ বিশেষ নাম- রূপাভিব্যক্ত স্থূল জগৎ। অগ্রে - সৃষ্টির পূর্ব্বে ব্রহ্মই অসৎ-পদবাচ্য ছিলেন। সেই অসৎ-পদবাচ্য ব্রহ্ম হইতেই এই ব্যক্ত নাম-রূপবিশিষ্ট জগৎ উৎপন্ন হইয়াছে। ভাল কথা, পুত্র যেরূপ পিতা হইতে পৃথক্, সেইরূপ ব্রহ্মও কি স্বকৃত কার্য্যপ্রপঞ্চ হইতে,পৃথক্? তদুত্তরে বলিতেছেন- না, পৃথক্ নহে; সেই অসং-পদবাচ্য ব্রহ্ম নিজেই নিজকে(ব্যাকৃত) করিয়াছিলেন। যেহেতু এইরূপই সিদ্ধান্ত, সেই হেতু সেই ব্রহ্ম ‘সুকৃত’ স্বয়ং কর্তা বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। অথবা, যেহেতু, তিনি নিজেই সর্ব্বপ্রকারে সকল বস্তু নির্মাণ করিয়াছিলেন, সেই হেতু পুণ্যরূপেও তিনি কারণ;[পুণ্যের নাম সুকৃত;] সেই কারণে তাঁহাকে সুকৃত বলা হইয়া থাকে। উভয় প্রকারেই ফলোৎপাদক কৰ্ম্মরাশিই ‘সুকৃত’ বলিয়া প্রসিদ্ধ। ‘সুকৃত’ পদের অর্থ পুণ্যই হউক, আর তদ্ভিন্নই হউক, চেতন কারণের পক্ষেই উক্তপ্রকার প্রসিদ্ধি উপপন্ন হইতে পারে। অতএব ঐরূপ অর্থের প্রসিদ্ধি হেতুই ব্রহ্মের অস্তিত্ব সিদ্ধ হইতেছে। ১
২০
এই কারণেও ব্রহ্মের অস্তিত্ব সিদ্ধ হয়। কোন কারণে? যেহেতু তিনি রস স্বরূপ। ব্রহ্মের রসরূপত্ব প্রসিদ্ধির কারণ কি? তদুত্তরে বলিতেছেন—যাহা সুকৃত, তাহাই রসস্বরূপ। তৃপ্তিকর আনন্দবর্দ্ধক মধুর অম্ল প্রভৃতি পদার্থই জগতে রস নামে প্রসিদ্ধ। এই জীবগণ উক্ত রস লাভ করিয়াই(প্রাপ্ত হইয়াই) আনন্দী (সুখী) হইয়া থাকে। জগতে অসৎ পদার্থের আনন্দপ্রদান-ক্ষমতা কোথাও দেখা যায় না। যে সমুদয় বিদ্বান্ ব্রাহ্মণ নিশ্চেষ্ট নিষ্কাম ও লৌকিক সুখ-সাধনের সঙ্গে সম্বন্ধশূন্য, অথচ লৌকিক রসাস্বাদে সাধারণ লোক যেরূপ আনন্দিত থাকে, তাঁহাদিগকেও ঠিক সেইরূপই আনন্দিত দেখা, যায়। ব্রহ্মই তাঁহাদের নিকট রস স্বরূপ। অতএব স্বীকার করিতে হইবে যে, তাঁহাদের আনন্দজনক ব্রহ্ম নিশ্চয়ই রসবান।২ কি কারণে? যেহেতু প্রাণা নিশ্চয়ই রসবান্।২ এই কারণেও নিশ্চয়ই রসবান্ ব্রহ্ম আছেন। কি কারণে? যেহেতু প্রাণা- দির চেষ্টা দৃষ্ট হইয়া থাকে। জীবিত ব্যক্তির এই দেহপিণ্ড প্রাণের সাহায্যে প্রাণন(শ্বাসপ্রশ্বাসাদি কার্য্য) করিয়া থাকে, এবং অপানবায়ুর দ্বারা অপানন (মলমূত্রাদির অধোনয়ন) করিয়া থাকে। ইহা ছাড়া, কার্য্য-করণসম্পন্ন দেহ দ্বারা দৈহিক বায়ুর ও ইন্দ্রিয়বর্গের বিবিধ চেষ্টা(ক্রিয়া) সম্পন্ন হইতে দেখা যায়। এই যে, একই উদ্দেশ্যে জড়বর্গের সংহনন বা সম্মিলিত ভাবে কৰ্ম্ম, তাহা কখনই কোনও অসংহত চেতন পদার্থের সাহায্য ব্যতীত হইতে পারে না; কারণ, অন্যত্র কোথাও সেরূপ দেখা যায় না। এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন, যদি আকাশে—অর্থাৎ পরম ব্যোমরূপী হৃদয়-গুহাতে এই আনন্দ নিহিত না থাকিত, তাহা হইলে, জগতে কোন লোক অপান চেষ্টা করিত? কেইবা প্রাণনব্যাপার করিত? অর্থাৎ কেহই প্রাণাপানব্যাপার করিতে পারিত না। অতএব নিশ্চয়ই সেই ব্রহ্ম আছেন, যাহার জন্য এই দেহ ইন্দ্রিয় ও প্রাণাদির কার্য্য হইয়া থাকে; এবং তাহার দ্বারাই লোকের আনন্দ সম্পন্ন হইয়া থাকে। কারণ, যে হেতু এই পরমাত্মাই লোককে নিজ নিজ ধর্ম্মানুসারে আনন্দিত(সুখী) করিয়া থাকেন। প্রাণীগণ অবিদ্যাবশতঃ সেই আত্মাকেই পরিচ্ছিন্ন বলিয়া মনে করিয়া থাকে মাত্র।৩ অগ্নিপদ বলিয়াও সেই ব্রহ্মের করিয়া থাকে মাত্র। বিশেষতঃ অজ্ঞ জনের ভয়হেতু ‘ও জ্ঞানিগণের অভয়প্রদ বলিয়াও সেই ব্রহ্মের সত্তা স্বীকার করিতে হয়। কেন না, জীব সম্বন্তর আশ্রয় দ্বারাই অভয়(ভয় রহিত) হইয়া থাকে, কিন্তু অসতের আশ্রয়ে ভয়নিবৃত্তি হইতে পারে না। ভাল ব্রহ্ম অভয় লাভের হেতু হন কিরূপে? বলা হইতেছে,-যেহেতু এই সাধক পুরুষ
যে সময় এই ব্রহ্মেতে,-ব্রহ্ম কিরূপ? না, অদৃশ্য, দৃশ্য অর্থ দর্শনযোগ্য বিকার বস্তু; কেন না, দর্শনের জন্যই বিকারের[সৃষ্টি]। যাহা দৃশ্য নয়, তাহাই অদৃশ্য অর্থাৎ অবিকার-দর্শনের অবিষয়ীভূত; তাহার পর, তিনি অনাত্ম্য শরীররহিত; যেহেতু-অদৃশ্য, সেই হেতুই অনাত্ম্য; যেহেতু অনাত্ম্য, সেই হেতুই অনিরুক্ত; কারণ, গুণাদিবিশেষণযুক্ত বস্তুই নিরুক্ত হয়(শব্দ দ্বারা বর্ণিত হয়); গুণাদিবিশেষণযুক্ত বস্তুমাত্রই বিকাব; ব্রহ্ম তদ্বিপরীত অবিকার; কেননা, ব্রহ্মই সমস্ত বিকারের কারণ; এই নিমিত্তই তিনি অনিরুক্ত। ব্রহ্ম যেহেতু এবংপ্রকার, সেই হেতুই অনিলয়ন; নিলয়ন অর্থ আশ্রয়। নিলয়ন নয় বলিয়াই ব্রহ্ম অনিলয়ন অর্থাৎ নিরাধার(অনাশ্রয়)। সেই এই অদৃশ্য অনাত্ম্য অনিরুক্ত ও অনিলয়ন অর্থাৎ জন্য পদার্থের সর্ব্বপ্রকার ধৰ্ম্মবর্জিত ব্রহ্মেতে অভয় প্রতিষ্ঠা-স্থিতি অর্থাৎ আত্মভাব(তাদাত্ম্যবোধ) লাভ করেন। শ্রুতির ‘অভয়’ পদটা ‘প্রতিষ্ঠা’ ক্রিয়ার বিশেষণ; অথবা ‘অভয়াং’ এইরূপে লিঙ্গপরিবর্তন করিয়া সাক্ষাৎ সম্বন্ধেই প্রতিষ্ঠার বিশেষণ করিতে হয়। ৪
তখন সে ব্যক্তি, সেই ব্রহ্মেতে ভয়ের কারণীভূত অবিদ্যাকৃত নানাত্বরূপ ভেদ দর্শনের অভাব হওয়ায় অভয় প্রাপ্ত হইয়া থাকেন, অর্থাৎ তখন তাহার ভেদ- দৃষ্টি নিবন্ধন যে ভয় ছিল, তাহা নিবৃত্ত হইয়া যায়। তখন এই সাধক স্বীয় ব্রহ্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হন; তখন অন্য কোনও বস্তু দর্শন করেন না, অন্য কিছু শ্রবণ করেন না, অন্য কিছু অনুভবও করেন না। অপর বস্তু হইতেই অপরের ভয় হইয়া থাকে; কিন্তু নিজের নিকটই নিজের ভয় হওয়া ত উচিত হয় না। অতএব আত্মাই আত্মার বাস্তবিক অভয়ের(ভয় নিবৃত্তির) কারণ। সর্ব্বত্রই দেখিতে পাওয়া যায় যে, নানাপ্রকার ভয়হেতু বিদ্যমান সত্ত্বেও ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষগণ সর্ব্বতোভাবে নির্ভয়(ভয়রহিত); কিন্তু ব্রহ্ম যদি বাস্তবিকই জ্ঞানময় না হইতেন, তাহা হইলে কখনই ব্রহ্মনিষ্ঠগণের ঐপ্রকার নির্ভয়তাঘ যুক্তিসঙ্গত হইত না। অতএব সেই ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষগণের অভয়প্রাপ্তি দর্শনে অভয়কারণ ব্রহ্মসত্তা অনুমিত হয়। ৫
এই সাধক পুরুষ কখন অভয়প্রাপ্ত হন? যখন অন্য বস্তু দর্শন না করেন, এবং আত্মাতেও ভেদবুদ্ধি না করেন, তখনই অভয়প্রাপ্ত হন। পক্ষান্তরে, এই অবিদ্বান্ পুরুষ অবিদ্যা অবস্থায় যখন, তৈমিরিক(চক্ষুরোগগ্রস্ত) ব্যক্তির দ্বিচন্দ্রদর্শনের ন্যায় অবিদ্যা দ্বারা উপস্থাপিত দ্বৈত দর্শন করেন, এবং এই ব্রহ্মেতে
অতি অল্পমাত্রও অন্তরনচ্ছিদ্র, অর্থাৎ ভেদদৃষ্টি করে-; সাধারণতঃ ভেদদর্শনই ভয়ের কারণ; যিনি অল্পমাত্রও সেই ভেদদর্শন করেন; ‘সেই ভেদদর্শী পুরুষ উক্ত ভেদদর্শনের ফলে আত্মা হইতেই ভয় পাইয়া থাকেন; অতএব বুঝিতে হইবে যে, অবিদ্বান্ পুরুষের আত্মাই(নিজেই) নিজের ভয়হেতু হয়। এখন ইহাই ব্যক্ত করিয়া বলিতেছেন যে, ভেদদর্শী বিদ্বানের অর্থাৎ ঈশ্বর আমা হইতে পৃথক্, এবং আমিও তাঁহা হইতে স্বতন্ত্র সংসারী- ইত্যাকার জ্ঞানসম্পন্ন লোকের পক্ষে, সেই সামান্যমাত্র ভেদবুদ্ধি করার দরুণই ভেদদৃষ্ট(ভেদবুদ্ধিতে জ্ঞাত) সেই ঈশ্বরনামক আত্মাই ভয়ের কারণ হইয়া থাকেন; কেন না, সে লোক ঈশ্বরকে এক অভিন্নরূপে চিন্তা করে না। অতএব যিনি এক অভিন্ন(জীব হইতে অপৃথক্) আত্মতত্ত্ব দর্শন করেন না, তিনি[ব্যবহারক্ষেত্রে] বিদ্বান্ বলিয়া পরিচিত থাকিলেও, প্রকৃত পক্ষে তিনি অবিদ্বানই বটে। ৬
সাধারণতঃ যে লোক নিজেকে উচ্ছেদ্য(বিনাশযোগ্য) বলিয়া মনে করে, উচ্ছেদের কোনও হেতু দর্শনে তাহারই ভয় উপস্থিত হইয়া থাকে; কেন না, জগতে উচ্ছেদের হেতুভূত বস্তুর উচ্ছেদসাধন বা নিৰ্ম্মূলতা সাধন অসম্ভব। কিন্তু উচ্ছেদের হেতুভূত পদার্থ বিদ্যমান না থাকিলে উচ্ছেদক-দর্শনজনিত উচ্ছেদভয় উচ্ছেদ্যের পক্ষে কখনই সম্ভব হয় না। জগতের সমস্তকেই ভয়যুক্ত দেখিতে পাওনা যায়। অতএব জগদ্ব্যাপী ভয়দর্শনে জানা যাইতেছে যে, নিশ্চয়ই ভয়ের কারণীভূত উচ্ছেদহেতুও আছে, যাহা স্বরূপতঃ অনুচ্ছেদ্য, এবং যাহা হইতে সমস্ত জগৎ ভীত হইতেছে। এই ক্রত্যুক্ত বিষয়েও এই শ্লোকটা আছে ॥ ১ ॥ ৩৪ ॥
ইতি ব্রহ্মানন্দবজ্রীর সপ্তমানুবাক্যের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৭ ॥
ভীষাস্মাদ্বাতঃ পবতে। ভীষোদেতি সূর্য্যঃ। ভীষা- স্মাদগ্নিশ্চেন্দ্রশ্চ। মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চম ইতি।
সৈষানন্দস্য মীমাঞ্চসা ভবতি। যুবা স্যাৎ সাধুষুরাধ্যা- য়কঃ। আশিষ্টো দৃঢ়িষ্ঠো বলিষ্ঠঃ। তস্যেয়ং পৃথিবী সর্ব্বা বিত্তস্য পূর্ণা স্যাৎ। স একো মানুষ আনন্দঃ। তে যে শতং মানুষা আনন্দাঃ ॥১॥৩৫॥
স একো মনুষ্য-গর্ব্বাণানন্দঃ, শ্রোত্রিয়স্য চ কামহতস্য
তে যে শতং মনুষ্য-গন্ধব্বাণামানন্দাঃ, স একো দেব-গন্ধর্ব্বাণা- মানন্দঃ, শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য। তে যে শতং দেব- গন্ধর্ব্বাণামানন্দাঃ, স ‘একঃ পিতৃণাং চিরলোক-লোকানা- মানন্দঃ, শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য। তে যে শতং পিতৃণাং চিরলোক-লোকানামানন্দাঃ, স এক আজানজানাং দেবানা- মানন্দঃ ॥২॥৩৬৷৷
শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য। তে যে শতমাজানজানাং দেবানামানন্দাঃ, স একঃ কৰ্ম্মদেবানাং দেবানামানন্দঃ-যে কৰ্ম্মণা দেবানপিষন্তি, শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য। তে যে শতং কৰ্ম্মদেবানাং দেবানামানন্দাঃ, স একো দেবানামানন্দঃ, শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য। তে যে শতং দেবানামানন্দাঃ, স এক ইন্দ্রস্যানন্দঃ ॥ ৩৷৩৭৷
শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য। তে যে শতমিন্দ্রস্যানন্দাঃ। স একো বৃহস্পতেরানন্দঃ। শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য। তে যে শতং বৃহস্পতেরানন্দাঃ। স একঃ প্রজাপতেরানন্দঃ। শ্রোত্রি- য়স্য চাকামহতস্য। তে যে শতং প্রজাপতেরানন্দাঃ। স একো ব্রহ্মণ আনন্দঃ। শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য ॥৪॥৮॥
স যশ্চায়ং পুরুষে। যশাসাবাদিত্যে। স একঃ। স য এবংবিৎ। অস্মাল্লোকাৎ প্রেত্য। এতমন্নময়মাত্মানমুপ- সংক্রামতি। এতং প্রাণময়মাত্মানমুপসংক্রামতি। এতং মনোময়মাত্মানমুপসংক্রামতি। এতং বিজ্ঞানময়মাত্মানমুপ- সংক্রামতি। এতমানন্দময়মাত্মানমুপসংক্রামতি। তদপ্যেস শ্লোকো ভবতি ॥৫॥৩৯৷৷
ইতিব্রহ্মানন্দবল্ল্যামষ্টমোহনুবাকঃ ॥ ৮ ॥
সরলার্থঃ—বাতঃ(বায়ুঃ) অস্মাৎ(ব্রহ্মণঃ) ভীষা(ভয়েন) পবতে (প্রবহতি); সূর্য্যঃ[অস্মাৎ] ভীষা উদেতি। অগ্নিঃ চ, ইন্দ্রঃ চ, পঞ্চমঃ মৃত্যুঃ (যমঃ) চ অস্মাৎ ভীষা ধাবতি(স্বস্বকর্মসু সত্বরো ভবতীত্যর্থঃ)। ইতিশব্দঃ মন্ত্রসমাপ্তিসূচকঃ)।[অস্য ব্রহ্মণঃ] আনন্দস্য এষা(বক্ষ্যমাণপ্রকারা) মীমাংসা(বিচারণা, তৎফলং নির্ণয়শ্চ; ভবতি।[তদ্যথা] যুবা(প্রথমবয়স্কঃ) স্যাৎ(ভবেৎ)। [তত্রাপি] সাধু-যুবা(সাধুশ্চ অসৌ যুবা চ, স্ববাপি কশ্চিৎ অসাধুঃ ভবতি, সাধুরপি অযবা ভবতি, ইত্যত উক্তম্ সাধুষবেতি),—তথা অধ্যায়কঃ(অধ্যয়ন- শীলঃ,) আশিষ্টঃ(অতিশয়েন আশাস্তা, আশুকারী বা), দৃঢ়িষ্ঠঃ(অতিশয়েন দৃঢ়কায়ঃ), বলিষ্ঠঃ(অতিশয়েন বলবান্ অরোগ ইত্যর্থঃ)[স্যাৎ]। তস্য (যথোক্তস্য যূনঃ)[যদি] বিত্তস্য(বিত্তেন ধনেন) পূর্ণা ইয়ং সর্ব্বা পৃথিবী স্যাৎ (স যদি সম্রাট্ স্যাদিত্যাশয়ঃ)।[তস্য যঃ আনন্দঃ] সঃ মানুষঃ(মনুষ্যসম্বন্ধী) একঃ(পূর্ণঃ) আনন্দঃ[ভবতি]। যে তে(যথোক্তাঃ) মানুষাঃ(মনুষ্য- সম্বন্ধিনঃ) শতং আনন্দাঃ—॥
সঃ(তে) মনুষ্য-গন্ধর্ব্বাণাৎ(যে মনুষ্যতো গন্ধর্ব্বত্বং প্রাপ্তাঃ, তেষাং) একঃ আনন্দঃ। মনুষ্যগন্ধর্ব্বাণাৎ যে তে শতৎ আনন্দাঃ, সঃ (তে)দেবগন্ধর্ব্বানাং(দেবাশ্চ তে গন্ধর্ব্বাচ্চ, তেষা) অকামহতস্য(কামনা- বিহীনস্য) শ্রোত্রিয়স্য চ একঃ আনন্দঃ। দেবগন্ধর্ব্বাণাং যে তে শতৎ আনন্দাঃ, সঃ(তে। চিরলোকলোকানাং(চিরস্থায়ী লোকঃ চিরলোকঃ, স এব লোকঃ বাসভূমিঃ যেষাং, তেষাৎ) পিতৃণাৎ, অকামহতস্য শ্রোত্রিয়স্য চ একঃ আনন্দঃ। চিরলোক-লোকানাং পিতৃণাৎ যে তে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ(তে) আজানজানাং(আজানঃ দেবলোকঃ, তস্মিন্ জাতাঃ আজানজাঃ, তেষাৎ) দেবানাং অকামহতস্য শ্রোত্রিয়স্য চ একঃ আনন্দঃ। আজানজানাং দেবানাং যে তে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ(তে) কৰ্ম্মদেবানাম্ দেবানাং-যে কৰ্ম্মণা(বেদবিহিতেন জ্ঞানরহিতেন অগ্নিহোত্রাদিনা) দেবান্ অপিষন্তি(দেবত্বং প্রাপ্নুবন্তি);[তেষাম্] অকামহতস্য শ্রোত্রিয়স্য চ একঃ আনন্দঃ। কৰ্মদেবানাং যে তে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ(তে) দেবানাং(ত্রয়স্ত্রিংশৎ- সংখ্যকানাং হবিভুজাং) অকামহতস্য শ্রোত্রিয়স্য চ একঃ আনন্দঃ। দেবানাং যে তে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ(তে) ইন্দ্রস্য(দেবরাজস্য) অকামহতস্য শ্রোত্রিয়স্য চ একঃ আনন্দঃ। ইন্দ্রস্য যে তে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ(তে) বৃহস্পতেঃ অকামহতস্য
শ্রোত্রিয়স্য চ এক আনন্দঃ। বৃহস্পতেঃ যে তে শতং আনন্দাঃ, সঃ(তে) প্রজাপতেঃ(ত্রৈলোক্যশরীরস্য ব্রহ্মণঃ) অকামহতস্য শ্রোত্রিয়স্য চ এক আনন্দঃ। প্রজাপতেঃ যে তে শতম্ আনন্দাঃ সঃ।(তে) ব্রহ্মণঃ অকামহতস্য চ একঃ আনন্দঃ ॥ ১-৪। ৩৫ ৫৮॥
মূলানুবাদ।—ইহার ভয়ে বায়ু প্রবাহিত হইতেছে; ইহার ভয়ে সূর্য্য উদিত হইতেছে; এবং ইহাঁরই ভয়ে অগ্নি, ইন্দ্র ও পঞ্চম মৃত্যু স্ব স্ব কার্য্যে ধাবিত হইতেছে। ইহাই আনন্দের প্রকৃত মীমাংসা অর্থাৎ আনন্দের প্রকৃত স্বরূপনির্ণয় সম্বন্ধে বিচার হইতেছে। [ ইহা কি? না, মনে কর, কোন লোক যদি] বয়সে যুবা—শুধু যুবা নহে, রোগাদিহীন যুবা, শাস্ত্রবেত্তা, অথচ উত্তম শাস্ত্রোপদেষ্টা, দৃঢ়- কায় ও বলিষ্ঠ হয়, এবং ধনপূর্ণ সমস্ত পৃথিবী যদি তাহার আয়ত্ত থাকে;[ তাহার যে আনন্দ, তাহাই] মনুষ্যের পক্ষে পূর্ণ একটা আনন্দ। শত গুণিত যে সেই মানুষ, আনন্দ।
তাহাই আবার মনুষ্য-গন্ধর্য্যগণের ও অকামহতশ্রোত্রিয়- গণের এক আনন্দ। আবার মনুষ্য-গন্ধর্ব্বগণের(যাহারা মনুষ্যের পর গন্ধর্বত্ব প্রাপ্ত হইয়াছে, তাহাদের) যে একশত আনন্দ, তাহাও দেবগন্ধর্ব্বগণের(যাহারা দেবভাবের সহযোগে গন্ধর্ব্বত্ব লাভ করিয়াছেন, তাঁহাদের) এক আনন্দ। সেই যে, দেবগন্ধর্ব্বগণের শতগুণিত আনন্দ, তাহাই আবার চিরস্থায়ী লোকাধিষ্ঠিত পিতৃগণের ও অকামহত শ্রোত্রিয়গণের এক আনন্দ(১)। সেই যে, চিরস্থায়ী লোকবাসা পিতৃগণের শতগুণিত আনন্দ, তাহাই আবার আজানজ দেবগণের অর্থাৎ যাঁহারা মৃত্যুক্ত কর্মপ্রভাবে স্বর্গে দেবতারূপে প্রাদুর্ভূত হইয়াছেন, তাঁহাদের এবং নিষ্কাম শ্রোত্রিয়গণের এক আনন্দ। আজানজ দেবগণের যে, সেই এক শত আনন্দ, তাহাই
আবার কর্মদেব দেবগণের অর্থাৎ যাহারা বেদোক্ত অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্ম দ্বারা দেবত্ব লাভ করিয়াছেন, তাহাদেরও অকামহত শ্রোত্রিয়ের এক আনন্দ। কর্মদেব দেবগণের যে, সেই শতগুণিত আনন্দ, তাহা আবার যজ্ঞীয় আহুতিভোজী সেই তেত্রিশ-সংখ্যক দেবতাগণের ও কামনা- শূন্য শ্রোত্রিয়ের এক আনন্দ। সেই আহুতিভোজী দেবগণের যে, একশত আনন্দ, তাহাই আবার দেবরাজ ইন্দ্রের ও নিষ্কাম শ্রোত্রিয় গণের পক্ষে এক আনন্দ। আবার সেই ইন্দ্রেরও যে, এক শত আনন্দ, তাহাই দেবপুরোহিত বৃহস্পতি ও নিষ্কাম শ্রোত্রিয়গণের নিকট এক আনন্দ। বৃহস্পতিরও যে, সেই একশত আনন্দ, তাহাও আবার প্রজাপতির(বিরাটরূপ ব্রহ্মার ও অকামহত শ্রোত্রিয়ের নিকট একটা মাত্র আনন্দ। প্রজাপতির যে, সেই শত আনন্দ, তাহাও আবার ব্রহ্মার(হিরণ্যগর্ভের) ও নিষ্কামচিত্ত শ্রোত্রিয়ের নিকট একটামাত্র আনন্দরূপে পরিগৃহীত হইয়া থাকে।। ৪।৩৫ ৩৮।
শঙ্করভাষ্যম্ – ভীষা ভয়েনাস্মাদ্বাতঃ পরতে। ভীষোদেতি সূর্য্যঃ। ভীষা অস্মাদগ্নিশ্চেন্দ্রশ্চ মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চম ইতি। বাতাদয়ো হি মহার্হাঃ স্বয়মীশ্বরাঃ সন্তঃ পবনাদিকার্য্যেদ্বায়াসবহুলেষু নিয়তাঃ প্রবর্তন্তে; তদ্যুক্তম্ প্রশাস্তরি সতি, যস্মান্নিয়মেন তেষাৎ প্রবর্তনম্, তন্মাদস্তি ভয়কারণং তেষাং প্রশাস্তু ব্রহ্ম। যতস্তে ভৃত্যা ইব রাজ্ঞঃ অস্মাদ্ব্রহ্মণো ভয়েন প্রবর্তন্তে। তচ্চ ভয়কারণমানন্দৎ ব্রহ্ম। তস্যাস্ত ব্রহ্মণ আনন্দস্যৈষা মীমাংসা বিচারণা ভবতি। কিমানন্দস্য মীমাংসমিতি? উচ্যতে – কিমানন্দো বিষয়-বিষয়িসম্বন্ধজনিতো লৌকিকানন্দবৎ, অহোস্বিৎ স্বাভাবিকঃ? ইত্যেবমেষা আনন্দস্য মীমাংসা। ১ তত্র লৌকিক আনন্দো বাহ্যাধ্যাত্মিকসাধনসম্পত্তিনিমিত্ত উৎকৃষ্টঃ। স য এব নিদ্দিশ্যতে ব্রহ্মানন্দানুগমার্থম্। অনেন হি প্রসিদ্ধেনানন্দেন ব্যাবৃত্ত- বিষয়বুদ্ধিগম্য আনন্দোহনুগত্বং শকাতে। লৌকিকোহপ্যানন্দো ব্রহ্মানন্দস্যৈব মাত্রা; অবিদ্যয়া তিরস্কিরমাণে বিজ্ঞানে উৎকৃষ্টমাণায়াৎ চাবিদ্যায়াৎ ব্রহ্মাদিভিঃ কৰ্ম্মবশাদ্যণাবিজ্ঞানং বিষয়াদিসাধনসম্বন্ধবশাচ্চ বিভাব্যমানশ্চ লোকেহনব স্থিতো লৌকিকঃ সম্পদ্যতে, স এবাবিদ্যাকামকর্মাপকর্ষেণ মনুষ্যগন্ধর্ব্বাহ্যত্তরোত্তব-
ভূমিষু অকারহস্তবিচ্ছে, ত্রিয়প্রত্যক্ষো বিভাব্যতে শতগুণোত্তরেৎকর্য্যেণ, গাবিতব্যগর্ভস্য ব্রহ্ম আনন্দ ইতি। ২
নিরস্তে স্ববিদ্যাকৃতে বিষয়বিষয়িবিভাগে বিস্তয়া স্বাভাবিকঃ পরিপূর্ণ এক আনন্দোহদ্বৈতো ভবতীত্যেতমর্থং বিভাবয়িষ্যন্নাহ-যুবা প্রথমবয়াঃ; সাধুযুষেতি সাধুশ্চাসৌ যুবা চেতি যুনো বিশেষণম্। যুবাপ্যসাধুর্ভবতি, সাধুরপ্যযুবা, মতোবিশেষণৎ যুবা স্যাৎ সাধুযুবেতি। অধ্যায়কঃ অধীতবেদঃ। আশিষ্ঠঃ মাশাস্তৃতমঃ; দৃঢ়িষ্টঃ দৃঢ়তমঃ; বলিষ্ঠঃ বলবত্তমঃ; এবমাধ্যাত্মিকসাধনসম্পন্নঃ। অস্যেয়ং পৃথিবী উর্ব্বী সর্ব্বা বিত্ত্য বিত্তেনোপভোগ-সাধনেন দৃষ্টার্থেন অদৃষ্টার্থেন ; কৰ্ম্মসাধনেন সম্পন্না পূর্ণা-রাজা পৃথিবীপতিরিত্যর্থঃ। তস্য চ য আনন্দঃ, একো মানুষ: মনুষ্যাণাং প্রকৃষ্ট এক আনন্দঃ। তে যে শতং মানুষা আনন্দাঃ, স একো মনুষ্যগন্ধর্ব্বাণামানন্দঃ; মানুষানন্দাৎ শতগুণেনোৎকৃষ্টঃ মনুষ্য- গন্ধর্ব্বাণামানন্দো ভবতি। মনুষ্যাঃ সন্তঃ কৰ্ম্মবিদ্যাবিশেষাদগন্ধর্ব্বত্বং প্রাপ্তাঃ মনুষ্য- গন্ধর্ব্বাঃ। তে হন্তর্ধানাদিশক্তিসম্পন্নাঃ সূক্ষ্মকার্য্যকরণাঃ; তস্মাৎ প্রতিঘাতাল্লত্বং তেষাং-শব্দপ্রতিঘাতশক্তিসম্পন্নাঃ। ততোহ প্রতিহন্যমানস্থ্য প্রতিকারবতো মনুষ্যগন্ধর্ব্বস্য স্যাচ্চিত্তপ্রসাদঃ। তৎপ্রসাদবিশেষাৎ সুখবিশেষাতিব্যক্তিঃ। এবং পূর্ব্বস্যাঃ পূর্ব্বস্যাঃ ভূমেরুত্তরস্তামুত্তরস্যাৎ ভূমৌ প্রসাদবিশেষতঃ শতগুণে- নানন্দোৎকর্ষ উপপদ্যতে। ৩
প্রথমং তু অকামহতাগ্রহণং মনুষ্যবিষয়ভোগকামানভিহতস্য শ্রোত্রিয়স্ত মনুষ্যানন্দাৎ শতগুণেনানন্দোৎকর্ষঃ মনুষ্যগন্ধর্ব্বেণ তুল্যো বক্তব্য ইত্যেষমর্থম্। সাধুযুবা অধ্যায়ক ইতি শ্রোত্রিয়ত্বাবৃজিনত্বে গৃহেতে। তে হ্যবিশিষ্টে সর্ব্বত্র। অকামহতত্ত্বং তু বিষয়োৎকর্ষাপকর্ষতঃ সুখোৎকর্ষাপকর্ষায় বিশেষ্যতে; অতঃ অকামহতগ্রহণং, তদ্বিশেষতঃ শতগুণ-সুখোৎকরোপলন্ধেঃ অকামহতত্ত্বস্ত পরমানন্দপ্রাপ্তিসাধনত্ববিধানার্থম্। ব্যাখ্যাতমন্যৎ। ৪
দেবগন্ধর্ব্বা জাতিত এব। চিরলোক-লোকানাম্ ইতি পিতৃণাং বিশেষণম্।- চিরকালস্থায়ী লোকো যেষাৎ পিতৃণাং, তে চিরলোকলোকা ইতি। আজান ইতি দেবলোকঃ, তস্মিন্নাজানে জাতা আজানজা দেবাঃ, স্মার্তকৰ্ম্ম- বিশেষতো দেবস্থানেষু জাতাঃ। কৰ্ম্মদেবাঃ—যে বৈদিকেন কর্মণা অগ্নিহোত্রাদিনা কেবলেন দেবানপিযন্তি। দেবা ইতি ত্রয়াত্রিংশদ্ধবির্জ্জঃ। ইন্দ্রস্তেষাৎ স্বামী; তস্য চাচাৰ্য্যো বৃহস্পতিঃ। প্রজাপতিঃ বিরাট্ ত্রৈলোক্য- শরীরো ব্রহ্মা সমষ্টিব্যষ্টিরূপঃ সংসারমণ্ডলব্যাপী। ৫
১১
যত্রৈতে আনন্দতেদা একতাং গচ্ছন্তি, ধৰ্ম্মশ্চ তন্নিমিত্তঃ জ্ঞানঞ্চ তদ্বিষয়ম্ অকামহতত্বৎ চ নিরতিশয়ৎ যত্র, স এষ হিরণ্যগর্ভো ব্রহ্মা, তস্যৈষ আনন্দঃ শ্রোত্রিয়েণ অবৃজিনেন অকামহতেন চ সর্ব্বতঃ প্রত্যক্ষমুপলভ্যতে। তস্মাদেতানি ত্রীণি সাধনামীত্যবগম্যতে। ‘তত্র শ্রোত্রিয়ত্বাবৃজিনত্বে নিয়তে, অকামহতত্ত্বৎ তু উৎকৃষ্যতে, ইতি প্রকৃষ্টসাধনতা অবগম্যতে তস্য। অকামহতত্ব-প্রকর্ষ- ‘তশ্চোপলভ্যমানঃ শ্রোত্রিয়প্রত্যক্ষো ব্রহ্মণ আনন্দঃ, যন্য পরমানন্দস্য মাত্রা একদেশঃ “এতস্যৈবানন্দস্যান্যানি ভূতানি মাত্রামুপজীবস্তি” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ।’ স এষ আনন্দঃ, যস্য মাত্রা সমুদান্তস ইব বিপ্রুষঃ প্রবিভক্তা যত্রৈকতাংগতাঃ, -স এষ পরমানন্দঃ স্বাভাবিকঃ, অদ্বৈতাৎ; আনন্দানন্দিনোচ্চাবিভাগোহত্র। ১-৪৷৷ ৩২-৩৮ ৷৷
ভাস্যানুবাদ। বায় ইহারই ভয়ে প্রবাহিত হইতেছেন, এবং সূর্য্য উদিত হইতেছেন। ইহারই ভয়ে অগ্নি, ইন্দ্র ও মৃত্যু[স্ব স্ব কার্য্যে] ধাবিত হইতেছেন।[এখানে বাত ও সূর্য্যাদির সঙ্গে গণনা করিলে মৃত্যু পঞ্চম হয়, এইজন্য মৃত্যুকে ‘পঞ্চম’ বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে]। বায়ু প্রভৃতি দেবতাগণ নিজেরা বিশেষ গৌরবান্বিত ও প্রভুশক্তি-সম্পন্ন হইয়াও যে, ক্লেশকর প্রবহণাদি কার্য্যে যথানিয়মে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন, ইহা একজন শাসনকর্তার অধীনে থাকিলেই সম্ভবপর হয়। যেহেতু তাঁহারা এইরূপ নিয়মিতভাবে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইতেছেন, সেই হেতু[বুঝা যাইতেছে যে,] তাঁহাদের ভয়ের কারণীভূত শাসনকর্তা ব্রহ্ম নিশ্চয়ই আছেন। রাজার ভয়ে ভৃত্যগণ যেমন কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে, তেমনি তাঁহারাও(বায়ু প্রভৃতি দেবতাগণও) যে ব্রহ্মের ভয়ে কার্য্যে প্রবৃত্ত হন, সেই যে ভয়-কারণ ব্রহ্ম, তিনি আনন্দ-স্বরূপ। সেই এই ব্রহ্মের স্বরূপভূত আনন্দের এইরূপ মীমাংসা অর্থাৎ বিচার হইয়া থাকে। ভাল, আনন্দের সম্বন্ধে বিচার বা মীমাংসার বিষয় কি আছে? হাঁ, বলা হইতেছে- এই ব্রহ্মানন্দ কি ব্যবহারিক আনন্দের ন্যায় বিষয়-বিষয়িভাবঘটিত? অথবা স্বাভাবিক? এই প্রকার বিচারকে লক্ষ্য করিয়াই এখানে ‘মীমাংসা’ শব্দটা প্রযুক্ত হইয়াছে। ১‘। ১
(১) অভিপ্রায় এই যে, সাধারণতঃ লোকে, যে আনন্দ অনুভব করিয়া থাকে, তাহা বিষয়-বিষয়ি-ভাব সম্বন্ধঘটিত, অর্থাৎ ব্যবহারিক আনন্দ স্থলে আত্মা বা বুদ্ধি হয় বিষয়ী, আর বাহ্য বা আস্তর কোন প্রিয় বস্তু হয় বিষয়। চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বিষয়ীর সহিত মনখ ঐ বিষয়ের সম্বন্ধ ঘটে, তখনই আনন্দের আবির্ভাব হইয়া
বাহু ও আধ্যাত্মিক বিবিধ সাধন-সামগ্রীর সাহায্যে উৎপন্ন লৌকিক সেই আনন্দই জগতে সর্ব্বাপেক্ষা উত্তম, ব্রহ্মানন্দে অন্তর্ভাব-প্রদর্শনার্থ এখানে যাহার নির্দেশ করা হইতেছে। বস্তুতই লোকসিদ্ধ এই আনন্দ দ্বারা বিষয়-ব্যাবৃত্ত অর্থাৎ নির্বিষয়ক বুদ্ধিমাত্রগম্য আনন্দকে বুঝা যাইতে পারা যায়; কেন না, লৌকিক আনন্দও ব্রহ্মানন্দেরই অংশ। কেবল অবিদ্যার প্রভাবে বিজ্ঞান বা জ্ঞানশক্তি আবৃত হওয়ায় এবং অজ্ঞানবৃত্তি বৃদ্ধি পাওযায়, প্রাক্তন কৰ্ম্মবাসনাবশে এবং আনন্দজনক বিষয়াদির সহিত সম্বন্ধ নিবন্ধন ব্রহ্মাদি জীবগণ নিজ নিজ জ্ঞানানু- সারে অনুভব করে বলিয়াই, ব্যবহার জগতে উহা লৌকিক ও অস্থির বা অনিত্য রূপে পরিচিত হয় মাত্র। অবিদ্যা ও কাম কৰ্ম্ম প্রভৃতি দোষের হ্রাস ঘটিলে পর, সেই ব্রহ্মানন্দই আবার যথাযোগ্যরূপে মনুষ্য ও গন্ধর্ব্ব প্রভৃতি ক্রমোৎকৃষ্ট জীব- গণের নিকট এবং অকামহত(নিষ্কাম) বিদ্বান শ্রোত্রিয়ের নিকট উত্তরোত্তর শতগুণ উৎকর্ষসম্পন্নরূপে যথাযথভাবে আবির্ভূত হয়। এইরূপে অভিব্যক্তির তারতম্য-সীমা হিরণ্যগর্ভে যাইয়া পরিসমাপ্ত হইয়া থাকে। ২
অবস্তাকৃত বিষয়-বিষয়িতাবাপন্ন সম্বন্ধবিভাগ অপনোদিত হইলে পর, বিদ্যা-প্রভাবে তখন পরিপূর্ণ(তারতম্যরহিত) এক অদ্বিতীয় স্বাভাবিক আনন্দ আবির্ভূত হইয়া থাকে,—এই বিষয়টা বুঝাইবার উদ্দেশ্যে বলিতেছেন—
যে লোক যুবা—প্রথম বয়স্থ, যুবার মধ্যেও কেহ কেহ অসাধুস্বভাব হইতে পারে; এই জন্য বিশেষ করিয়া বলিলেন—শুধু যবা নহে—সাধু যুবা অর্থাৎ সম্ভাবসম্পন্ন যুবা, অথচ অধ্যাপক—বেদবিদ্যায় অভিজ্ঞ ও আশিষ্ট অর্থাৎ শাসন সমর্থ, এবং দৃঢ়কায় ও বলিষ্ঠ, এই প্রকার আধ্যাত্মিক সাধনসম্পন্ন যে লোক, তাহার যদি উপভোগ-সাধন ধনসম্পদে এবং ঐহিক ও পারলৌকিক কর্ম্ম-সাধনে পরিপূর্ণ এই সমস্ত পৃথিবীমণ্ডল করায়ত্ত হয়, অর্থাৎ সে লোক যদি ঐরূপ ঐহিক ও পার- লৌকিক ভোগসাধন ও কর্ম্মসাধন সম্পন্ন সমস্ত পৃথিবীর অধিপতি—রাজা হয়।
তাহা হইলে, সেরূপ লোকের যে আনন্দ, তাহাই মানুষ আনন্দ, অর্থাৎ মনুষ্যগণের পক্ষে সর্ব্বোৎকৃষ্ট এক আনন্দ[ বলিয়া গৃহীত হইতে পারে]। মনুষ্যসম্পর্কিত সেই যে আনন্দের শতগুণ, তাহাই মনুষ্যগন্ধর্ব্বগণের পক্ষে এক আনন্দ, অর্থাৎ মানুষের পূর্ণ আনন্দ অপেক্ষা শতগুণ অধিক আনন্দ হইতেছে মনুষ্যগন্ধর্ব্বগণের।
যাহারা মনুষ্য হইয়াও কৰ্ম্ম ও বিদ্যাবিশেষের ফলে গন্ধর্ব্বত্ব লাভ করিয়াছেন, তাঁহারাই মনুষ্য গন্ধর্ব্ব নামে অভিহিত। তাঁহারা অন্তর্ধান(অদৃশ্য হওয়া) প্রভৃতি কার্য্যের অনুকূল বিশেষ শক্তিসম্পন্ন এবং সূক্ষ্ম দেহেন্দ্রিয়াদিবিশিষ্ট হওয়ায় তাহাদের বাধাবিঘ্ন খুবই কম; অধিকন্তু শীতোষ্ণাদি দ্বন্দ্ব-প্রতিকারের শক্তিও তাহাদের যথেষ্ট। সেই কারণে অপ্রতিহতভাবে প্রতিকার-সামর্থ্য থাকায় সেই মনুষ্যগন্ধর্ব্বগণের চিত্তপ্রসন্নতা হওয়া খুবই সম্ভবপর। চিত্তপ্রসন্নতার প্রাচুর্য্য নিবন্ধন তাহাদের বিশেষভাবে সুখাভিব্যক্তিও সম্ভবপর হয়। এইরূপ চিত্তপ্রসন্নতার উৎকর্ষানুসারে পূর্ব্ব পূর্ব্ব অবস্থা(মনুষ্য গন্ধর্ব্বাদি অবস্থা) অপেক্ষা পরবর্তী অবস্থায় শতগুণে অধিক আনন্দের উৎকর্ষ উপপন্ন হইতেছে। ৩
প্রথমে যে, ‘অকামহতত্ত্ব’ বলা হয় নাই, তাহার উদ্দেশ্য এই যে, যাহারা শ্রোত্রিয়(১), তাহারা স্বভাবতই মনুষ্য-ভোগে কামনারহিত; সুতরাং তাহাদের আনন্দ স্বতই অত্যন্ত অধিক--সর্ব্ব পৃথিবীশ্বর সার্বভৌমের আনন্দ অপেক্ষাও কম নহে। এখন তাহাদের আনন্দকে যদি সার্বভৌমের আনন্দের সহিত সমান করা হয়, তাহা হইলে বড়ই অসঙ্গত করা হয়; এই কারণে প্রথমে ‘অকামহত’ শ্রোত্রিয়ের উল্লেখ করা হয় নাই। বিশেষতঃ ‘সাধু যুবা’ ও ‘অধ্যায়ক’ শব্দ দ্বারা তৎসহচর শ্রোত্রিয়ত্ব ও অবৃজিনত্বেরও গ্রহণ করাই হইয়াছে। ইহার পরেও সর্ব্বত্র ঐ দুইটা ধর্ম্মের সম্বন্ধ বুঝিতে হইবে।[সকাম পুরুষের পক্ষে] ভোগ্য বিষয়ের উৎ কর্ষ ও অপকর্ষ অনুসারে সুখেরও উৎকর্ষ ও অপকর্ষ হইয়া থাকে,[কিন্তু কামনা রহিত পুরু‘ঘর পক্ষে সুখের সেরূপ উৎকর্ষাপকর্ষ হয় না;] এই জন্যই শ্রোত্রিয়কে
“একাং শাখাং সকন্নাঃ বা বড় ভিরঙ্গৈরধীত্য বা। ষটুকৰ্ম্মনিয়তো বিপ্রঃ শ্রোত্রিয়ো নাম ধর্মবিৎ।” অর্থাৎ যিনি নিজে যে বেদশাখী, সেই বেদশাখাটা কল্পসূত্রের সহিত কিংবা ছয়টা বেদাঙ্গের সহিত অধ্যয়ন করিয়া ব্রাহ্মণোচিত যজ্ঞনাদি ষটকর্ম্মে নিরত থাকেন, তাদৃশ ধর্মজ্ঞ ব্রাহ্মণ শ্রোত্রিয় নামে বিখ্যাত।
‘অকামহত’ বিশেষণে বিশেষিত করা হইয়াছে। সাধারণতঃ অকামহত শ্রোত্রিয়ের সুখোৎকর্ষ শতগুণে অধিক দেখিতে পাওয়া যায়; এইজন্য অকামহতত্ব যে, পরমানন্দ লাভের প্রকৃষ্ট উপায়, তদ্বিধানার্থ এখানে ‘অকামহত’ বিশেষণ প্রদত্ত হইয়াছে। ভাষ্যের অপরাপর অংশ প্রায় ব্যাখ্যাতই আছে। ৪
যাহারা জাতিতেই গন্ধর্ব্ব, তাহারা দেবগন্ধর্ব্ব। ‘চিবলোক-লোকানাং’ চিরস্থায়ী লোকবাসী) কথাটী পিতৃগণের বিশেষণ। যে পিতৃগণের বসতিস্থান চরকালস্থায়ী(অল্পকালস্থায়ী নহে), তাহারা চিরলোক-লোক। ‘আজান’ অর্থ দেবলোক। সেই আজানে উৎপন্ন দেবতাগণ আজানজ, যাহারা স্মৃতিশাস্ত্র- রহিত কর্মফলে দেবস্থানে স্বর্গে জন্মিয়াছেন। যাহারা উপাসনারহিত করলই বেদবিহিত অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্ম দ্বারা দেবত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহারা কর্মদেব’ নামে অভিহিত। ‘দেব’ শব্দে তেত্রিশসংখ্যক হরিভোজী(যজ্ঞভাগ ভোজী) বুঝিতে হইবে।(১) ইন্দ্র হইলেন, তাঁহাদের অধিপতি; বৃৎস্পতি তাঁহার আচার্য্য। প্রজাপতি অর্থ সমষ্টি-বাষ্টিরূপী ব্রহ্ম! তিনি সমস্ত সংসারমত্তসব্যাপী ও ত্রিলোক-শরীরধারী। ৫
পূর্ব্বোক্ত নানাবিধ আনন্দরাশি যেখানে একত্ব প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ একটা বলিয়া পরিগণিত হয়, এবং যেখানে সেই আনন্দের হেতুভূত ধৰ্ম্ম, আনন্দবিষয়ক জ্ঞান ও অকামহতত্ত্ব গুণ সর্ব্বাপেক্ষা অধিক, তিনিই হিরণ্যগর্ভনামক ব্রহ্মা। নিষ্পাপ, অকামহত ও শ্রোত্রিয় পুরুষ হিরণ্যগর্ভের সেই আনন্দ প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন। অতএব বুঝা যাইতেছে যে শ্রোত্রিয়ত্ব অবুজিনত্ব(নিষ্পাপত্ব) ও অকামহতত্ত্ব, এই তিনটা উক্ত আনন্দ সাক্ষাৎকারের উপায়। তন্মধ্যে শ্রোত্রিয়ত্ব ও অবুজিনত্ব ধৰ্ম্ম- সমনিয়ত, অর্থাৎ শ্রোত্রিয় হইলেই তাহাকে অবুজিন হইতে হয়; সুতরাং এই দুইটা ধৰ্ম্ম সহচর; কিন্তু অকামহতত্ত্ব ধৰ্ম্মটী উৎকর্ষসাধক মাত্র; সুতরাং উক্ত উপায়ত্রয়ের মধ্যে অকামহতত্ত্ব ধর্ম্মের উৎকর্ষ প্রতীত হইতেছে। সেই অকামহতত্ত্ব ধর্ম্মের উৎকর্ষের ফলে শ্রোত্রিয়কর্তৃক উপলব্ধ বা প্রত্যক্ষীকৃত যে হিরণ্যগর্ভের আনন্দ, তাহাও আবার ‘অন্যান্য ভূতগণ এই আনন্দেরই মাত্রা(অংশমাত্র) উপভোগ করে’
(১) এখানে তিন রকম দেবতার কথা বলা আছে—কর্মদেব, আজানদেব ও দেব। এইজন্য কর্মদেব ও আজানদেবের পৃথক্ পরিচয় দিয়া শেষে দেবশব্দে স্বাভাবিক দেবতার গ্রহণ করা হইয়াছে। দেবতার সংখ্যা তেরিশ; তাহাদের নাম—বসুগণ আট; রুদ্র এগার; আদিত্য দ্বাদশ; ইন্দ্র ও প্রজাপতি।
এই শ্রুতিবাক্যানুসারে, যে পরমানন্দের মাত্রা বা একদেশ[বলিয়া গণ্য] হয়, সেই এই আনন্দ, যাহার মাত্রাসমূহ সমুদ্রের জলবিন্দুসম ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্তভাবে যেখানে যাইয়া এক হইয়া যায়, তাহাই সেই স্বভাবসিদ্ধ পরমানন্দ। কারণ, সেখানে আর দ্বৈতসম্বন্ধ নাই। এখানে আনন্দ ও আনন্দবিশিষ্টের অবিভাগ বিবক্ষিত হইয়াছে। ১—৪৷৫—৩৮।
সরলার্থঃ। অথেদানীং মীমাংসাফলমুপসংহ্রিয়তে ‘যশ্চায়ম্’ ইত্যাদি। [যঃ খলু আকাশাদি কার্য্যপ্রপঞ্চৎ সৃষ্ট্বা তদেবানু প্রাবিশৎ;] সঃ যঃ(প্রসিদ্ধঃ চ(অপি) অয়ং(স্বয়ং প্রকাশমানঃ) পুরুষে(পঞ্চকোষাত্মকে)[ব্রহ্মপুচ্ছতেন উক্তঃ], যঃ(বিদুষাম্ অপরোক্ষঃ) চ(অপি) অসৌ(অস্মদ্বিধানাৎ পরোক্ষঃ আদিত্যে(আদিত্যমণ্ডলে)। সঃ যঃ(পরোক্ষাপরোক্ষরূপঃ) একঃ(পুরুষে আদিত্যে চ বর্তমানোহপি বাস্তবভেদরহিতঃ; সঃ যঃ(যঃ কশ্চন লোকঃ) এবংবিদ্(আদিত্যে পুরুষে চ বর্তমানমানন্দম্ অভেদেন জানন্ সন্) অম্মাৎ লোকাৎ(পৃথিব্যাঃ) প্রেত্য(আত্মানং পরাবৃত্য; অথবা মৃত ইব অভিলাষশূন্যঃ সন্) এতৎ অন্নময়ম্ অন্নবিকারাাত্মকং) আত্মানং(আত্মত্বেনোপকল্পিতং) উপসং- ক্রামতি(সর্ব্বং স্থূলভূতং অন্নময়ং আত্মানং পশ্যতি) তথা মনোময়ম্ আত্মানং উপসংক্রামতি তথা এতম্ আনন্দময়ম্ আত্মানং উপসঙ্ক্রামতি।[অথ সর্ব্বাত্মত্ব জ্ঞানেনানন্দময়ং ব্রহ্ম প্রাপ্নোতীতি ভাবঃ] ॥ ৫। ৩৯।
মূলানুবাদ।[যিনি আকাশাদি বস্তুনিচয় সৃষ্টিপূর্ব্বক তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন], সেই যে পরোক্ষ ও অপরোক্ষাত্মক আনন্দ, যিনি পুরুষে অর্থাৎ পঞ্চকোষাত্মক দেহমধ্যে ব্রহ্মস্বরূপে উক্ত হইয়াছেন, এবং যিনি আদিত্যমণ্ডলে প্রকাশময়রূপে বিদ্যমান আছেন; সেই উভয়ই এক-অভিন্নস্বরূপ। যে কোন লোক এইরূপ অভেদজ্ঞান লাভ করত এই ভোগরাজ্য হইতে আপনাকে ফিরাইয়া লইতে পারেন,- মৃতব্যক্তি যেমন থাকিয়াও অভিলাষরহিত থাকে, তেমনি নিস্পৃহ হইতে পারেন, তিনি তাহার ফলে এই(পূর্ব্বোক্ত] অন্নময় আত্মাকে লাভ করেন, অর্থাৎ অন্নময় দেহপিণ্ডের অতিরিক্ত বস্তুই দর্শন করেন না। এইরূপ যিনি এই প্রাণময় আত্মাকে লাভ করেন; এই মনোময় আত্মাকে লাভ করেন। এই বিজ্ঞানময়
আত্মাকে প্রাপ্ত হন, এবং এই আনন্দময় আত্মাকে লাভ করেন। অভিপ্রায় এই যে, তিনি উক্তপ্রকার অভেদজ্ঞানের ফলে পঞ্চকোশ- রূপে অভয় ব্রহ্মানন্দে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন ॥ ৫।৩৯॥
ইতি অষ্টমানুবাক ব্যাখ্যা। ৮॥
শাপরভাষ্যম্।—তদেতন্মীমাংসাফলমুপসংহ্রিয়তে—স যশ্চায়ং পুরুষ হীতি। যঃ গুহায়াং নিহিতঃ পরমে ব্যোম্নি আকাশাদি কার্য্যং সৃষ্ট্বা অন্নময়ান্তৎ, তদেবাহুপ্রবিষ্টঃ, স য ইতি নিশ্চয়তে। কোহসৌ? অয়ং পুরুষে যশ্চাসাবাদিত্যে যঃ পরমানন্দঃ শ্রোত্রিয়প্রত্যক্ষো নিদ্দিষ্টঃ, যস্যৈকদেশং ব্রহ্মাদীনি ভূতানি সুখার্হাণ্যুপজীবন্তি, স যশ্চাসাবাদিত্যে ইতি নির্দিষ্ট্যতে। স একঃ ভিন্নপ্রদেশস্থ- ঘটাকাশাকাশৈকত্ববৎ। ১
ননু তন্নিদ্দেশে, স যশ্চায়ং পুরুষ ইত্যবিশেষতোহধ্যাত্মং ন যুক্তো নিদ্দেশঃ; যশ্চায়ং দক্ষিণেহক্ষন্নিতি তু যুক্তঃ; প্রসিদ্ধত্বাৎ ন; পরাধিকারাৎ। পরো হ্যাত্মাত্রাধিকৃতঃ “অদৃশ্যেনাত্মে” “ভীষাস্মাদ্বাতঃ পরতে” ‘সৈষানন্দস্য মীমাংসা” ইতি। ন হুকস্মাদ-প্রকৃতো যুক্তো নির্দ্দেশুম্, পরমাত্মবিজ্ঞানং চ বিবক্ষিতম্। তস্মাৎ পর এব নিদ্দিশ্যতে স এক ইতি ২
নদ্বানন্দস্য মীমাংসা প্রকৃতা, তস্যা অপি ফলমুপসংহর্তব্যম্। অভিন্নঃ স্বাভাবিকঃ আনন্দঃ পরমাত্মৈব, ন বিষয়বিষিসম্বন্ধজনিত ইতি। ননু তদনুরূপ এবায়ৎ নির্দেশঃ “স যশ্চায়ং পুরুষে যশ্চাসাবাদিত্যে, স একঃ” ইতি ভিন্নাধিকরণস্থ বিশেষোপমর্দ্দেন। নম্বেবমপ্যাদিত্যবিশেষগ্রহণমনর্থকম। ন অনর্থকম্; উৎকর্ষাপ- কর্ষাপোহার্থত্বাৎ। দ্বৈতস্য হি যো মূর্তামূর্ত্তলক্ষণস্য পর উৎকর্ষঃ সবিত্রভ্যস্তর্গতঃ, স চেৎ পুরুষগতবিশেষোপমদ্দেন পরমানন্দমপেক্ষ্য সমো ভবতি, ন কশ্চিদুৎকর্যোহপ- কার্ষা বা তাং গতিং গতস্যেত্যভয়ং প্রতিষ্ঠাৎ বিন্দতে ইত্যুপপন্নম্। ৩
অস্তি নাস্তীতানুপ্রশ্নো ব্যাখ্যাতঃ। কার্য্যরসলাভ-প্রাণনাভয় প্রতিষ্ঠাভয়- দশনোপপত্তিভ্যোহস্ত্যের তদাকাশাদিকারণং ব্রহ্ম ইত্যপাকৃতঃ অনুপ্রপ্রশ্ন একঃ; দ্বাবন্যাবনুপ্রশ্নৌ বিদ্বদবিদুযোঃ ব্রহ্মপ্রাপ্ত্যপ্রাপ্তিবিষয়ো। তত্র বিদ্বান সমন্নুতে ন সমশ্নুত ইত্যনুপ্রশ্নোহস্থ্যঃ; তদপাকরণায়োচ্যতে। মধ্যমোহনুপ্রশ্নঃ অস্যাপ- করণাদেব অপাকৃত ইতি তদপাকরণায় ন যত্যতে। স যঃ কশ্চিৎ এবং যথোক্তং ব্রহ্ম উৎসূজ্যোৎকর্ষাপকর্ষমদ্বৈতং সত্যং জ্ঞানমনস্তুমস্থীত্যেবং বেত্তীতি এবংবিং, এবংশব্দস্য প্রকৃতপরামর্শার্থত্বাৎ।
স কিম্? অস্মাল্লোকাৎ প্রেত্য-দৃষ্টাদৃষ্টেষ্টবিষয়সমুদয়ো হি অয়ং লোকঃ, তস্মাদম্মাল্লোকাৎ প্রেত্য প্রত্যাবৃত্য নিরপেক্ষো ভূত্বা এতং যথাব্যাখ্যাতং অন্নময়মাত্মানমুপসংক্রামতি-বিষয়জাতং অন্নময়াৎ পিণ্ডাত্মনো ব্যতিরিক্তং ন পশ্যতি, সর্ব্বং স্থূলভূতমন্নময়মাত্মানং পশ্যতীত্যর্থঃ। ততঃ অভ্যন্তরমেতং প্রাণময়ং সর্ব্বান্নময়াত্মস্থমবিভক্তম্ অথৈতং মনোময়ং বিজ্ঞানময়মানন্দময়মাত্মানমুপ- সংক্রামতি। অপাদৃশ্যেহনাম্ম্যেহনিরুক্তেহনিলয়নে অভয়ং প্রতিষ্ঠাৎ বিন্দতে। ৫ তত্রৈতচ্চিন্ত্যম্-কোয়মেবংবিৎ, কথং বা সংক্রামতি; কিং পরম্মাদা- মনোহন্যঃ সংক্রমণকর্তা প্রবিভক্তঃ, উত স এবেতি। কিং ততঃ? যন্তস্যঃ, স্যাৎ শ্রুতিবিরোধঃ-‘তৎসৃষ্টা তদেবানুপ্রাবিশৎ’ ‘অন্যোসাবন্যোহহমস্মীতি।’ ন স বেদ’ ‘একমেবাদ্বিতীয়ং ‘তত্ত্বমসি’ ইতি। অথ স এব আনন্দময়মাত্মানমুপ- সংক্রামতীতি; কৰ্ম্মকর্তৃত্বানুপপত্তিঃ। পরস্যৈব চ সংসারিত্বং পরাভবো বা। যদ্যভয়থা প্রাপ্তো দোষো ন পরিহর্তুং শক্যত ইতি ব্যর্থ চিন্তা। অথ অন্যতরস্মিন্ পক্ষে দোষাপ্রাপ্তিঃ, তৃতীয়ে বা পক্ষে অদুষ্টে, সু এব শাস্ত্রার্থ ইতি ব্যর্থৈব চিন্তা; ন, তন্নিদ্ধারণার্থত্বাৎ। সত্যং প্রাপ্তো দোষো ন শক্যঃ পরিহর্ত্তুমত্তস্মিন্ তৃতীয়ে বা পক্ষে অদুষ্টে অবধৃতে ব্যর্থ। চিন্তা স্যাৎ; নতু সোহবধৃতঃ, ইতি তদবধারণার্থত্বাদর্থবত্যেবৈষা চিন্তা। সত্যমর্থবর্তী চিন্তা, শাস্ত্রার্থাবধারণার্থত্বাৎ। চিন্তয়সি চ ত্বং নতু নির্ণেষ্যসি। কিং ন নির্ণেতব্যমিতিবেদবচনং? ন; কথং তহি? বহুপ্রতিপক্ষত্বাৎ; একত্ববাদী ত্বং, বেদার্থপরত্বাৎ; বহবো হি নানাত্ম- বাদিনো বেদবাহ্যাঃ ত্বংপতিপক্ষাঃ; অতো মমাশঙ্কা ন নির্ণেষ্যসীতি। এতদেব মে স্বস্ত্যয়নং-যন্মামেকযোগিনমনেকযোগিবহুপ্রতিপক্ষমাথ। অতে, জেষ্যামি সর্ব্বান্ আরতে চ চিন্তাম্। ৬ স এব তু স্যাৎ, তদ্ভাবস্থ্য বিবক্ষিতত্বাৎ। তদ্বিজ্ঞানেন পরমাত্মভাবো হি অত্র বিবক্ষিতঃ - ‘ব্রহ্মবিদাপ্নোতি পরং’ ইতি। নহি অন্যস্তু অন্যভাবাপত্তিরুপ- পদ্যতে। ননু তস্যাপি তদ্ভাবাপত্তিরনুপপন্নৈব। ন, অবিস্তাকৃতানাত্মাপোহার্থ- ত্বাৎ। যা হি ব্রহ্মবিয়া স্বাত্মপ্রাপ্তিরুপদিশ্যতে, সা অবিস্তাকৃতস্য অন্নাদি- বিশেষাত্মনঃ আত্মত্বেনাধ্যারোপিতস্য অনায়নঃ অপোহার্থা। কথমেবমর্থতা অবগমাতে? বিদ্যামাত্রোপদেশাৎ। বিদ্যায়াশ্চ দৃষ্টং কার্য্যং অবিস্তানিবৃত্তিঃ; তচ্চেহ বিদ্যামাত্রমাত্মপ্রাপ্তৌ সাধনমুপদিশ্যতে। মার্গবিজ্ঞানোপদেশবদিতি চেৎ, তদাত্মত্বে বিদ্যামাত্রসাধনোপদেশোহহেতুঃ। কস্মাৎ? দেশান্তরপ্রাপ্তৌ মার্গ- বিজ্ঞানোপদেশদর্শনাৎ। নহি গ্রাম এব গস্তেতি চেৎ, ন; বৈধর্ম্যাৎ, তত্র হি
গ্রামবিষয়ং নোপদিশ্যতে, তৎপ্রাপ্তিমার্গবিষয়মেবোপদিশ্যতে বিজ্ঞানং; ন তথেহ ব্রহ্মবিজ্ঞানব্যতিরেকেণ সাধনান্তরবিষয়ং বিজ্ঞানমুপদিশ্যতে। ৭
উক্তকৰ্ম্মাদি-সাধনাপেক্ষং ব্রহ্মবিজ্ঞানং পরপ্রাপ্তৌ সাধনমিতি চেৎ, ন; নিত্যস্বাম্মোক্ষস্যেত্যাদিনা প্রত্যুক্তত্বাৎ। শ্রুতিশ্চ ‘তৎ সৃষ্ট্বা তদেবাহুপ্রাবিশৎ’ ইতি কার্য্যস্ত তদাত্মত্বং দর্শয়তি অভয়-প্রতিষ্ঠোপপত্তেশ্চ। যদি বিদ্যাবান্ স্বাত্মনোহন্যৎ ন পশ্যতি, ততঃ অভয়ং প্রতিষ্ঠাৎ বিন্দত ইতি স্যাৎ, ভয়হেতোঃ পরস্য অন্যস্য অভাবাৎ। অন্যস্য চ অবিদ্যাকৃতত্বে বিদ্যয়া অবস্তত্বদর্শনোপপতিঃ; তদ্ধি দ্বিতীয়স্য চন্দ্রস্য অসত্ত্বম্, যদতৈমিরিকেণ চক্ষুষ্মতা ন গৃহ্যতে; নৈবং ন গৃহ্যতে ইতি চেৎ, ন; সুষুপ্তসমাহিতয়োরগ্রহণাৎ। ৮
সুষুপ্তেহগ্রহণমন্যাসক্তবদিতি চেৎ, ন, সর্ব্বাগ্রহণাৎ। জাগ্রৎস্বপ্নয়োরন্য গ্রহণাৎ সত্ত্বমেবেতি চেৎ, ন; অবিদ্যাকৃতত্বাৎ জাগ্রৎস্বপ্নয়োঃ; যদন্যগ্রহণং জাগ্রৎ-স্বপ্নয়োঃ, তদবিদ্যাকৃতম্, বিদ্যাভাবে অভাবাৎ। সুষুপ্তে অগ্রহণমপি অবিদ্যাকৃতমিতি চেৎ, ন; স্বাভাবিকত্বাৎ। দ্রব্যস্য হি তত্ত্বমবিক্রিয়া, পরানপেক্ষ- ত্বাৎ; বিক্রয়া ন তত্ত্বম্, পরাপেক্ষত্বাৎ। নহি কারকাপেক্ষৎ বস্তুনস্তত্ত্বৎ; সতো বিশেষঃ কারকাপেক্ষঃ, বিশেষশ্চ বিক্রিয়া; জাগ্রৎস্বপ্নয়োশ্চ গ্রহণম্ বিশেষঃ। যদি যস্য নান্যাপেক্ষং স্বরূপং তৎ তস্য তত্ত্বম্; যদন্যাপেক্ষং, ন তৎ তত্ত্বম্; অন্যাভাবে অভাবাৎ তস্মাৎ স্বাভাবিকত্বাৎ জাগ্রৎস্বপ্নবৎ ন, সুষুপ্তে বিশেষঃ। যেষাং পুনরীশ্বরোহন্য আত্মনঃ, কার্য্যঞ্চ অন্যৎ, তেষাং ভয়ানিবৃত্তিঃ, ভয়স্য অন্যনিমিত্তত্বাৎ; সতশ্চ অন্যস্য আত্মহানানুপপত্তিঃ। ৯
নচ অসত আত্মলাভঃ। সাপেক্ষস্য অন্যস্য ভয়হেতুত্বমিতি চেৎ, ন; তস্যাপি তুল্যত্বাৎ। যদ্ধর্ম্মাদ্যনুসহায়ীভূতং নিত্যমনিত্যং বা নিমিত্তমপেক্ষ্য অন্যন্তর কারণং ন্যাৎ, তস্যাপি তথাভূতস্য আত্মহানাভাবাৎ ভয়ানিবৃত্তিঃ, আত্মহানে বা সদসতো- রিতরেতরাপত্তৌ সর্ব্বত্র অনাশ্বাস এব। একত্বপক্ষে পুনঃ সনিমিত্তস্য সংসারস্য অবিদ্যাকল্পিতত্বাদদোষঃ। তৈমিরিকদৃষ্টস্য হি দ্বিতীয়চন্দ্রস্য ন আত্মলাতো নাশো বা অস্তি। বিদ্যাবিদ্যয়ো: তদ্ধৰ্ম্মত্বমিতি চেৎ, ন; প্রত্যক্ষত্বাৎ। বিবেকাবিবেবৌ রূপাদিবৎ প্রত্যক্ষারুপলভ্যেতে অন্তঃকরণস্থৌ। নহি রূপস্য প্রতক্ষস্তু সতো দ্রষ্টুধর্ম্মত্বং।১০
অবিদ্যা চ স্বানুভবেন রূপ্যতে--মূঢ়োহহং অবিবিক্তৎ মম বিজ্ঞানম্ ইতি। তথা বিদ্যাবিবেকোঽনুভূয়তে। উপদিশন্তি চ অন্যেত্য আত্মনো বিদ্যাৎ বুধাঃ। তথা চ অন্তে অবধারয়ন্তি। তস্মান্নামরূপলক্ষ্যৈব বিদ্যাবিদে নামরূপেচ, ন
২২
আত্মধর্ম্মো; ‘নামরূপয়োনির্ব্বহিতা তে যদন্তরা তদ্ব্রহ্ম’ ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ। তে চ পুনর্নামরূপে সবিতর্য্যহোরাত্রে ইব কল্পিতে; ন পরমার্থতো বিদ্যমানে। অভেদে ‘এতমানন্দময়মাত্মানমুপসংক্রামতি’ ইতি কৰ্ম্মকর্তৃত্বানুপপত্তিরিতি চেৎ, ন; বিজ্ঞান- মাত্রত্বাৎ সংক্রমণস্থ। ন জলুকাদিবৎ সংক্রমণমিহোপদিশ্যতে; কিং তহি? বিজ্ঞানমাত্রং সংক্রমণশ্রুতেরর্থঃ ।১১
ননু মুখ্যমেব সংক্রমণং ক্রয়তে-উপসংক্রামতীতি ইতি চেৎ; ন, অন্নময়ে অদর্শনাৎ। নহি অন্নময়মুপসংক্রামতঃ বাহ্যাদস্মাৎ লোকাৎ জলুরীবং সংক্রামণৎ দৃশ্যতে, অন্যথা বা। মনোময়স্ত বহির্নির্গতস্য বিজ্ঞানময়স্থ্য বা পুনঃ প্রত্যাবৃত্ত্যা আত্মসঙক্রমণমিতি চেৎ, ন; স্বাত্মনি ক্রিয়াবিরোধাৎ। অন্যোহন্নময়মুপসঙক্রামতীতি প্রকৃত্য মনোময়ে। বিজ্ঞানময়ো বা স্বাত্মানমে- বোপসঙ্ক্রামতীতি বিরোধঃ স্যাৎ। তথা ন আনন্দময়স্যাত্মসঙ্ক্রমণমুপ- পদ্যতে। তস্মান্ন প্রাপ্তিঃ সঙক্রমণৎ. নাপি অন্নময়াদীনামন্যতমকর্তৃকং, পারিশেষ্যাদন্নময়াদ্যানন্দময়াস্তাত্মব্যতিরিক্তকর্তৃকং জ্ঞানমাত্রঞ্চ সঙ্ক্রমণমুপ- পদ্যতে। জ্ঞানমাত্রত্বে চানন্দময়ান্তঃস্থস্যৈব সর্ব্বান্তরস্য আকাপাদ্যমফান্তং কার্য্য সৃষ্টা অনুপ্রবিষ্টস্য হৃদয়গুহাভিসম্বন্ধাৎ অন্নময়াদিঘনাত্মসু আত্মবিভ্রমঃ সঙ্- ক্রমণাত্মকবিবেকজ্ঞানোৎপত্যা বিনশ্যতি। তদেতস্মিন্নবিদ্যাবিভ্রমনাশে সঙক্রমণ- শব্দউপচর্য্যতে; ন হ্যন্যথা সর্ব্বগতস্যাত্মনঃ সঙ্ক্রমণমুপপদ্যতে। বস্তুন্তরাভাবাচ্চ। ন চ স্বাত্মন এব সংক্রমণম্; ন হি জলুকা আত্মানমেব সংক্রামতি। তস্মাৎ সত্যং জ্ঞানমনস্থং ব্রহ্মেতি যথোক্তলক্ষণাত্মপ্রতিপত্ত্যর্থমের বহুভবন-সর্গপ্রবেশ-রস- লাভাভয়সংক্রমণাদি পরিকল্পনাতে ব্রহ্মণি সর্ব্বব্যবহারবিষয়ে; ন তু পরমার্থতো নির্বিকল্পে ব্রহ্মণি কশ্চিদপি বিকল্প উপপদ্যতে। তমেতৎ নির্বিকল্পমাত্মানমেবং ক্রমেণোপসংক্রম্য বিদিত্বা ন বিভেতি কুতশ্চন অভয়ৎ প্রতিষ্ঠাৎ বিন্দত ইত্যে তস্মিন্নর্থেহপি এষ শ্লোকো ভবতি। সর্ব্বস্তৈবাস্ত্য প্রকরণস্তানন্দবল্ল্যর্থস্য সঙ্ক্ষেপত প্রকাশনায়ৈষ মন্ত্রো ভবতি ॥ ৫ ॥ ৩৯ ॥
ইতি ব্রহ্মানন্দবল্যাম অষ্টমানুবাক্যভাবম্ ॥ ৮ ॥
ভাষ্যানুবাদঃ—এখন উক্ত মীমাংসাফলের উপসংহার কর হইতেছে, অর্থাৎ পূর্ব্বে যে আনন্দের মীমাংসা প্রদর্শিত হইয়াছে, এখ উপসংহারচ্ছলে তাহারই প্রয়োজন প্রদর্শিত হইতেছে।—‘স যঃ চায়ং পুরুষে ইত্যাদি।
পন, বোম্বাই প্রথম গুহায় অবস্থিত যিনি, আকাশ হইতে সমুদ্র যে
পর্যন্ত সমস্ত কার্য্যরাশি সৃষ্টি করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন, তিনিই এখানে ‘সঃ যঃ’ কথায় উল্লিখিত হইয়াছেন বুঝা যাইতেছে। ইনি কে? যিনি পুরুষে(জীবদেহে) ‘অয়ং’-প্রত্যক্ষরূপে, এবং যিনি আদিত্যমধ্যে ‘অসৌ’-পরোক্ষ বা ব্যবহিতরূপে শ্রোত্রিয়গ্রাহ্য পরমানন্দরূপে নিদ্দিষ্ট হন, এবং সুখভোগী দেবতাগণ যাহার একাংশমাত্র উপভোগ করিয়া থাকেন।[বুঝিতে হইবে,] তিনি এক,-ভিন্ন ভিন্ন স্থানবর্তী বিভিন্ন ঘটগত আকাশ যেমন মূলতঃ এক, তেমনি এই দেহে ও আদিত্যে অবস্থিত সেই পরমানন্দও স্বরূপতঃ এক-অভিন্ন বস্তু। ১ ভাল কথা, যদি আদিত্যমণ্ডলস্থ আত্মার সহিত দেহাধিষ্ঠিত আত্মার ঐক্য নির্দেশ করাই অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে, ‘সঃ যশ্চায়ং পুরুষে’ এইরূপ সাধারণভাবে দেহসম্বন্ধ নির্দেশ করা ত যুক্তিসঙ্গত হয় নাই; বরং বিশেষভাবে ‘যশ্চায়ং দক্ষিণে অক্ষণ’ বলাই সঙ্গত হইত; উহাই শ্রুতিপ্রসিদ্ধ।(১) না, এখানে সে কথা সঙ্গত হয় না; কারণ, ইহা পরমাত্ম-সম্পর্কিত কথা; পূর্ব্বোক্ত ‘অদৃশ্যে অনাত্ম্যে’ ও ‘ভীষাস্মাৎ বাতঃ পরতে’ ইত্যাদি বাক্যস্থ পরমাত্মাই এখানে অধিকৃত হইয়াছেন, অর্থাৎ এখানে সেই প্রস্তাবিত পরমাত্মার কথাই বলা হইতেছে; নচেৎ, হঠাৎ মধ্যস্থলে একটা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা করা যুক্তিসঙ্গত হয় না। বস্তুতঃ পরমাত্ম-বিজ্ঞানই এখানে বিবক্ষিত –শ্রুতির অভিপ্রেত অর্থ। অতএব সেই পরমাত্মাই এখানে উভয়স্থলে এক বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছেন(অন্য নহে)। ২
ভাল কথা, এখানেত আনন্দের মীমাংসা প্রকৃত বা উপক্রান্ত হইয়াছে; অতএব তাহারও ফলোপসংহার করা উচিত ছিল। কারণ, স্বাভাবিক যে, পরমা- নন্দ, তাহাই পরমাত্মার স্বরূপ, কিন্তু বিষয়েন্দ্রিয়-সম্বন্ধজনিত আনন্দ নহে। হাঁ, এখানেও ‘স যশ্চায়ং পুরুষে যশাসাবাদিত্যে’ এই বাক্যে তদনুরূপ কথাই বলা হইয়াছে। তবে, বিভিন্ন অধিকরণের সহিত সম্বন্ধসত্ত্বেও যে, তাঁহার কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য ঘটে না, তাহাই এখানে প্রদর্শিত হইয়াছে। ভাল, উপাধি-সম্বন্ধ দ্বারাও পরমাত্মার কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য হয় না, ইহাই যদি উক্ত বাক্যের অভিপ্রায় হয়, তবে বিশেষভাবে আদিত্যের উল্লেখ করা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক হয় (সাধারণভাবে বলিলেই হইত)। না, আদিত্যের উল্লেখ নিরর্থক নহ; উৎকর্ষ ও অপকর্ষ পরিবর্জনই উহার উদ্দেশ্য। মূর্তামূর্তময় দ্বৈতপ্রপঞ্চের মধ্যে আদিত্যের উৎকর্ষ সর্ব্বাপেক্ষা অধিক। এখন তিনিও যদি পরমানন্দ লাভ বিষয়ে দেহাদিগত উৎকর্ষ-নিরসনপূর্ব্বক সমতা প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে ঐরূপ অবস্থাপ্রাপ্ত লোকের পক্ষে যে, কোন প্রকার উৎকর্ষাপকর্ষই থাকিতে পারে না; এবং তিনি যে, অভয় প্রতিষ্ঠা লাভে নিশ্চয়ই সমর্থ স্থলকথা উপপন্ন হইতেছে। ৩
[এ পর্যন্ত ব্রহ্ম সম্বন্ধে] ‘অস্তি নাস্তি’ বিষয়ক প্রশ্ন ব্যাখ্যাত হইল। জীব-জগতে বিষয়েন্দ্রিয়ের সম্পর্কজনিত যে আনন্দ প্রাপ্তি, প্রাণনাদি ব্যাপার, অভয় প্রতিষ্ঠা ও ভয়দর্শন প্রভৃতি কার্য্য, তদ্দর্শনে ও তমুলক যুক্তিদৃষ্টে আকাশাদির কারণীভূত ব্রহ্মের অস্তিত্ব অবধারিত হইয়াছে, এবং তাহা দ্বারাই একটা প্রশ্নেরও(নাহিত্ব শঙ্কার ও) উত্তর প্রদান করা হইয়াছে। ইহার পরে বিদ্বান্ ও অবিদ্বান্ ভেদে ব্রহ্মকে পাওয়া বা না পাওয়া বিষয়ে আরও দুইটা প্রশ্ন আছে। তন্মধ্যে বিদ্বান্ ব্রহ্মরস আস্বাদন করেন, বা করেন না, এটা হইতেছে শেষ প্রশ্ন। এখন সেই প্রশ্নের অপনয়নার্থ বলা হইতেছে—এই অন্তিম প্রশ্নের উত্তরেই মধ্যম প্রশ্নটারও উত্তর হইয়া যায়; এই জন্য মধ্যম প্রশ্ন-নিরাসের জন্য আর পৃথক্ প্রয়াস করা আবশ্যক হইতেছে না। ৪
যে কোন লোক অজ্ঞানকৃত উৎকর্ষাপকর্ষময় ভেদবুদ্ধি পরিত্যাগ করিয়া ‘আমি হইতেছি-যথোক্তপ্রকার সত্য জ্ঞান অনন্ত ও অদ্বিতীয় ‘ব্রহ্মস্বরূপ’ এই প্রকার জ্ঞানলাভ করেন, তিনিই এখানে ‘এবংবিদ’ পদবাচ্য। কারণ, ‘এবং’ শব্দে সাধারণতঃ প্রস্তাবিত বিষয়ই বুঝাইয়া থাকে।[ব্রহ্মই এখানে প্রস্তাবিত; সুতরাং ব্রহ্মই ‘এবং’ পদের অর্থ।] সেই এবংবিদ্ পুরুষ ইহলোক হইতে
প্রস্থান করিয়া অর্থাৎ দৃষ্টাদৃষ্টার্থক-ঐহিক ও পারলৌকিক প্রিয়-বিষয়াত্মক ‘এই সংসার হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া অর্থাৎ সে সমুদয় বিষয়ে বীতস্পৃহ হইয়া পূর্ব্ববর্ণিত এই অন্নময় আত্মাকে প্রাপ্ত হন, অর্থাৎ দৃশ্যমান বিষয়রাশিকে অন্নময় দেহপিণ্ডের অতিরিক্ত বলিয়া দর্শন করেন না; তিনি সমস্ত স্কুল ভূতকেই অন্নময় আত্মারূপে দর্শন করেন। তাহার পর আরও অভ্যন্তরস্থ সমস্ত অন্নময় আত্মার মধ্যবর্তী প্রাণময় আত্মাকে তদভিন্নবণে নিরীক্ষণ করেন; তাহার পর ক্রমে মনোময়, বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় আত্মাকেও দর্শন করিয়া থাকেন; সর্ব্বশেষে পূর্ব্বোক্ত অদৃশ্য, অনাত্ম্য অনিরুক্ত ও অনিলয়ন আত্মাতে অভয় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তখন তাঁহার সংসার-ভয় সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত হইয়া যায়। ৫
এস্থলে বিবেচ্য বিষয় এই যে, এই ‘এবংবিদ’ পুরুষটা কে? কিরূপেই বা তিনি সংক্রমণ করেন? এই সংক্রমণের কর্তা কি পরমাত্মা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্- অন্য কেহ? না, সেই পরমাত্মাই?--ভাল, এই বিচারে ফল কি? সংক্রমণকারী যদি পরমাত্মা হইতে স্বতন্ত্র হন, তাহা হইলে, ‘তিনি সৃষ্টি করিয়া তন্মধ্যে বেশ করিলেন’, ‘যিনি মনে করেন, আমি অন্য এবং আমার উপাস্যও অন্য, তিনি বস্তুতঃ পরমাত্মকে জানেন না,’ ‘তিনি এক ও অদ্বিতীয়’ ‘তুমি তৎস্বরূপ’ একত্ব- বোধক এই সকল শ্রতি বিরুদ্ধ হয়। আর তিনি যদি নিজেই আনন্দময় আত্মাকে প্রাপ্ত হন, তাহা হইলেও কৰ্ম্ম-কর্তৃভাব উপপন্ন হয় না,(একই বস্তু একই ক্রিয়ার কর্তা ও কৰ্ম্ম হইতে পারে না), পক্ষান্তরে পরমাত্মারই সংসারিত্ব হইয়া পড়ে, অথবা তদবস্থায় পরমাত্মারই অভাব কল্পিত হইতে পারে। এই প্রকারে উভয় পক্ষেই, যে দোষের প্রাপ্তি সম্ভব হয় এবং তাহার পরিহার বা সমাধানও যদি অসম্ভব হয়, তবে এই প্রকার বিচারের প্রয়োজন কি? যদি বল, ইহার মধ্যে একটা পক্ষ গ্রহণ করিলে কিংবা নিদ্দোষ তৃতীয় পক্ষটী মাত্র গ্রহণ করিলে ত কোন প্রকার দোষের সম্ভাবনা দেখা যায় না, তাহা হইলেও সেই নির্দোষ পক্ষই শাস্ত্রার্থরূপে নির্ধারিত হউক; বৃথা বিচারে আবশ্যক কি?-না, বিচার নিরর্থক নহে; সেই অদৃষ্ট পক্ষ নির্ধারণ করাই বিচারের প্রয়োজন। অভিপ্রায় এই যে, সত্য বটে, অন্যতর পক্ষ কিংবা নির্দোষ তৃতীয় পক্ষ গ্রহণ করিলেও যখন সম্ভাবিত দোষের পরিহার করা যায় না, তখন তদ্বিষয়ে বিচার-চর্চ্চা বৃথা হইতে পারে সত্য; কিন্তু এখন পর্যন্ত যখন কোন একটা পক্ষই নির্দোষরূপে গ্রহণ করিতে পারা যায় নাই, তখন তন্নির্ধারণার্থই চিন্তা করা আবশ্যক হইতেছে। শাস্ত্রের প্রকৃত অর্থ নির্ধারণ করাই যখন উদ্দেশ্য, তখন ঐরূপ চিন্তা সার্থকও বটে এবং তুমিও
যথেষ্ট চিন্তা করিতেছ; কিন্তু কিছু নির্ণয় ত করিতে পারিতেছ না। ভাল, নির্ণয় করা যায় না, এরূপ কোন বেদবাক্য আছে কি? না, সে প্রকার কথা নহে; তবে কি প্রকার কথা? না, বহুবিধ বাধা থাকায়ই[নির্ণয় করা যায় না, বলিতেছি] কেননা, তুমি একত্ববাদী(অদ্বৈতবাদী); কারণ, তুমি এইরূপই বেদার্থ[কল্পনা করিয়া থাক]; কিন্তু নানাত্ববাদী বেদব।হ্য(বেদার্থবিমুখ) বহুলোক তোমার প্রতিপক্ষ রহিয়াছে; এইজন্যই আমার আশঙ্কা হইতেছে যে, তুমি নির্ণয় করিতে পারিবে না। ভাল, ইহাই আমার পরম মঙ্গলের কারণ যে, তুমি আমাকে একত্ব- বাদী বলিয়া অনেকত্ববাদী বহুলোককে আমার প্রতিপক্ষ বলিতেছ। এই কারণই আমি তোমাকে পরাজয় করিতে পারিব মনে করিয়া বিচারে প্রবৃত্ত হইতে‘ছি। ৬
[ প্রথমোক্ত তিনটা প্রশ্নের মধ্যে শেষ প্রশ্নে যে, বলা হইয়াছিল ‘উত স এব’ অর্থাৎ তিনি নিজেই নিজকে প্রাপ্ত হন কি? এখন সেই প্রশ্নের উত্তরে বলিতেছেন] তিনিই অর্থাৎ পরমাত্মা নিজেই নিজেকে প্রাপ্ত হন; কেননা, এখানে পরমাত্মভাব প্রাপ্তিই বিবক্ষিত বা শ্রুতির অভিপ্রেত। এখানে ‘ব্রহ্মবিদ্ আপ্নোতি পরম্’ শ্রুতিতে পরমাত্মবিজ্ঞানে পরমাত্মভাবপ্রাপ্তিহ শ্রাতর অভিপ্রেত। কারণ, অন্য পদার্থ-কখনই অন্য পদার্থ হইয়া যাইতে পারে না। ভস, অভেদপক্ষেও তাহারই তদ্ভাবপ্রাপ্তি অর্থাৎ একেবারেই প্রাপ্যপ্রাপকভাব কখনহ হইতে পারে না; না, এরূপ আপত্তিও সঙ্গত হয় না; কারণ, অবিদ্যাকৃত ভেদ নিবারণই উহার উদ্দেশ্য। ব্রহ্মবিদ্যাপ্রভাবে যে, স্বস্বরূপ- প্রাপ্তির উপদেশ করা হইয়া থাকে; অবিদ্যাবশতঃ আত্মারূপে আরোপিত যে, অন্নময়াদি কোষরূপ অসত্য আত্মা, সেই সমুদয় অনাত্মপদার্থ অপনয়ন করাই সেই সকল শ্রুতি উপদেশের উদ্দেশ্য,(কিন্তু তাদাত্ম্য লাভ নহে । ভাল কথা, ঐ শ্রুতির যে এরূপ অর্থ, তাহা জানা যায় কিসে?[ উত্তর—! যেহেতু ঐ শ্রুতিতে কেবল বিদ্যামাত্রেরই উপদেশ আছে। বিদ্যার প্রত্যক্ষ ফল হইতেছে—অবিদ্যানিবৃত্তি। এখানেও আত্মপ্রাপ্তির উপায়রূপে কেবল বিদ্যারই উপদেশ প্রদত্ত হইতেছে। এ উপদেশ ত গন্তব্য স্থানের মার্গবিজ্ঞা- পনোদেশের ন্যায় হইতে পারে; সুতরাং সাধনরূপে বিদ্যামাত্রের উপদেশ কখনই তদ্ভাবপ্রাপ্তির হেতু হইতে পারে না। কেননা, দেখা যায় - দেশান্তরে যাইতে হইলে লোকে পথের পরিচয় লইয়া থাকে; কিন্তু সেই গন্তব্যস্থানইত আর গমনের কর্তা হয় না; কর্তা হয় অপর লোক। না, এ কথা বলিতে পারা যায় না; কারণ, বৈষম্য আছে। দৃষ্টান্তস্থলে দেখা যায়—উপদেশকর্তা গন্তব্য গ্রাম সম্বন্ধে উপদেশ
করে না, উপদেশ করে গ্রামে যাইবার পথপরিচয় সম্বন্ধে; এখানে ত প্রাপ্তব্য ব্রহ্মের বিজ্ঞান ব্যতীত তৎপ্রাপ্তির কোন সাধনেরই উপদেশ করা হইতেছে না। অতএব পথপরিচয়ের দৃষ্টান্তটী ইহার অনুরূপ হইতেছে না। ৭ ‘আর কর্মাদি সাধনসাপেক্ষ ব্রহ্মজ্ঞানকে যে পরমাত্মপ্রাপ্তির সাধনরূপে উপদেশ করা হইতেছে, তাহাও বলিতে পার না; কারণ, মোক্ষপদার্থ নিত্য, (কোন প্রকার সাধনসাপেক্ষ নহে।) ইত্যাদি বাক্যে পূর্ব্বেই উক্ত আশঙ্কা প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে(১); এবং ‘তিনি সৃষ্টি করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন’ এই শ্রুতিও জাগতিক পদার্থমাত্রকেই ব্রহ্মাত্মক(ব্রহ্ম হইতে অব্যতিরিক্ত) বলিয়া বুঝ ইতেছেন। বিশেষতঃ অভয় প্রতিষ্ঠাও[অভেদপক্ষেই] উপপন্ন হয়, যথোক্ত বিদ্যাসম্পন্ন পুরুষ যদি আত্মব্যতিরেকে আর কিছুই দর্শন না করেন, তবেই অভয় প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারেন; কারণ, তদবস্থায় ওয়ের কারণীভূত অন্য কোনও দ্বিতীয় পদার্থের বোধ থাকে না। অপর দ্বিতীয় পদার্থগুলি যদি অবিদ্যাকৃত(অসত্য) হয়, তবেই বিদ্যাদ্বারা সে সমুদয়ের অসত্যতা দর্শন উপপন্ন হইতেপারে,(নচেৎ নহে)।[আর সেই অসত্যতাদর্শনই বস্তুতঃ দ্বৈতনিবৃত্তি; যেমন ভ্রান্তিকৃত] দ্বিতীয় চন্দ্রের তাহাই অসত্যতা বা মিথ্যাত্ব যে, তৈমিরিক রোগবিহীন চক্ষুষ্মান্ লোকের দেখিতে না পাওয়া। অভিপ্রায় এই যে, তৈমিরিক রোগাক্রান্ত লোক রোগের দোষে একটা বস্তুকেও দুইটা বলিয়া মনে করে,- একটি চন্দ্রকেও দুইটি দেখে। অবশ্য, তাহার দৃষ্ট সেই দ্বিতীয় চন্দ্রটী যে ভ্রান্তিকৃত অসত্য, তাহা জানা যায় কিরূপে? না, যেহেতু ঐরূপ রোগবিহীন চক্ষুষ্মান্ লোকেরা ঐ দ্বিতীয় চন্দ্র দেখিতে পায় না; সত্য হইলে অবশ্যই তাহারাও দেখিতে পাইত; এইরূপ অজ্ঞজনের ভয়োৎপাদক দ্বৈত- প্রপঞ্চও অবিদ্যারুত-অসত্য; যেহেতু প্রকৃত চক্ষুষ্মান্ জ্ঞানীগণ উহার সত্যতা
(১) পূর্ব্বপক্ষবাদীর অভিপ্রায় এই যে, ব্রহ্মজ্ঞানই ব্রহ্মপ্রাপ্তির সাধন সত্য; কিন্তু কর্মসাপেক্ষ, অর্থাৎ নিত্য নৈমিত্তিকাদি কৰ্ম্ম দ্বারা অগ্রে চিত্তশুদ্ধি করিতে হয়; পরে শুদ্ধ চিত্তে জ্ঞানের উন্মেষ হয়, ক্রমে ব্রহ্মবিজ্ঞান উৎপন্ন হইয়া জীবের ব্রহ্মপ্রাপ্তি ঘটায়। অতএব ব্রহ্মজ্ঞীনোপদেশ ব্রহ্মপ্রাপ্তির সাধন ভিন্ন আর কিছুই নহে। ব্রহ্মবিজ্ঞান যদি ব্রহ্মপ্রাপ্তির সাধন হয়, তবে উক্ত মার্গোপদেশের সহিত সমানই হয়। তদুত্তরে ভাষ্যকার বলিতেছেন যে, জন্য পদার্থেরই সাধন থাকে ও থাকা আবশ্যক হয়, কিন্তু মোক্ষ যখন নিত্য, তখন উহার সাধনই সম্ভবপর নয়।
দেখিতে পান না। যদি বল এরূপ অগ্রহণ বা অদর্শন ত কখনও হয় না; তাহাও বলিতে পার না; কারণ, সুষুপ্ত ও সমাধিযুক্ত পুরুষেরা দ্বৈত জগৎ দর্শন করেন না। ৮
যদি বল, বিষয়ান্তরে নিবিষ্টচিত্ত লোক যেমন সম্মুখস্থ বিষয়ও নিরীক্ষণ করে না, সুষুপ্তের অদর্শনও ঠিক তেমনই? না, তাহাও বলিতে পার না; কেন না, তখন ত কোন বিষয়েই জ্ঞান থাকে না;[সুতরাং অন্যাসক্তচিত্ততা বলা যায় না।। যদি বল, জাগ্রৎ ও স্বপ্ন সময়ে যখন দ্বৈতদর্শন অব্যাহত থাকে, তখন উহা সত্যই; না, তাহাও নহে; কারণ, জাগ্রৎ স্বপ্ন অবস্থা দুইটীও অবিদ্যাকৃত; জাগ্রৎ ও স্বপ্নাবস্থায় যে ভেদদর্শন, তাহাও অবিদ্যাকৃত; যেহেতু বিদ্যার উদয়ে উহারও অভাব হয়। তাহা হইলে সুষুপ্তিসময়ে যে, বিষয়ের অদর্শন, তাহাও অবিদ্যাকৃত বলা যাইতে পারে? না, তাহা বলা যাইতে পারে না; কারণ, এই অদর্শন স্বাভাবিক(অবিদ্যাজনিত নহে)। কেন না; অবিকৃত ভাবই দ্রব্যের স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম, কারণ, উহাতে কোনও কারণের অপেক্ষা থাকে না; পক্ষান্তরে বিকার কখনই কোন দ্রব্যের তত্ত্ব বা স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম হইতে পারে না; কারণ, উহা পরাপেক্ষিত বা পরের দ্বারা উৎপাদিত হয় বস্তুর তত্ত্ব বা স্বাভাবিকতা কখনই কোনও কারণকে অপেক্ষা করে না। বস্তুর অভেদাবস্থাই কারক-সাপেক্ষ হইয়া থাকে। সেই বিশেষ বা বৈলক্ষণ্যমাত্রই বিকার(বস্তুর অন্যথা ভাব); জাগ্রৎ ও স্বপ্নাবস্থায় যে, ববিষয়গ্রহণ, তাহাও একরূপ বিশেষ বা বৈলক্ষণ্য মাত্র; সুতরাং বিকার মধ্যে পরিগণিত]। যাহার যে রূপটা অন্য- নিরপেক্ষ, তাহাই তাহার প্রকৃত তত্ত্ব; আর যাহা অন্যাপেক্ষিত, তাহা তাহার তত্ত্ব নহে; যেহেতু সেই অন্য বস্তুটার অভাবে তাহারও অভাব হইয়া থাকে। অতএব স্বভাবসিদ্ধ বলিয়াই সুষুপ্তিতে জাগ্রৎ ও স্বপ্নাবস্থার ন্যায় কোন বিশেষ বিকার সম্বন্ধ থাকে না। ৯
- পক্ষান্তরে, যাহাদের মতে আত্মা হইতে পরমেশ্বর সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পদার্থ, এবং কার্য্য ও কারণ হইতে পৃথক্ বস্তু; তাহাদের পক্ষেই ভয়ের নিবৃত্তি সম্ভবপর হয় না; কারণ, তাহাদের ভয় অন্যনিমিত্তক অর্থাৎ দ্বিতীয় পদার্থ হইতে আগত এবং দ্বিতীয় পদার্থ যখন বিদ্যমানই থাকে, তখন তাহার স্বরূপহানি হওয়া মোটেই সম্ভবপর নহে। আর যাহা স্বরূপতই অসং অস্তিত্ববিহীন, তাহার কখন আত্মলাভ বা অবস্থিতি সম্ভবপর হয় না। যদি বল, দ্বিতীয় পদার্থ যে ভয়োৎপাদন করে, তাহারও কারণান্তর থাকিতে পারে? না, সে কথাও হইতে পারে না; কারণ
তাহার অবস্থাও এতত্তুল্য। তুমি বালবে, ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম প্রভৃতি নিত্য বা অনিত্য যে কোনও সহকারীকে অপেক্ষা করিয়া অন্য পদার্থ ভয়োৎপাদক হউক না কেন, না; তাহাও যখন স্বতন্ত্র পদার্থ, তখন তাহারত স্বরূপহানি হইতে পারে না; সুতরাং সে পক্ষেও ভয়নিবৃত্তি সম্ভবপর হয় না। আর’ সদ্বস্তুরও যদি স্বরূপধ্বংস হয়, তবে সৎ ও অসতের পার্থক্যই চলিয়া যায়; সুতরাং কোথাও লোকের বিশ্বাস স্থাপন করা চলে না। একত্ববাদীর পক্ষে কিন্তু এ দোষ হয় না; কেন না, এই সংসার অদৃষ্টাদি কারণসাপেক্ষ হইলেও অবিদ্যাকৃত-অসত্য; কাজেই পূর্ব্বোক্ত কোন দোষের সম্ভাবনা থাকে না। আর পূর্ব্বে যে তৈমিরিকদৃষ্ট দ্বিতীয় চন্দ্রের কথা বলা হইয়াছে; বস্তুতঃ সেখানে দ্বিতীয় চন্দ্রের স্বরূপতই সত্তা বা বিনাশ, কিছুই নাই। তাহার পর, বিদ্যা ও অবিদ্যাকে বস্তুধৰ্ম্মও বলিতে পার না; কারণ, উহারা প্রত্যক্ষসিদ্ধ। রূপ রসাদি গুণগুলি যেরূপ দ্রব্যধর্মরূপে প্রত্যক্ষ হয়, বিবেক অবিবেকও তদ্রূপ অন্তঃকরণের ধর্মরূপেই প্রত্যক্ষ হয়। দ্রব্যধর্মরূপে প্রত্যক্ষগোচর রূপ রসাদি গুণকে কেহই ত দ্রষ্টার ধর্মরূপে কল্পনা করে না। ১০ বিশেষতঃ অবিতা পদার্থটাও ‘আমি মূঢ়(মোহগ্রস্ত), আমার বুদ্ধি এখন বিবেকশূন্য’ ইত্যাদি স্বীয় অনুভবের সাহায্যেই নিরূপিত হইয়া থাকে। সেইরূপ বিদ্যার পার্থক্যও আত্মানুভব-গ্রাহ্য। পণ্ডিতগণ আপনার বিদ্যা পরকে উপদেশ করিয়া থাকেন। অপর লোকেও উপদেশের অনুরূপ অর্থ অবধাবণ করিয়া থাকে। অতএব এই বিদ্যা ও অবিদ্যা নাম রূপেরই অন্তর্গত নাম-রূপাত্মকই বটে,-আত্মার ধর্ম নহে। যেহেতু, অপর শ্রুতিতে আছে-‘বিন্ধই নাম ও রূপের স্বরূপাধায়ক; সেই নাম ও রূপ যাহার মধ্যে অবস্থিত আছে, তিনিই সেই ব্রহ্ম।’ নিত্য প্রকাশমান সূর্য্যে যেমন দিন-রাত্রি ভাব কল্পিত হইয়া থাকে, তেমনি উক্ত নাম রূপও ব্রহ্মেতে কল্পিত হইয়াছে, কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে ব্রহ্মেতে নাম-রূপ সম্বন্ধ কখনও বিদ্যমানই নাই।
যদি বল, অভেদ পক্ষ বাস্তবিক হইলে, ‘জীব এই আনন্দময় আত্মাকে প্রাপ্ত হয়’ এইরূপে কৰ্ম্ম ও কর্তার নির্দেশ করা সঙ্গত হইতে পারে না; অর্থাৎ প্রাপ্য ব্রহ্ম, আর তৎপ্রাপক জীব যদি বস্তুতই এক বস্তু হয়, তাহা হইলে ভেদ-সাপেক্ষ, ব্রহ্মের কর্মত্ব ও জীবের কর্তৃত্ব নির্দেশ সঙ্গত হইতে পারে না। না—এ আপত্তিও করিতে পার না; কারণ, এখানে ‘সংক্রমণ’ অর্থ বিজ্ঞান বা অনুভূতিমাত্র; কিন্তু জলুকা(জোঁক) প্রভৃতির সংক্রমণের ন্যায় এখানে সংক্রমণের উপদেশ করা হয় নাই; তবে কি না, ব্রহ্মবিষয়ক কেবল বিজ্ঞানোপদেশই এখানে শ্রুতির অভিপ্রেত। ১১
২০
ভাল কথা, ‘উপসংক্রমণ’ বাক্যে ত মুখ্য উপসংক্রমণেরই কথা শ্রুত হইতেছে? না, সে কথা বলিতে পার না; কারণ, ‘অন্নময়’ কোষের স্থানে মুখ্য উপসংক্রমণের কথা নাই। কেন না, অন্নময়ে উপসংক্রমণের সময় ত, বর্তমান বহির্লোক হইতে জলূকার মত অন্নময়ে যথার্থ উপসংক্রমণ দেখিতে পাওয়া যায় না, কিংবা অন্য প্রকারেও সংক্রমণ সম্ভব হয় না।[যদি বল, সেখানে মুখ্য সংক্রমণ সম্ভব না হইলেও,] দেহ হইতে বাহিরে নির্গত মনোময় ও বিজ্ঞান- ময়ের পক্ষে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক আত্মাতে উপসংক্রমণ করা সম্ভবপরই হয়; না, তাহাও হয় না; স্বাত্মগত ক্রিয়াবিরোধই তাহার দ্বাধক। অভিপ্রায় এই যে ‘অন্ন- ময় আত্মাকে প্রাপ্ত হয়’, এই উপক্রমবাক্যে প্রাপ্ত অন্নময় ও তৎপ্রাপক জীবকে পরস্পর ভিন্ন পদার্থ বলিয়া নির্দেশ করিয়া, এখন যদি মনোময় বা বিজ্ঞানময় কোষকে স্বারপ্রাপক বলিয়া নির্দেশ করা হয়, তবে নিশ্চয়ই উপক্রম-বিরুদ্ধ কথা বলা হয়। তাহার পর, আনন্দময়ের পক্ষে ত আত্মসংক্রমণ মোটেই উপপন্ন হয় না; (কারণ, মনোময় ও বিজ্ঞানময়ের ন্যায় আনন্দময়ের কখনও বহির্গমন সম্ভবই হয় না; সুতরাং উহার আত্মসংক্রমণও উপপন্ন হয় না।) অতএব এখানে সংক্রমণ প্রাপ্তি নহে, এবং অন্নময়াদির মধ্যে কেহ তাহার(প্রাপ্তির) কর্ত্তাও নহে; পরন্তু অন্নময় হইতে আনন্দময় পর্যন্ত, যে পঞ্চ কোষের উল্লেখ আছে, তদতিরিক্ত কোন বস্তুই উহার কর্তা হইবে, এবং এই প্রাপ্তি বা সংক্রমণ অর্থও জ্ঞানমাত্র, এইরূপ সিদ্ধান্তই সঙ্গত হয়(১)। এইরূপে সংক্রমণ শব্দের জ্ঞানমাত্ররূপ অর্থ স্থির হইলেই, আনন্দময়ের অভ্যন্তরস্থ এবং সর্ব্বান্তরতম আত্মার পক্ষে আকাশাদি সর্ব্ববস্তু সৃষ্টি করার পর, তন্মধ্যে প্রবেশ ও হৃদয়গুহার সহিত সম্বন্ধবশতঃ অন্নময়াদি অনাত্ম- পদার্থে আত্ম-ভ্রমও সম্ভব হয়, এবং সংক্রমণ শব্দবাচ্য বিবেক জ্ঞানের উদয়ে সেই ভ্রান্তির বিনাশও উপপন্ন হয়। কাজেই এখানে অবিদ্যাজনিত ভ্রান্তি-বিনাশরূপ অর্থে ‘সংক্রমণ’ শব্দের উপচার বা গৌণ প্রয়োগ স্বীকার করিতে হয়; নচেৎ সর্ব্ব ব্যাপী আত্মার পক্ষে কাহারও সঙ্গে অভিনব সংক্রমণ বা সংযোগ সম্ভবপর হয় না।
(১) তাৎপর্য্য—জীব স্বরূপতঃ ব্রহ্মময়ী হইয়াও অজ্ঞানবশে আপনাকে ব্রহ্ম হইতে ভিন্ন ও সুখী দুঃখী ইত্যাদি ভ্রান্তিবোধে বন্ধ হয়; জ্ঞানোদয়ে—‘আমি ব্রহ্মস্বরূপ, তদ্ভিন্ন নহে’ এইরূপ বোধোদয়ে সেই অবিদ্যা তিরোহিত হইয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গে জীবের জীবভাষ বা অব্রহ্মভাষও দূর হইয়া যায়। এই প্রকার জ্ঞানলাভেরই নাম ব্রহ্ম- প্রাপ্তি বা ব্রহ্মলাভ: কিন্তু ব্যবহারিক ‘প্রাপ্তি’ নহে। এইজন্যই ভাষ্যকার সংক্রমণ কথার ঐরূপ অর্থ বলিতে বাধ্য হইয়াছেন।
আত্মাতিরিক্ত বস্তুর অভাবও উক্ত অনুপপত্তির অপর কারণ; আত্মা ত নিজেই নিজকে প্রাপ্ত হইতে পারে না। কারণ, জলুকা(জোঁক) কখনও আপনাকেই প্রাপ্ত হয় না,(পরন্তু অপর তৃণ প্রভৃতিকেই প্রাপ্ত হয়)। অতএব আমরা আত্মার যেরূপ স্বরূপ নিরূপণ করিলাম, সেই আত্মবিষয়ক বোধ সমুৎপাদনের নিমিত্তই ‘সত্যং জ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম” বাক্যে সর্ব্ববিধ ব্যবহারের অগোচর ব্রহ্ম বিষয়ে বহু ভবন, সৃষ্টি, তন্মধ্যে প্রবেশ, রসলাভ, অভয় প্রতিষ্ঠা, ও সংক্রমণ প্রভৃতি ব্যবহার কল্পিত হইয়াছে, কিন্তু পরমার্থতঃ নির্বিকল্প(সর্ব্বপ্রকার ব্যবহারের অতীত) ব্রহ্ম বিষয়ে কোন প্রকার কল্পনাই উপপন্ন হয় না ও হইতে পারে না। সেই এই নির্বিকল্প আত্মাকে যথোক্ত প্রকারে প্রাপ্ত হইয়া-অবগত হইয়া কোথা হইতেও ভয় প্রাপ্ত হন না-অভয় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এই বিষয়েও একটা শ্লোক(মন্ত্র) আছে। বুঝিতে হইবে, এই মন্ত্রটা সংক্ষেপতঃ এই ব্রহ্মানন্দবল্লীর উক্ত প্রকরণগত সমস্ত তাৎপর্য্য প্রকাশনার্থ প্রবৃত্ত হইয়াছে ॥ ৫ ॥ ৩৯ ॥
ইতি ব্রহ্মানন্দবজ্রীর অষ্টমানুবাকের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৮ ॥
যতো বাচো নিবর্তন্তে। অপ্রাপ্য মনসা সহ। আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান্। ন বিভেতি কুতশ্চনেতি। এ তঞ্চহ বাব ন তপতি। কিমহঞ্চ সাধু নাকরবম্। কিমহং পাপমকরবমিতি। স ন এবং বিদ্বানেতে আত্মানঞ্চ স্পৃণুতে। উভে হ্যেবৈস এতে আত্মাঞ্চ স্পৃণুতে। ন এব বেদ। ইত্যুপনিষৎ ॥:॥৪০॥
ইতি ব্রহ্মানন্দবল্লী-নবমোহনুবাকঃ ॥ ৯ ॥ . ইতি ব্রহ্মানন্দবল্লী সমাপ্তা ॥
সরলার্থঃ।- বাচঃ(বস্তুস্বরূপ-প্রকাশনার্থং প্রযোজ্যানি বচনানি) মনসা (তত্ত্বনিশ্চায়কেন অন্তঃকরণেন) সহ অপ্রাপ্য(বক্তুং জ্ঞাতুং চ অপারয়ন্ত্যঃ) যতঃ(যস্মাৎ কারণরূপাৎ ব্রহ্মণঃ সকাশাৎ) নিবর্তন্তে(স্বব্যাপারাৎ হীয়ন্তে)। (কোহপি জনঃ) ব্রহ্মণঃ(স্বরূপভূতং)[তৎ] আনন্দং বিদ্বান্(জানন্ সন্) কুতশ্চন(কম্মাদপি নিমিত্তাৎ) ন বিভেতি[ভয়হেতোঃ দ্বিতীয়স্য অভাবাৎ] ইতি। এতম্ হ বাব(এব), কিং(কস্মাৎ) অহং সাধু(পুণ্যং কৰ্ম্ম) ন অকরবস্ (ন কৃতবান্ অস্মি), কিং(কস্মাৎ) অহং পাপং(নিষিদ্ধং কৰ্ম্ম) অকরবস্
(কৃতবান্ অস্মি) ইতি(এবংরূপঃ পশ্চাত্তাপঃ) ন তপতি(ন উদ্বেজয়তি) সঃ যঃ(যঃ কশ্চিৎ) এতে(পুণ্যকর্মাকরণ-পাপাচরণে এবং(যথোক্ত- রূপেণ) বিদ্বান্(জানন্ সন্) আত্মানং স্পৃণুতে(আত্মানং সবলং করোতি, তৎ)। হি(যতঃ) এষঃ(বিদ্বান্: এতে(পুণ্যকর্মাকরণ-পাপ- কৰ্ম্মণী) উভে এব আত্মানং স্পৃণুতে(আত্মভাবেন বিজানাতি);[কঃ?] যঃ এবং(যথোক্তলক্ষণম্ অদ্বৈতম্ আনন্দৎ) বেদ(জানাতি, স ইত্যর্থঃ)। ইতি (ইয়ৎ যথোক্তবিজ্ঞানলক্ষণা) উপনিষদ্(ব্রহ্মবিদ্যা- সর্ব্বাভ্যঃ বিদ্যাভ্যঃ পরমং রহস্যমিতিভাবঃ) ॥ ১॥ ৪০ ॥
মূলানুবাদ।- বাক্যসমূহ যাঁহাকে না পাইয়া মনের সহিত অর্থাৎ বাক্য ও মন যাহার স্বরূপ প্রকাশ করিতে ও ধারণা করিতে অসমর্থ হইয়া ফিরিয়া আইসে, সেই ব্রহ্মের স্বরূপভূত আনন্দ- বিদ্ পুরুষ কোথা হইতেও ভীত হন না। আমি কেন উত্তম কৰ্ম্ম করি নাই; আমি কেন পাপ কৰ্ম্ম করিয়াছি, এই প্রকার অনুতাপ কেবল এই লোককেই সন্তাপ দেয় না; সেই—যে লোক এই প্রকার অবগত হইয়া আপনাকে পরিতৃপ্ত করিয়াছেন; কারণ, যিনি এরূপ জানেন, তিনি ঐ উভয়কেই অর্থাৎ উত্তম কর্ম্মের অননুষ্ঠান ও পাপ কর্ম্মের অনুষ্ঠানকে আত্মস্বরূপ বলিয়াই মনে করিয়া থাকেন। ইহাই এই ব্রহ্মানন্দবল্লীর উপনিষদ্ অর্থাৎ সর্ব্ব বিদ্যার সারভূত রহস্য বিদ্যা ॥১॥৪০॥
.. শাঙ্করভাষ্যম্-যতঃ যস্মান্নিবিকল্পাৎ যপোক্তলক্ষণাৎ অদ্বয়ানন্দা- দাত্মনঃ বাচঃ অভিধানানি দ্রব্যাদিসবিকল্পবস্তুবিষয়াণি বস্তুসামান্যান্নিবিকল্পে২দ্বয়ে- হপি ব্রহ্মণি প্রয়োক্তভিঃ প্রকাশনায় প্রযুজ্যমানানি অপ্রাপ্যাপ্রকাশ্যৈব নিব- র্তন্তে-স্বসামর্থ্যাৎ হীয়ন্তে। মন ইতি প্রত্যয়ো বিজ্ঞানম্। ‘তচ্চ, যত্রাভিধানং প্রবৃত্তমতীন্দ্রিয়েংপ্যর্থে, তদর্থে চ প্রবর্ততে প্রকাশনায়। যত্র চ বিজ্ঞানং, তত্র বাচঃ প্রবৃত্তিঃ। তস্মাৎ সহৈব বাঘ্মনসয়োরভিধানপ্রত্যয়োঃ প্রবৃত্তিঃ সর্ব্বত্র। তস্মাদ ব্রহ্মপ্রকাশনায় সর্বথা প্রয়োক্তভিঃ প্রযুজ্যমানা অপি বাচঃ যম্মাদ প্রত্যয়বিষয়াদনতিধেয়াদ অদৃশ্যাদিবিশেষণাৎ সহৈব মনসা বিজ্ঞানেন সর্ব্বপ্রকাশন
সমর্থেন নিবর্তন্তে, তৎ ব্রহ্মণ আনন্দং শ্রোত্রিয়স্যাবৃজিনস্যাকামহতস্ত সর্ব্বৈষণা- বিনিৰ্ম্মুক্তস্যাত্মভূতং বিষয়-বিষয়িসম্বন্ধবিনিৰ্ম্মুক্তং স্বাভাবিকং নিত্যমবিভক্তৎ পরমানন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান্ যথোক্তেন বিধিনা, ন বিভেতি কুতশ্চন, নিমিত্তাভাবাৎ। ন হি তস্মাদ্বিদুষোহন্যদ্বন্বন্তরমস্তি ভিন্নম্, যতো বিভেতি। ১
অবিদ্যয়া যদা উদরমন্তরং কুরুতে, অথ তস্য ভয়ং ভবতীতি হি যুক্তম্। বিদুষশ্চাবিদ্যাকার্য্যস্য তৈমিরিকদৃষ্ট-দ্বিতীয়চন্দ্রবৎ নাশান্তয়নিমিত্তস্য ন বিভেতি কুতশ্চনেতি যুজ্যতে। মনোময়ে চোদাহৃতো মন্ত্রঃ, মনসো ব্রহ্মবিজ্ঞান- সাধনত্বাৎ। তত্র ব্রহ্মত্বমধ্যারোপ্য তৎস্তুত্যর্থং ‘ন বিভেতি কদাচন” ইতি ভয়মাত্রং প্রতিষিদ্ধম্; ইহাদ্বৈতবিষয়ে ‘ন বিভেতি কুতশ্চন” ইতি ভয়নিমিত্তমেব প্রতিষিধ্যতে। ২।
নন্বস্তি ভয়নিমিত্তং সাধ্বকরণং পাপক্রিয়া চ। নৈবম। কথমিতি, উচ্যতে-- এতং যথোক্তমেবংবিদম্, হ-বাবেত্যবধারণাধৌ, ন তপতি নোদ্বেজয়তি ন সন্তাপয়তি। কথং পুনঃ সাধ্বকরণং পাপক্রিয়া চ ন তপতীতি; উচ্যতে— কং কস্মাৎ সাধু শোভনং কৰ্ম্ম নাকরবং ন কৃতবানম্মীতি পশ্চাৎসন্তাপো ভবতি আসন্নে মরণকালে; তথা কিং কস্মাৎ পাপৎ প্রতিষিদ্ধং কৰ্ম্ম অকরবৎ কৃতবানম্মীতি চ নরকপতনাদিদুঃখভয়াৎ তাপো ভবতি। তে এতে সাধ্বকরণ-পাপক্রিয়ে এবমেনং ন তপতঃ, যথা অবিদ্বাংসং তপতঃ। ৩
কস্মাৎ পুনর্ব্বিদ্বাংসং ন তপত ইতি, উচ্যতে স য এবং বিদ্বান এতে সাধ্ব- সাধুনী তাপহেতু ইত্যাত্মানৎ স্পৃণুতে প্রীণয়তি বলয়তি বা, পরমাত্মভাবেনোভে পশ্যতীত্যর্থঃ। উভে পুণ্যপাপে, তি যস্মাৎ এবমেষ বিদ্বান্ এতে আত্মানাত্মরূপে- ণৈব পুণ্যপাপে স্বেন বিশেষরূপেণ শূন্যে কৃত্বা আত্মানং স্পৃণুত এব। কঃ? য এবং বেদ যথোক্তমদ্বৈতমানন্দং ব্রহ্ম বেদ। তস্যাত্মভাবেন দৃষ্টে পুণ্যপাপে নির্ব্বীর্য্যে অতাপকে জন্মান্তরারম্ভকে ন ভবতঃ, ইতীয়মেবং যথোক্তা অস্যাৎ বল্ল্যাং ব্রহ্মবিদ্যোপনিষৎ সর্ব্বাভ্যো বিদ্যাভ্যঃ পরমরহস্যং দর্শিতমিত্যর্থঃ- পরং শ্রেয়োহস্যাং নিষন্নমিতি। ১।৪০
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য শ্রীমচ্চঙ্করভগবতঃ কৃতৌ তৈত্তিরীয়োপনিষদ্ভাষ্যে ব্রহ্মানন্দবল্লাভাষ্যং সংপূর্ণম্ ॥
দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥ ২ ॥
ভাষ্যানুবাদ। -বাক্যসমূহ সাধারণতঃ সবিকল্প(বিশেষণযুক্ত) বস্তুই বুঝাইয়া থাকে, ‘ব্রহ্মও একটা বস্তু; অতএব বাক্য তাঁহাকেও বুঝাইতে পারিবে; এইরূপ ধারণার বশে] বক্তারা নির্বিশেষ অদ্বয় ব্রহ্মের স্বরূপ প্রকাশ- নার্থও বাক্য প্রয়োগ করিয়া থাকেন কিন্তু বাক্যসমূহ যাঁহাকে প্রাপ্ত না হইয়াই অর্থাৎ স্বরূপ প্রকাশনে অসমর্থ হইয়াই, যাঁহা হইতে পূর্ব্বোক্ত লক্ষণান্বিত অন্বয়া- নন্দ স্বরূপ আত্মা হইতে[মনের সহিত] নিবৃত্ত হয়, অর্থাৎ স্বীয় অর্থ প্রকাশনশক্তি হইতে বিচ্যুত হয়। এখানে ‘মন’ অর্থ প্রত্যয় বা বুদ্ধিবিজ্ঞান মাত্র। অতীন্দ্রিয় (ইন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য: হইলেও যে পদার্থে অভিধান বা শব্দশক্তি প্রবৃত্ত হয়, মনঃ সাধারণতঃ সেই বস্তুর স্বরূপ-প্রকাশনার্থই প্রবৃত্ত হইয়া থাকে; আবার যে বিষয়ে মনের প্রবৃত্তি হয়, সেই বিষয়েই বাক্যের? প্রবৃত্তি হইয়া থাকে। অতএব বাক্য ও মনের অর্থাৎ শব্দ ও প্রত্যয়ের সর্ব্বত্রই সহপ্রবৃত্তি হইয়া থাকে। অতএব ব্রহ্মপ্রকাশনের উদ্দেশ্যে বক্ত গণকর্তৃক যে কোন প্রকারে বাক্যসমূহ প্রযুক্ত হইয়াও প্রত্যয়ের অবিষয়ীভূত এবং অতিধানেষও অযোগ্য অদৃশ্যত্বাদি বিশেষণা- ন্বিত যাঁহা(ব্রহ্ম) হইতে মনের সহিত সর্ব্বপ্রকাশনসমর্থ বিজ্ঞানের সহিত ‘প্রীত নিবৃত্ত হয়; এবং যাহা নিষ্পাপ ও নিষ্কাম সর্ব্বৈষণারহিত শ্রোত্রিয়ের আত্মস্বরূপ, আর যাহা বিষয়-বিষয়িভাব(গ্রাহ্য-গ্রাহকভাব) সম্বন্ধরহিত স্বভাবসিদ্ধ নিত্য এবং আত্মা হইতেও অপথগ্ভূত ব্রহ্মসম্বন্ধী পরমানন্দ, সেই ব্রহ্মানন্দ যিনি যথোক্ত প্রকারে জানেন, তিনি কোথা হইতেও ভীত হন না। কারণ তখন ভয়ের কোন নিমিত্তই বিদ্যমান থাকে না। তখন সেই বিদ্বান্ পুরুষ হইতে ভিন্ন এমন কোন বস্তুই থাকে না, যাহা হইতে তিনি ভয় পাইতে পারেন। ১।
লোকে অবিদ্যাবশতঃ যখন অল্পমাত্রও ভেদ দর্শন করে, তখনই তাহার(ভেদ- দর্শীর) ভয় হওয়া যুক্তিযুক্ত। পক্ষান্তরে, বিদ্বানের সম্বন্ধে, তৈমিরিক দৃষ্ট দ্বিতীয় চন্দ্রের ন্যায় অবিদ্যাজনিত সমস্ত ভয়হেতু বিনষ্ট হওয়ায় ‘ন বিভেতি কুতশ্চন’ বলা যুক্তিযুক্তই হইয়াছে। ইতঃপূর্ব্বে মনোময় কোষের প্রস্তাবেও একটা মন্ত্র উল্লিখিত হইয়াছে, কারণ, মনই ব্রহ্মজ্ঞান লাভের প্রকৃষ্ট উপায়। সেই মনোময়ে ব্রহ্মভাব আরোপ করিয়া, তাহারই প্রশংসার্থ ‘ন বিভেতি কদাচন’ বলিয়া কেবল ভয়েব নিষেধ মাত্র করা হইয়াছে; এখানে কিন্তু অদ্বৈত বিজ্ঞানো- দরে ‘ন বিভেতি কুতশ্চন’ বলিয়া ভয়জনক নিমিত্তেরই প্রতিষেধ করা হইতেছে। ২।
ভাল, এখানেও ত উত্তম কর্ম্মের অকরণ ও পাপকর্ম্মের অনুষ্ঠান, এই উভয়ই ভয়-নিমিত্ত বিদ্যমান রহিয়াছে? না, তাহা নাই। কেন? বলা হইতেছে,—
উহারা এই যথোক্ত বিজ্ঞানসম্পন্ন পুরুষকেই সন্তাপ দেয় না। শ্রুতির ‘হ’ ও ‘বাব’ পদ দুইটীর অর্থ অবধারণ(নিশ্চয়)। সাধু কর্ম্মের অননুষ্ঠান ও পাপ কর্ম্মের অনুষ্ঠান কেন যে, তাহাকে তাপ দেয় না, তাহা বলা যাইতেছে,- মৃত্যুকাল আসন্ন হইলে পর, সাধারণতঃ ‘কেন আমি সাধু শোভন(উত্তম) কৰ্ম্ম কবি নাই’, এইরূপ অনুতাপ হইয়া থাকে, এবং কিসের জন্য আমি পাপ- শাস্ত্রনিষিদ্ধ কৰ্ম্ম করিয়াছি’ এইরূপ ভাবনাবশতঃ নরক-পতনজ ভাবী দুঃখের ভয়েও সন্তাপ হইয়া থাকে।:ই উভয়ে - সাধুকর্ম্মের অকরণ ও পাপ ক্রিয়ার আচরণে অজ্ঞ লোক দিগকে যেরূপ তাপ দেয়, কেবল ইহাঁকেই তদ্রূপ তাপ দেয় না বা দিতে পারে না। ৩। কি কারণে বিদ্বানকে সন্তাপ দেয় না, তদুত্তরে বলা হইতেছে- এবংবিধ সেই বিদ্বান্ পুরুষ সন্তাপকর উক্ত সাধুকর্ম্মের অকরণ ও অসাধুকম্মের আচরণ এতদুভয়কেই আত্মস্বরূপ জানিয়া প্রীত বা বলবান হন--অর্থাৎ উক্ত উভয়কেই পরমাত্মস্বরূপে নিরীক্ষণ করিয়া থাকেন।[ সেই কারণেই উহারা তাঁহার তাপকর করেন।] যেহেতু এই বিদ্বান্ পুরুষ স্বরূপতঃ আপনাকে উক্ত পাপপুণ্যরূপ ধৰ্ম্মশূন্যভাবে পরিতৃপ্ত রাখেন। কোন্ বিদ্বান্? যিনি এই প্রকার জানেন, অর্থাৎ পূর্ব্বোক্ত অদ্বৈত এস্থানন্দ অনুভব করেন; তিনি পাপ পুণ্য উভয়ই আত্মস্বরূপে নিরীক্ষণ করেন; সুতরাং বীয্যহীন হওয়ায় উহারা আর তাঁহার তাপকর হয় না, অর্থাৎ উহারা আর জন্মান্তরের আরম্ভক হয় না। ইহাই এই ব্রহ্মানন্দবল্লীর উপনিষৎ ব্রহ্মবিদ্যা, অর্থাৎ এই ব্রহ্মানন্দবল্লীতে সর্ববিদ্যায় সারভূত এই পরম রহস্য প্রদর্শিত হইল-জীবের পরম শ্রেয়ঃ(মোক্ষপথ) এখা- নেই নিহিত বা উপদিষ্ট হইল। ইতি। ১ ॥ ৪০ ॥
ইতি ব্রহ্মানন্দবজ্রীর নবমানুষার্কের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৯ ॥ ইতি ব্রহ্মানন্দবল্লীভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥ ৯ ॥
ভৃঙ্গবল্লী।
ওঁম সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য্যং করবাবহৈ। তেজস্বিনাবধীতমস্ত। মা বিদ্বিষাবহৈ ॥
আভাষভাষ্যম্। সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম আকাশাদি কার্য্যমন্ন- নয়ান্তৎ সৃষ্ট্বা তদেবানুপ্রবিষ্টঃ বিশেষবদিবোপলভ্যমানং যস্মাৎ, তস্মাৎ সর্ব্বকার্য্যবিল- ক্ষণম্ অদৃশ্যাদিধৰ্ম্মকমেব আনন্দং তদেবাহমিতি বিজানীয়াৎ, অনুপ্রবেশস্য তদর্থ- ত্বাৎ; তস্যৈবং বিজানতঃ শুভাশুভে কৰ্ম্মণী জন্মান্তরারম্ভকে ন ভবতঃ - ইত্যেব মানন্দবল্ল্যাং বিবক্ষিতোহর্থঃ। পরিসমাপ্তা চ ব্রহ্মবিদ্যা। অতঃপরং ব্রহ্মবিদ্যা- সাধনং তপো বক্তব্যম্; অন্নাদিবিষয়াণি চোপাসনান্যমুক্তানি, ইত্যতঃ পূর্ব্ববচ্ছান্তি- পাঠপূর্ব্বকমিদমারভ্যতে। আভাষভাষ্যানুবাদ।- যেহেতু, সত্য জ্ঞান ও অনন্তস্বরূপ বন্ধ আকাশ হইতে আরম্ভ করিয়া অন্নময় পর্য্যন্ত সমস্ত ভূতবর্গ সৃষ্টিপূর্ব্বক তন্মধ্যে প্রবেশ করত সবিশেষের(সগুণের) ন্যায় প্রতীতিগোচর হন, সেই হেতু ব্রহ্মানন্দকে উৎপত্তিশীল সর্ব্ববস্তু হ’তে বিলক্ষণ, অথচ অদৃশ্যাদি গুণবিশিষ্ট- রূপে, এবং আপনাকেও তংস্বরূপেই জানিবে; কারণ, অনুপ্রবেশের উদ্দেশ্যই তাহা। এব-বিধ জ্ঞানসম্পন্ন সেই পুরুষের শুভাশুভ কম্মরাশি জন্মান্তর সমুৎ পাদক হয় না। অতীত আনন্দবল্লীতে এই বিষয়ই বিবক্ষিত হইয়াছে। ব্রহ্ম- বিদ্যার প্রসঙ্গও সমাপ্ত হইয়াছে। অতঃপর ব্রহ্মবিদ্যার উপায়ভূত তপস্যার কথা বলিতে হইবে; এবং অন্নাদি বিষয়ে উপাসনাসমূহও উক্ত হয় নাই;[তাহাও বলিতে হইবে; এই জন্য] এই প্রকরণ(ভৃগুবল্লী) আরব্ধ হইতেছে ভৃগুর্বৈ বারুণিঃ। বরুণং পিতরমুপসসার। অধীহি ভগবো ব্রহ্মেতি। তস্মা এতৎ প্রোবাচ। অন্নং প্রাণং চক্ষুঃ শ্রোত্রং মনো বাচমিতি। তঞ্চ হোবাচ। যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে। যেন জাতানি জীবন্তি। যৎ প্রযন্ত্যভি- সংবিশন্তি। তদ্বিজিজ্ঞাসস্ব তদ্ব্রহ্মেতি। স তপোহ- তপ্যত। স তপস্তপ্ত।—॥১৪৪॥
ইতি ভৃগুবল্যাং প্রথমোহনুবাকঃ ॥ ॥
সরলার্থঃ। তৃগুঃ বৈ(প্রসিদ্ধৌ; ভৃগুনায়া প্রসিদ্ধঃ) বারুণিঃ(বরুণস্ত অপত্যং)[জিজ্ঞাসুঃ সন্] ভগবঃ(ভগবন্),[স্বং] ব্রহ্ম(বেদং) অধীছি(মাম্ অধ্যাপর) ইতি(অনেন মন্ত্রেণ) পিতরং বরুণৎ উপসসার(যথাবিধি উপাগতঃ)। তস্মৈ(ভৃগবে) এতৎ(বক্ষ্যমাণৎ বচনং) প্রোবাচ(প্রোক্তবান্)[পিতা], অন্নং(অন্নময়ং শরীরং), প্রাণং, চক্ষুঃ, শ্রোত্রং, মনঃ, বাচম্(বাগিন্দ্রিয়ম্) ইতি (এতানি ব্রহ্মানুভূতিদ্বারভূতানি উক্তবানিত্যর্থঃ)।[ব্রহ্মোপলব্ধিদ্বারাণি উক্কা] তং(ভৃগুং) উবাচ(উক্তবান্) হ(ঐতিহ্যে)[ব্রহ্মণঃ লক্ষণম্-, হে সোম্য] যতঃ (যস্মাৎ কারণভূতাৎ) বৈ(অবধারণে) ইমানি(ব্রহ্মাদিস্থাবরাস্তানি) ভূতামি জায়ন্তে(উৎপদ্যন্তে), জাতানি(উৎপন্নানি চ) যেন(বস্তুনা) জীবন্তি(স্থিতিং লভন্তে), প্রযন্তি(ধ্বংসোন্মুখানি সন্তি চ) যৎ(বস্তু) অতিসংবিশন্তি(যন্ত্র প্রলীয়ন্তে), তৎ(জন্ম-স্থিতি-লয়-নিদানং বস্তু) বিজিজ্ঞাসস্ব(বিশেষণে জ্ঞাতু- মিচ্ছ); তৎ(তচ্চ বস্তু) ব্রহ্ম ইতি।[এতৎ শ্রুত্বা] সঃ(ভৃগুঃ)[ব্রহ্মোপ- লব্ধিসাধনত্বেন] তপঃ অতপ্যত(তপঃ কৃতবান্)। সঃ(ভৃগুঃ) তপঃ তপ্ত। (তপঃ কৃতা)- ॥ ১ ॥ ৪১ ॥
মূলানুবাদ। ভৃগু নামে প্রসিদ্ধ বরুণের পুত্র বারুণি(ব্রহ্ম- জিজ্ঞাসু হইয়া) পিতা বরুণের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন— [ পিতঃ, আমাকে] ব্রহ্মবিদ্যা উপদেশ করুন। পিতা যথাবিধি উপা- গত সেই পুত্রকে[ ব্রহ্মজ্ঞানের উপায়ভূত] অন্ন, প্রাণ, চক্ষুঃ শ্রোত্র, মনঃ ও বাক্যের উপদেশ করিলেন। অনন্তর তাহাকে[ ব্রহ্মের লক্ষণ বলিলেন]—যাঁহা হইতে ব্রহ্মাপ্রভৃতি সমস্ত ভূতবর্গ উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন হইয়াও যাঁহা দ্বারা জীবিত থাকে এবং বিনাশ সময়েও যাহাতে বিলীন হয়, তাঁহাকে বিশেষরূপে জানিতে ইচ্ছা কর; তাহাই ব্রহ্ম।[ ভৃগু এই কথা শুনিয়া] তপস্যা করিলেন। তিনি তপস্যা করিয়া—॥ ১।৪১ ॥
শাক্ষরভাষ্যম্। আখ্যায়িকা বিদ্যাস্ততয়ে, - প্রিয়ায় পুত্রায় পিত্রো- কেতি-ভৃগুর্ব্বে বারুণিঃ। বৈশব্দঃ প্রসিদ্ধানুম্মারকঃ, ভৃগুরিত্যেবংনামা প্রসিদ্ধোহনুস্মার্য্যতে। বারুণিঃ বরুণস্তাপত্যং-বারুণিঃ বরুণং পিতরং ব্রহ্মবিজি- জ্ঞাস্থঃ উপসসার উপগতবান্-অধীহি ভগবো ব্রহ্ম-ইত্যমেন মন্ত্রেণ। অধীহি অধ্যা- পর কথয়। স চ পিতা বিধিবদুপসন্নায় তস্মৈ পুত্রায় এতদ্বচনং প্রোবাচ-অন্নৎ
২০
প্রাণং চক্ষুঃ শোত্রং মনো বাচমিতি। অন্নং শরীরং, তদভ্যন্তরঞ্চ প্রাণম্ অত্তারম্, অনন্তরমুপলব্ধিসাধনানি চক্ষুঃ শ্রোত্রং মনো বাচমিত্যেতানি ব্রহ্মোপলব্ধৌ দ্বারা- ন্যুক্তবান্। উক্ত্বা চ দ্বারভূতান্যেতান্যন্নাদীনি তং ভৃগুৎ হোবাচ ব্রহ্মণো লক্ষণম্। ১।
কিং তৎ? যতঃ যস্মাৎ বৈ ইমানি ব্রহ্মাদীনি স্তম্বপর্য্যন্তানি ভূতানিজায়ন্তে, যেন চ জাতানি জীবন্তি প্রাণান্ ধারয়ন্তি বর্দ্ধন্তে, বিনাশকালে চ যৎ প্রয়ন্তি যদ্ ব্রহ্ম প্রতিগচ্ছন্তি অভিসংবিশন্তি তাদাত্ম্যমেব প্রতিপ্রদ্যন্তে; উৎপত্তিস্থিতিলয়- কালেষু যদাত্মতাং ন জহতি ভূতানি, তদেতদ্ ব্রহ্মণো লক্ষণম্। তদ্ব্রহ্ম বিজিজ্ঞা- সস্ব বিশেষেণ জ্ঞাতুমিচ্ছস্ব, যদেবংলক্ষণং ব্রহ্ম, তদন্নাদিদ্বারেণ প্রতিপদ্যস্বেত্যর্থঃ। শ্রুত্যন্তরঞ্চ-“প্রাণস্য প্রাণমুত চক্ষুষশ্চক্ষুরুত শ্রোত্রস্য শ্রোত্রমন্নস্যান্নং মনসো যে মনো বিদুস্তে নিচিক্যুব্রহ্ম পুরাণমগ্র্যম্’ ইতি। ব্রহ্মোপলব্ধৌ দ্বারাণ্যেতানীতি দর্শয়তি। স ভৃগুঃ ব্রহ্মোপলব্ধিদ্বারাণি ব্রহ্মলক্ষণং চ শ্রুত্বা পিতুঃ, তপ এব ব্রহ্মোপ- লব্ধিসাধনত্বেন অতপ্যত তপ্তবান্। ২
কুতঃ পুনরমুপদিষ্টস্যৈব তপসঃ সাধনত্বপ্রতিপত্তিঃ ভূগোঃ? সাবশেষোক্তেঃ। অন্নাদিব্রহ্মণঃ প্রতিপত্তৌ দ্বারং, লক্ষণং চ ‘যতো বা ইমানি ভূতানি’ ইশ্যাদ্যক্ত সাবশেষং হি তৎ, সাক্ষাদ্ব্রহ্মণোহনির্দেশাৎ। অন্যথা হি স্বরূপেণৈব ব্রহ্ম নির্দ্দিষ্টব্যং জিজ্ঞাসবে পুত্রায়- ইদমিথংরূপং ব্রহ্মেতি; ন চৈবং নিরদিক্ষৎ; কিন্তুহি, সাবশেষ- মেবোক্তবান্। অতোহবগম্যতে-নূনং সাধনান্তরমপ্যপেক্ষতে পিতা ব্রহ্মবিজ্ঞানং প্রতীতি। তপোবিশেষ প্রতিপত্তিস্তু সর্ব্বসাধকতমত্বাৎ; সর্ব্বেষাং হি নিয়তসাধ্য- বিষয়াণাৎ সাধনানাং তপ এব সাধকতমৎ সাধনমিতি হি প্রসিদ্ধৎ লোকে। তস্মাৎ পিত্রা অনুপদিষ্টমপি ব্রহ্ম-বিজ্ঞানসাধনত্বেন তপঃ প্রতিপেদে ভৃগুঃ। তচ্চ তপঃ বাহান্তঃকরণসমাধানম্, তদ্দ্বারকত্বাৎ ব্রহ্মপ্রতিপত্তেঃ। “মনসশ্চেন্দ্রিয়াণাঞ্চ হৈকাগ্র্যং পরমৎ তপঃ। তজ্জায়ঃ সর্ব্বধর্ম্মেভ্যঃ স ধৰ্ম্মঃ পর উচ্যতে।” ইতি স্বতেঃ। স চ তপস্তপ্ত্বা ॥ ১ ॥ ৪১ ॥ ইতি ভৃগুবল্ল্যাং প্রথমানুবাকভাষ্যম্ ॥ ১ ॥
ভাষ্যানুবাদ। ‘ভৃগুঃ বৈ বারুণিঃ’ ইত্যাদি আখ্যায়িকার(ভৃগু- বরুণ সংবাদের) উদ্দেশ্য—বর্ণনীয় বিস্তার প্রশংসা জ্ঞাপন করা। পিতা যখন আপনার প্রিয় পুত্রকে এই বিস্তার উপদেশ করিয়াছেন;(তখন ইহাতেই বিস্তার উৎকর্ষ প্রকাশ পাইতেছে)(১)। শ্রুতির ‘বৈ’ শব্দটী বিষয়ের প্রসিদ্ধতা স্মারক;
অর্থাৎ ভগুনামে প্রসিদ্ধ ঋষির কথা স্মরণ করাইয়া দিতেছে। বারুণি অর্থ বরুণের পুত্র। সেই বারুণি ব্রহ্মজিজ্ঞাসু হইয়া পিতা বরুণের নিকট-‘ভগবন্, আপনি আমাকে ব্রহ্মোপদেশ প্রদান করুন’(অধীহি ভগবঃ, ব্রহ্ম) এই মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক উপস্থিত হইয়াছিলেন। ‘অধীহি অর্থ ‘অধ্যাপয়’ শিক্ষাদান করুন-বলুন। সেই পিতা যথাবিধি উপাগত সেই পুত্রকে এই কথা বলিয়াছিলেন-অন্ন, প্রাণ, চক্ষুঃ শ্রোত্র,(কর্ণ), মন ও বাক্। অন্ন অর্থ-শরীর, এখানে অন্নময় কোষ; আর প্রাণ হইল, তদভ্যন্তরস্থ অত্তা(ভোক্তা)। এতদুভয়ের কথা বলিয়া অনন্তর ব্রহ্মোপলব্ধির উপায়স্বরূপ চক্ষুঃ শ্রোত্র মন ও বাক্, এই কয়টা জ্ঞানসাধনের উপদেশ করিলেন। ব্রহ্মোপলব্ধির দ্বারস্বরূপ এই অন্ন প্রভৃতির উপদেশ করিয়া, সেই ভৃগুকে ব্রহ্মলক্ষণ বলিয়াছিলেন। ১ সেই লক্ষণটা কি? না, যাঁহা হইতে এই ব্রহ্মাদি শুদ্বপর্য্যন্ত ভূতবর্গ জন্ম লাভ করে, জাত হইয়াও যাঁহা দ্বারা জীবিত থাকে, অর্থাৎ প্রাণ ধারণ করে- বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়, এবং বিনাশ কালেও, যে ব্রহ্মে প্রতিগত(প্রত্যাগত) হইয়া অভিশংবিষ্ট ‘ইয়’অর্থাৎ তদভিন্নভাব লাভ করে; ফল কথা, উৎপত্তি, স্থিতি বা বিলয়কালেও ভূতবর্গ যাঁহার সহিত তদাগ্নকভাব(অভিন্নভাব) ত্যাগ করে না, (তিনিই ব্রহ্ম); ইহাই ব্রহ্মের লক্ষণ(১)। সেই ব্রহ্মকে বিশেষ ভাবে জানিতে ইচ্ছা কর। উক্ত লক্ষণবিশিষ্ট ব্রহ্মকে ‘অন্নময়াদিক্রমে অবগত হও বা প্রাপ্ত হও। অপর শ্রুতিও --যাহারা ব্রহ্মকে প্রাণের প্রাণ, চক্ষুর চক্ষু, শ্রোত্রের শ্রোত্র, অন্নের অন্ন ও মনের মন বলিয়া অবগত হইয়াছিলেন, তাঁহাবাই তাঁহাকে সর্ব্বাদি পুরাণ পুরুষ বলিয়া নিদ্ধারণ করিয়াছিলেন’ ইত্যাদি বাক্যে ব্রহ্মোপলব্ধির জন্য এই সমুদয় উপায় প্রদর্শন করিয়াছে। সেই ভৃগু পিতার নিকট হইতে ব্রহ্মোপলব্ধির উপায় সমূহ ও ব্রহ্ম-লক্ষণ অবগত হইয়া, ব্রহ্মোপলব্ধির উপায়রূপে তপস্যা অবলম্বন করিয়াছিলেন। ২
ভাল কথা, তপস্যা যে, ব্রহ্মোপলব্ধির উপায়, একথা ত ভৃগুর পিতা ভৃগুকে বলেন নাই; তবে কিরূপে ভৃগু অনুপদিষ্ট তপস্থাকে ব্রহ্মোপলব্ধির উপায়- রূপে অবধারণ করিলেন? হাঁ, পিতৃবাক্যের অসম্পূর্ণতাই(ভৃগুর ঐরূপ ‘অবধারণের) কারণ। কেন না, ‘যতো বা ইমানি’ ইত্যাদি বাক্যে অন্নময়াদি- রূপ ব্রহ্মের বিজ্ঞান ও লক্ষণ উক্ত হইয়াছে সত্য, কিন্তু সে বাক্য ত অসম্পূর্ণই রহিয়াছে; কারণ,[এ পর্যন্ত] সাক্ষাৎসম্বন্ধে কোথাও ব্রহ্মের স্বরূপ নির্দেশ করা হয় নাই। বাক্যটা সম্পূর্ণ করিতে হইলে, জিজ্ঞাসু পুত্রের নিকট সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ব্রহ্মের স্বরূপ নির্দেশ করাই উচিত ছিল-‘ব্রহ্ম এবস্তুত এবং এই প্রকার’; কিন্তু তিনি তাহা নির্দেশ করেন নাই; তবে কি করিয়াছেন; না, সাবশেষ বা অসম্পূর্ণ ভাবেই[তটস্থ লক্ষ্মণ দ্বারা) নির্দেশ করিয়াছেন? অতএব বুঝা যাইতেছে যে, পিতা বরুণ ঋষি ব্রহ্মের স্বরূপ প্রতীতির জন্য আরও অতিরিক্ত সাধনের অপেক্ষা রাখিয়াছিলেন, অর্থাৎ যে সমুদয় উপায় নির্দেশ করা হইল, সে সমুদয় উপায় কেবল ব্রহ্মের পরোক্ষ জ্ঞানেরই সাধন মাত্র; কিন্তু তাঁহার অপরোক্ষ বা সাক্ষাৎ সম্বন্ধে স্বরূপবিজ্ঞানের জন্য আরও কিছু সাধন আছে, যাহার অভাবে ব্রহ্মের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করা যায় না, ইহা ভৃগু নিশ্চয়ই পিতৃ বাক্য হইতে বুঝিতে পারিয়া- ছিলেন। সেই অতিরিক্ত সাধনটী যে, তপোবিশেষ, ইহা তিনি তপস্যার সর্ব্বার্থ সাধনক্ষমতা হইতে বুঝিয়াছিলেন। কেন না, বিভিন্নপ্রকার ফলের জন্য পৃথক্ পৃথক্ ভাবে যে সমুদয় সাধন বা উপায় নির্দিষ্ট আছে, তন্মধ্যে তপস্যাই সর্ব্বোৎকৃষ্ট সাধন বা উপায়, ইহা জগৎপ্রসিদ্ধ কথা;(৩)। কাজেই পিতার উপদেশ ব্যতিরেকেও ভৃগু স্ববুদ্ধিপ্রভাবেই তপস্বীকে ব্রহ্মবিজ্ঞানের উপায়রূপে বুঝিয়া- ছিলেন, এবং গ্রহণও করিয়াছিলেন। সেই তপস্যাও এখানে বাহ্য ও অন্তঃকরণের সমাধান বা একাগ্রতা মাত্র; কারণ, উহাই ব্রহ্মোপলব্ধির দ্বার। স্মৃতিশাস্ত্রও একাগ্রতাকেই পরম তপস্যা বলিয়া নিদ্দেশ করিয়াছেন ‘মন ও ইন্দ্রিয়গণের যে, একাগ্রতা তাহাই পরম তপস্যা; এবং তাহাই সর্ব্বধর্মাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পরম ধৰ্ম্ম বলিয়া কথিত হয়।’ ভৃগু সেই তপস্যা করিয়া-॥ ১ ॥ ৪১ ॥
ইতি ভৃগুদেবীর প্রথমানুবাকের ভাষ্যানুবাদ ॥ ১ ॥
(৩) অভিপ্রায় এই যে, সিদ্ধিলাভের যত প্রকার সাধন আছে, তন্মধ্যে তপস্যাই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সাধন। ঋষিরা বলিয়াছেন— ‘নাসাধ্যং হি তপস্যতঃ’ তপস্বীর অসাধ্য বা দুর্লভ কিছু নাই; কাজেই এখানে পিতার উপদেশ না পাইয়াও, তৃপ্ত শাস্ত্রান্তর সংবাদে ও লোক প্রসিদ্ধি অনুসারে ব্রহ্মবিদ্যার জন্য তপস্যাকেই সর্ব্বোৎকৃষ্ট সাধন বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিলেন।
অন্নং ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। অন্নাদ্ধ্যে। খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। অন্নেন জাতানি জীবন্তি। অন্নং প্রয়ন্ত্যভি- সংবিশন্তীতি। তদ্বিজ্ঞায়। পুনবেব বরুণ, পিরপসসার। অধীহি ভগবো ব্রহ্মেতি। তঞ্চ হোবাচ।‘তপসা ব্রহ্ম। বিজিজ্ঞ- সম্ব। তপো ব্রহ্মেতি। স তপোহত্যত, স তপতপ্তা— ॥১॥।২॥
সরলার্থঃ।[স ভৃগুঃ তপঃ পুা] অন্নং বঙ্গেতি এজানাৎ অন্ন’মর ব্রহ্মত্বেন জ্ঞাতবান্।। হি(যতঃ) ইমানি। ব্রহ্মাদিতৃণপয্যতানি তানি অন্নাৎ এব খলু। নিশ্চয়। জায়ন্তে, জাতানি চ সন্তি অন্নেন জীবন্তি, পন্তি চ(বিনাশোন্মুখানি চ সন্তি), অন্নং অভিসংশন্তি অন্নে বিলীয়ন্তে। হাত। উৎ(অন্ন-ব্রহ্ম) বিজ্ঞায়। জ্ঞাত্বা। সংশয়াপন্নঃ সন পুনঃ এব(আপ) পিতরং বরুণম্ উপাসার(উপগতবান্ ভগবঃ ভগবন) ত্বং] ব্রহ্ম অধীতি। মাম্ অধ্যাপয়) ইতি(অনেন মন্ত্রেণ। স চ দিবা। তম্(ভুগুং উবাচ- তপসা বাহ্যাস্তঃকরণসমাধানেন) বন্ধ বিজিহ্বাসঙ্গ। যতঃ] তঃ ব্রহ্ম (ব্রহ্মলাভহেতুঃ) ইতি। সঃ। ভৃগুঃ। পিত্রৈবম উবাদঃ সন ৩: অপত্য। সঃ(ভৃগুঃ) তপঃ তপ্ত্বা॥ ১৪২॥
মূলানুবাদ। “সেই ভৃগু তপস্যা করিয়া) জানিয়াছিলেন, অন্নই ব্রহ্ম। কারণ: যেহেতু অন্ন হইতেই সমস্ত ভূত উৎপন্ন হয়; উৎপন্ন হইয়াও অন্ন দ্বারাই জাবিত থাকে; এবং বিনাশকালেও অন্নেই বিলীন হয়। ভৃগু তাহা অবগত হইয়া পুনশ্চ পিতা বরুণের নিকট যথাবিধি উপস্থিত হইলেন; এবং বলিলেন আমাকে ব্রহ্মোপদেশ প্রদান করুন। পিতা বলিলেন -তপস্যা দ্বারা ব্রহ্মকে বিশেষভাবে, জানিতে ইচ্ছা কর; তপস্যাই ব্রহ্ম। তদনন্তর ভৃগু তপস্যা করিলেন; এবং তপস্যা করিয়া—॥ ১।৪১ ॥
ইতি ভৃগুবল্লী-দ্বিতীয়ানুবাকব্যাখ্যা। ১॥
শাঙ্করভাষ্যম্। - অন্নং ব্রহ্মেতি ব্যজানাদ্বিজ্ঞাতবান্। তদ্ধি যথোক্তলক্ষণোপেতম্। কথম্? অন্নাদ্যের পলু ইমানি ভূতানি জায়ন্তে, অন্নেন
জাতানি জীবন্তি, অন্নং প্রয়ন্তি অভিসংবিশন্তীতি। তস্মাৎ যুক্তমন্নস্য ব্রহ্মত্ব- মিত্যভিপ্রায়ঃ। স এবং তপস্তপ্তা, অন্নং ব্রহ্মেতি বিজ্ঞায় লক্ষণেনোপপত্যা চ পুনরেব সংশয়মাপন্নঃ বরুণং পিতরমুপসসার - অধীহি ভগবো ব্রহ্মেতি। ১
কঃ পুনঃ সংশয়হেতুরস্যেতি? উচ্যতে অন্নস্থোৎপত্তিদর্শনাৎ। তপসঃ পুনঃপুন রূপদেশ; সাধনাতিশয়ত্বাবধারণার্থঃ। যাবদ্রহ্মণো লক্ষণং নিরতিশয়ং ন ভবতি, যাবচ্চ জিজ্ঞাসা ন নিবর্ত্ততে, ‘তাবত্তপ এব তে সাধনম্; তপসৈব ব্রহ্মবিজিজ্ঞাসস্বে- ত্যর্থঃ। ঋজন্যৎ ॥ ১ ॥ ৪২ ॥
ভাষ্যানুবাদঃ—( ভৃগু তপস্যার পর] বুঝিয়াছিলেন—অন্নই ব্রহ্ম। কারণ, অন্ন হইতেই এই সমুদয় ভূত(ব্রহ্মা হইতে তৃণপর্য্যন্ত) জন্মলাভ করে; জাত ইহারাও অন্ন দ্বারাই জীবিত থাকে; এবং বিনাশ সময়েও অন্নেই বিলীন হইয়া থাকেন। অভিপ্রায় এই যে, সেইহেতু অন্নের ব্রহ্মত্ব যুক্তিযুক্তই বটে। সেই ভৃগু এইরূপে তপস্যা করিয়া, এবং ব্রহ্মের লক্ষণ ও তদ্বিষয়ক বিচার দ্বারা অন্নই ব্রহ্ম এইরূপ জানিয়া পুনশ্চ ‘সংশয় যুক্ত হইয়া পিতা বরুণের নিকট উপস্থিত হইলেন;[এবং বলিলেন,] ভগবন্ আমাকে ব্রহ্মোপদেশ প্রদান করুন। ১
ভাল কথা, ভৃগুর উক্ত বিষয়ে সংশয়ের কারণ কি? হাঁ, বলা হইতেছে— অন্নের উৎপত্তি দর্শনই কারণ; অভিপ্রায় এই যে, অন্ন নিজে যখন উৎপত্তিশীল পদার্থ, তখন অন্ন ত সর্ব্বকারণ হইতেই পারে না; পরন্তু উহারও অন্য কারণ থাকা আবশ্যক হয়; সুতরাং অন্নই সর্ব্বকারণীভূত ব্রহ্ম হইতে পারে না; এই জন্যই ভৃগুর মনে ব্রহ্মবিষয়ে সংশয় সমুৎপন্ন হইয়াছে। অন্যান্য সাধন অপেক্ষা তপস্যার শ্রেষ্ঠতা জ্ঞাপনের জন্য এখানে তপের পুনঃ পুনঃ উল্লেখ করা হইয়াছে। যে পর্য্যন্ত ব্রহ্মের সব্বাতিশায়ী লক্ষণ নিরূপিত না হয়, এবং যে পর্য্যন্ত ব্রহ্ম- জিজ্ঞাসা নিবৃত্ত না হয়, তাবৎকাল তোমার পক্ষে তপই একমাত্র সাধন। তপস্যা দ্বারাই ব্রহ্মকে বিশেষ ভাবে জানিতে ইচ্ছা কর। অন্যান্য অংশ সরল ॥১॥০২৷৷
ইতি ভৃগুবংশী-দ্বিতীয়ানুবাকের ভাষ্যানুবাদ ॥২॥.
প্রাণো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। প্রাণাদ্ধ্যেব খাল্বমানি ভূতানি জায়ন্তে। প্রাণেন জাতানি জাবন্তি। প্রাণং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশ- স্তীতি। তদ্বিজ্ঞায়। পুনরের বরুণং পিতরমুপসসার। অধীহি
ভগবো ব্রহ্মেতি। তঞ্চ হোবাচ। তপসা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসম্ব। তপো ব্রহ্মেতি। স তপোহতপ্যত। স তপস্তপ্ত্বা ॥, ॥ ৪৩ ইতি ভগবলাঃ।
ইতি ভৃগুবল্ল্যাং তৃতীয়োহনুবাকঃ ॥ ৩ ॥ সরলার্থঃ।[স ভৃগুঃ] প্রাণঃ ব্রহ্ম ইতি ব্যজানাৎ। হি(যতঃ) ইমানি ভূতানি খলু প্রাণাৎ এব জায়ন্তে, জাতানি চ প্রাণেন এব জীবন্তি; প্রযন্তি[চ সন্তি] প্রাণম্ এব অভিসংবিশন্তি ইতি। তৎ(প্রাণ-ব্রহ্ম) বিজ্ঞায় পুনঃ এব পিতরং বরুণম্ উপসসার—ভগবঃ, ব্রহ্ম অধীহি ইতি।[পিতা বরুণঃ] তৎ উবাচ হ—তপসা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসস্ব; তপঃ ব্রহ্ম ইতি। সঃ(ভৃগুঃ) তপঃ অতপ্যত। সঃ তপঃ তপ্ত্বা—॥১॥৪৩৷৷ মুলান পাঠ।[ মূলানুবাদ।[ভৃগু তপস্যার ফলে] জানিয়াছিলেন— পঞ্চবৃত্ত্যাত্মক প্রাণই ব্রহ্ম। কেননা, প্রাণ হইতেই এই সমস্ত ভূত উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন হইয়াও প্রাণের দ্বারাই জীবিত থাকে, এবং বিনাশকালেও প্রাণেই বিলীন হয়। ভৃগু ইহা অবগত হইয়া পুনরায় পিতৃসমাপে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, ভগবন্, আমাকে ব্রহ্মোপদেশ প্রদান করুন। পিতা তাহাকে বলিলেন—তুমি তপস্যা দ্বারা ব্রহ্মকে জানিতে ইচ্ছা কর। তপস্যাই ব্রহ্ম। ভৃগু তপস্যা করিলেন। তিনি তপস্যা করিয়া—॥ ১ ॥ ৪৩ ॥
ইতি ভৃগুবল্লী তৃতীয়ানুবাকব্যাখ্যা ॥ ৩ ॥
শঙ্করভাষ্যম্। ॥০॥১৪৫॥ ভাষ্যানুবাদ।—॥০।১৪৩॥ মনো ব্রাক্ষেতি ব্যজানাৎ। মনসো হ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। মনসা জাতানি জীবন্তি। মনঃ প্রয়ন্ত্যভিসং- বিশন্তীতি। তদ্বিজ্ঞায়। পুনরের বরুণং পিচরমুপসসার। অধীহি ভগবো ব্রহ্মেতি। তঞ্চ হোবাচ। তপসা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসস্ব। তপো ব্রহ্মেতি। স তপোঽতপ্যত। স তপস্তপ্ত্বা—॥১॥৪৪॥
ইতি ভৃগুবল্ল্যাং চতুর্থোহনুবাকঃ ॥ ৪ ॥ সরলার্থঃ। মনঃ(সংকল্প-বিকল্পাত্মকং অন্তঃকরণং) ব্রহ্ম ইতি ব্যজানাৎ। হি(যতঃ) ইমানি ভূতানি খলু মনসঃ এব জায়ন্তে; জাতানি চ
মনসা এব জীবন্তি; প্রবন্তি[চ সন্তি](মনঃ) অভিসংবিশন্তি ইতি।[ভৃগুঃ]। তৎ বিজ্ঞায় পুনঃ এব পিতরং বরুণম্ উপসসার—ভগবঃ, ব্রহ্ম অধীহি ইতি। [পিতা] তং(বরুণং) উবাচ হ—তপসা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসম্ব; তপঃ ব্রহ্ম ইতি। সঃ(ভৃগুঃ) তপঃ অতপ্যত সঃ তপঃ তপ্ত্বা॥৪॥ মূলানুরাদ[ভৃগু তপস্যা করিয়া] জানিয়াছিলেন— মনই ব্রহ্ম। কেন না, মন হইতেই এই সমস্ত ভূত উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন হইয়াও মনের দ্বারাই জীবিত থাকে, এবং বিনাশকালেও মনেই বিলীন হইয়া থাকে। ভৃগু ইহা অবগত হইয়া পুনরায় পিতার সমীপে সমাগত হইলেন—বলিলেন, ভগবন্ আমাকে ব্রহ্মো- পদেশ প্রদান করুন।[পিতা] তাঁহাকে বলিলেন—তপস্যা দ্বারা ব্রহ্মকে জানিতে ইচ্ছা কর; তপস্যাই ব্রহ্ম। তিনি তপস্যা করিলেন। তিনি তপস্যা করিয়া --॥ ১ ॥ ৪৪ ॥
ইতি ভৃগুবল্লী-চতুর্থানুবাকব্যাখ্যা ॥ ৪ ॥
শঙ্করভাষ্যম্।—॥০॥১৪৪॥
ভাষ্য। অনুবাদ।—॥০॥;১৪৪॥
বিজ্ঞানং ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। বিজ্ঞানাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। বিজ্ঞানেন জাতানি জীবন্তি। বিজ্ঞানং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তীতি। তদ্বিজ্ঞায়। পু-রেব বরুণং পিতর- মুপসসার। অধীহি ভগবো ব্রহ্মেতি। তঞ্চ হোবাচ। তপসা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসস্ব। তপো ব্রহ্মেতি। স তপোহতপ্যত। স তপস্তপ্ত্বা ॥ ১ ॥ ৪৫ ॥
ইতি ভৃগুবল্ল্যাং পঞ্চমোহনুবাকঃ ॥ ৫ ॥
সরঃসার্থঃ। বিজ্ঞানং(বুদ্ধিঃ) ব্রহ্ম ইতি ব্যজানাৎ। হি(যতঃ) ইমানি ভূতানি খলু বিজ্ঞানাৎ এব জায়ন্তে, জাতানি চ বিজ্ঞানেন জীবন্তি; প্রযন্তি চ বিজ্ঞানম্ অভিসংবিশন্তি ইতি।[ভৃগুঃ তং[বিজ্ঞান-ব্রহ্ম] বিজ্ঞায় পুনঃ এব পিতরং বরুণম্ উপসসার --ভগবঃ, ব্রহ্ম অধীহি ইতি।[পিতা] তং(ভৃগুং) উবাচ হ - তপসা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসস্ব; তপঃ ব্রহ্ম ইতি। স(ভৃগুঃ) তপঃ অতপ্যত; সঃ তপঃ তপ্তা—॥১৮:৫॥
মূলানুবাদ। তিনি জানিয়াছিলেন—বিজ্ঞানই(বুদ্ধিই) ব্রহ্ম। কেন না, এই সমস্ত ভূত বিজ্ঞান হইতেই জন্মে; জাত হইয়াও বিজ্ঞান দ্বারাই জীবিত থাকে এবং বিনাশকালেও বিজ্ঞানেই সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ করে। ভৃগু ‘ইহা অবগত হইয়া পুনর্ব্বার পিতার সমীপে সমাগত হইলেন, এবং বলিলেন—ভগবন্, আমাকে ব্রহ্মোপদেশ প্রদান করুন। পিতা তাঁহাকে বলিলেন— তপস্যা দ্বারা ব্রহ্মকে জানিতে ইচ্ছা কর; তপস্যাই ব্রহ্ম। ভৃগু তপস্যা করিলেন। তিনি তপস্যা করিয়া—॥১৪৪৫॥
ইতি ভৃগুবল্লী পঞ্চমানুবাকব্যাখ্যা। ॥৫॥
শঙ্করভাষ্যম্।—॥ ০ ॥—১১॥৪৫॥
ভাষ্যানুবাদ।—॥ ০ ॥—॥১৪৫॥
আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। আনন্দাদ্ধ্যের খাল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তি। আনন্দং প্রযন্ত্যভিসংবিশন্তীতি। সৈষা ভার্গবী বারুণী বিদ্যা। পরমে ব্যোমন্ প্রতিষ্ঠিতা। স য এবং বেদ প্রতিপ্রতিষ্ঠাত। অন্ন- বানন্নাদো ভবতি। মহান্ ভবতি। প্রজয়া পশুভিরহ্মবর্চ্চ- সেন। মহান্ কীর্ত্যা ॥ ১ ॥ ৪৬ ॥
ইতি ভৃগুবল্ল্যাং ষষ্ঠোহনুবাকঃ ॥ ৬ ॥
সরলার্থঃ।[স ভৃগুঃ তপঃ তপ্ত।] আনন্দঃ বন্ধ ইতি ব্যজানাৎ। হি(যতঃ) ইমানি ভূতানি খলু আনন্দাৎ এব জায়ন্তে, জাতানি আনন্দেন এব জীবন্তি; প্রযন্তি চ আনন্দম্ এব অভিসংবিশন্তি ইতি।
সা এষা(যথোক্তা) ভার্গবী(ভৃগুণা জ্ঞাতা) বারুণী(বরুণেন কথিতা), বিদ্যা পরমে ব্যোমন্(ব্যোমি, হৃদয়াকাশ-গুহায়াৎ অদ্বৈতে আনন্দে) প্রতিষ্ঠা (অন্নময়াদারভ্য সমাপ্তা)। সঃ যঃ(যঃ কশ্চিৎ) এবং(যথোক্তাং বিদ্যাৎ, বেদ(বিজানাতি.),[সঃ] প্রতিপ্রতিষ্ঠতি(লোকে প্রতিষ্ঠাৎ গচ্ছতি), অন্নবান্ (প্রভুতান্নসম্পন্নঃ), অন্নাদঃ(অন্নভোক্তা চ) ভবতি; প্রজয়া(সন্তত্যা) পশুভিঃ (গবাদিভিঃ) ব্রহ্মবর্চ্চসেন(ব্রহ্মণ্যতেজসা) মহান ভবতি। কীর্ত্যা(যশসা চ) মহান(প্রধানঃ) ভবতি। ১৪৪৬৷৷
২৫
মূলানুবাদ।[ভৃগু তপস্যা করিয়া] বুঝিয়াছিলেন—যে, আনন্দই ব্রহ্ম। কারণ, এই সমস্ত ভূত আনন্দ হইতেই উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন হইয়াও আনন্দ দ্বারাই বাঁচিয়া থাকে, এবং বিনাশ সময়েও আনন্দেই বিলীন হইয়া থাকে।
এই সেই ভার্গবী(ভৃগুকর্তৃক পরিজ্ঞাত) বারুণী(বরুণ কর্তৃক উপদিষ্ট) বিদ্যা পরম ব্যোমে(অর্থাৎ হৃদয়াকাশরূপ গুহায়) প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ অন্নময় কোশ হইতে আরম্ভ করিয়া আনন্দময়ে পরিসমাপ্ত হইয়াছে। যে কোন লোক এই প্রকার বিদ্যা অবগত হয়, সেই লোক জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন, প্রচুর অন্নসম্পন্ন ও অন্নভোক্তা হন; প্রজা(সন্তান) পশুসম্পদ্ ও ব্রহ্মণ্যতেজে মহান্ হন এবং কীর্তিতেও মহান্ হন ॥১৪৪৬৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। এবং তপসা বিশুদ্ধাত্মা প্রাণাদিষু সাকল্যেন শ্রদ্ধা- লক্ষণমপশুন্ শনৈঃশনৈরনুপ্রবিশ্যান্তরতমমানন্দং ব্রহ্ম বিজ্ঞাতবান্ তপসা এব সাধ- নেন ভৃগুঃ, তস্মাদব্রহ্মবিজিজ্ঞাসুনা বাহান্তঃকরণসমাধানলক্ষণং পরমৎ তপঃসাধন- মনুষ্ঠেয়মিতি প্রকরণার্থঃ। অধুনা আখ্যায়িকাং চ উপসংহৃত্য শ্রুতিঃ স্বেন বচনে- নাখ্যায়িকানির্বর্ত্যমর্থমাচষ্টে—সা এষা ভার্গবী—ভৃগুণা বিদিতা বরুণেন প্রোক্তা— বারুণী বিদ্যা পরমে ব্যোমন্ হৃদয়াকাশগুহায়াৎ পরমানন্দেহদ্বৈতে প্রতিষ্ঠিতা পরিসমাপ্তা অন্নময়াদাত্মনোঽধিপ্রবৃত্তা ।১
এবমন্যোহপি তপসা এব সাধনেন অনেনৈব ক্রমেণ অনুপ্রবিশ্য আনন্দৎ ব্রহ্ম বেদ, স এবং বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানাৎ প্রতিতিষ্ঠতি আনন্দে পরমে ব্রহ্মণি, ব্রহ্মৈব ভবতীত্যর্থঃ। দৃষ্টঞ্চ ফলং তস্যোচ্যতে—অন্নবান্ প্রভূতমন্নমস্ত বিদ্যত ইত্যন্নবান্; • সত্তামাত্রেণ তু সর্ব্বো হ্যন্নবানিতি বিদ্যায়া বিশেষো ন স্যাৎ। এবমন্নমত্তীত্যন্নাদো দীপ্তাগ্নির্ভবতীত্যর্থঃ। মহান্ ভবতি। কেন মহত্বমিত্যত আহ,—প্রজয়া পুত্রাদিনা, পশুভিঃ গবাশ্বাদিভিঃ, ব্রহ্মবর্চ্চসেন শমদমজ্ঞানাদিনিমিত্তেন তেজসা মহান্ ভবতি, কীর্ত্যা খ্যাত্যা শুভাচারনিমিত্তয়া ॥১॥৪৬৷৷
ভাষ্যানুবাদ। এইরূপে তপস্যা দ্বারা বিশুদ্ধচিত্ত ভণ্ড উল্লিখিত প্রাণ প্রভৃতিতে ব্রহ্মের সম্পূর্ণ লক্ষণ না দেখিয়া ক্রমশঃ ভিতরের দিকে প্রবেশ করিয়া অর্থাৎ ক্রমশঃ অন্তর্দৃষ্টি লাভ করিয়া তপস্যা প্রভাবেই আনন্দকে ব্রহ্ম
বলিয়া জানিয়াছিলেন। সেই হেতু ব্রহ্মজিজ্ঞাসু পুরুষের বহিরিন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয়ের সমাধি বা একাগ্রতারূপ পরম সাধন তপস্যার অনুষ্ঠান করা আব- শ্যক, ইহাই এই প্রকরণের অভিপ্রেত বা তাৎপর্য্যার্থ। অতঃপর শ্রুতি নিজেই আখ্যায়িকা সমাপ্ত করিয়া নিজের কথায় আখ্যায়িকার তাৎপর্য্যার্থ ব্যক্ত করিতেছেন—উক্ত প্রকার এই ভার্গবী অর্থাৎ ভৃগুকর্তৃক বিদিত এবং বরুণ কর্তৃক উপদিষ্ট—বারুণী বিদ্যা পরম ব্যোমে অর্থাৎ হৃদয়াকাশ-গুহায় অদ্বৈত পরমানন্দে প্রতিষ্ঠিতা—অন্নময় আত্মা হইতে আরব্ধ হইয়া উক্ত পরমানন্দে পরিসমাপ্ত হইয়াছে।১
অন্যও যে কোন লোক যথোক্ত প্রণালীক্রমে এই তপস্যারূপ সাধন দ্বারা অন্তর্দৃষ্টি লাভ করত আনন্দরূপী ব্রহ্মকে জানেন, তিনিও এই প্রকার বিদ্যা প্রতিষ্ঠা প্রভাবে পরমানন্দ ব্রহ্মে স্থিতি লাভ করেন, অর্থাৎ ব্রহ্মই হন। বিস্তার দৃষ্ট(লৌকিক) ফলও বলা হইতেছে-সেই বিদ্বান্ অন্নবান্-প্রচুর পরিমাণে অন্ন লাভ করেন; যৎকিঞ্চিৎ অন্নসম্পদ, সকল লোকেরই থাকিতে পারে; তাহাতে বিদ্যাবানের কোনও বিশেষত্ব ঘটে না।(এইজন্য ‘অন্নবান’ অর্থে প্রচুর অন্নসম্পন্ন বলা হইল)। সেই লোক অন্নাদ-অন্নভোক্তা অর্থাৎ দীপ্তাগ্নি হন; এবং মহান্ হন। কিসে মহত্ত্ব, তাহা বলা হইতেছে প্রজা-পুত্রাদি দ্বারা, পশু-গো-অশ্ব প্রভৃতি দ্বারা, এবং ব্রহ্মবর্চ্চস-শম, দম ও জ্ঞানাদিলব্ধ তেজে (মহান হন); আর কীর্তি-মঙ্গলময় আচারজনিত যশেও মহান হন ॥১৷৷৪৬৷৷
ইতি পৃথ্বীরাজবংশের ভাষ্যভাষ্য ॥৩॥
অন্নং ন নিন্দ্যাৎ। তদ্ব্রতম্। প্রাণো বা অন্নম্। শরীর- মন্নাদম্। প্রাণে, শরীরং প্রতিষ্ঠিতম্। শরীরে প্রাণঃ প্রতি- ষ্ঠিতঃ। তদেতদন্নমন্নে প্রতিষ্ঠিতম্। স য এতদন্নমন্নে প্রতি- ষ্ঠিতং বেদ প্রতিতিষ্ঠতি। অন্নবানন্নাদো ভবতি। মহান্ ভবতি প্রজয়া পশুভিব্রহ্মবর্চ্চসেন। মহান্ কীর্ত্যা ॥১॥৪৭॥
সরলার্থঃ। যজ্ঞ[অন্নবিজ্ঞানেনৈব ব্রহ্মবিজ্ঞানং সম্পদ্যতে, তস্মাৎ] অন্নৎ ন নিন্দ্যাৎ(অন্ননিন্দাং ন কুৰ্য্যাৎ)। তৎ(অন্নস্য অনিন্দনং) ব্রতম্(অবশ্য- প্রতিপাল্যো নিয়মঃ)।[কিং তৎঅন্নম্?] প্রাণঃ বৈ অন্নং(অন্নময়শরীরান্ত- গতিত্বাৎ);[যৎ যস্যান্তঃ প্রতিষ্ঠিতং, তৎ তস্যারমিহাতিপ্রেতম্)। শরীরম্
অন্নাদম্(অন্নভোক্ত) প্রাণে শরীরং প্রতিষ্ঠিতং(প্রাণাধীনত্বাৎ শরীরস্য), শরীরে চ প্রাণঃ প্রতিষ্ঠিতঃ। তৎ এতৎ(উভয়ং, প্রাণঃ শরীরং চ) অন্নং অন্নে প্রতি- ষ্ঠিতং। স যঃ(কশ্চিৎ) অন্নে প্রতিষ্ঠিতং এতৎ(উভয়ং) অন্নং বেদ(জানাতি), [স:] প্রতিতিষ্ঠতি, অন্নবান্, অন্নাদঃ ভবতি, প্রজয়া, পশুতিঃ, ব্রহ্মবর্চ্চসেন চ মহান্ ভবতি; কীর্ত্যা(যশসা) মহান্(মহত্ববান্) ভবতি।(ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ) ॥১৪৪৭॥
মূলানুবাদ।[উক্ত বিদ্বান্ যেহেতু প্রথমে অন্নবিজ্ঞান দ্বারাই ব্রহ্মতত্ত্ব অবগত হইয়াছেন, সেই হেতু] কখনও অন্নের নিন্দা করিবেন না; ইহাই তাঁহার ব্রত অর্থাৎ অবশ্য পালনীয় নিয়ম। প্রাণ হইতেছে অন্ন; আর শরীর অন্নাদ(অন্নভোক্তা);[কারণ, এই শরীর প্রাণের সাহায্য লইয়াই বাঁচিয়া থাকে; এই জন্য] শরীর প্রাণে অধিষ্ঠিত বা আশ্রিত; আবার প্রাণও শরীরে অধিষ্ঠিত; সুতরাং এই উভয় অন্নই, অন্নে. অবস্থিত। যে কোন লোক অন্নে প্রতিষ্ঠিত এই উভয় অন্নকে জানেন, তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন(জগদ্বিখ্যাত হন), প্রভূত অন্নবান্ ও অন্নভোক্তা হন, এবং সন্তান, পশুসম্পদ্ ও ব্রহ্মবর্চ্চসেন(জ্ঞানজনিত তেজে) মহান্ হন, অধিকন্তু জ্ঞানপ্রচারের ফলে কীর্তিতেও মহত্ত্ব লাভ করেন ॥১॥৪৭॥
শাঙ্করভাষ্যম্—কিঞ্চ, অন্নেন দ্বারভূতেন ব্রহ্ম বিজ্ঞাতং যস্মাৎ, তস্মাদগুরুমিবারং ন নিন্দ্যাৎ; তদস্যৈবং ব্রহ্মবিদো ব্রতমুপদিশ্যতে। ব্রতোপদে- শোহন্নস্ততরে; স্তুতিভাক্তঞ্চ অন্নস্য ব্রহ্মোপলব্ধ্যুপায়ত্বাৎ। প্রাণো বা অন্নম্, ‘শরীরান্তর্ভাবাৎ প্রাণস্য। যদ্যস্যন্তঃ প্রতিষ্ঠিতং ভবতি, তত্তস্যান্নং ভবতীতি। শরীরে চ প্রাণঃ প্রতিষ্ঠিতঃ, তস্মাৎ প্রাণোহন্নং শরীরমন্নাদম্। তথা শরীরমপ্যন্নং প্রাণোহন্নাদঃ। কস্মাৎ প্রাণে শরীরং প্রতিষ্ঠিতম্? তন্নিমিত্তত্বাচ্ছরীরস্থিতেঃ।
তস্মাদেতদুভয়ং শরীরং প্রাণশ্চ অন্নমন্নাদশ। যেনান্যোন্যস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতং, তেনান্নম্। যেনান্যোন্যস্তু প্রতিষ্ঠা, তেনান্নাদঃ। তস্মাৎ প্রাণঃ শরীরঞ্চোভয়- মন্নমন্নাদং চ। স য এতদন্নময়ে প্রতিষ্ঠিতং বেদ, প্রতিতিষ্ঠতি অন্নারাদাত্মনৈব। কিঞ্চ, অন্নবান্ অন্নাদে। ভবতীত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥৪৪৭॥
ভাষ্যানুবাদ। অপিচ, যেহেতু উপায়স্বরূপ অন্নের সাহায্যে ব্রহ্ম পরিজ্ঞাত হইয়াছেন, সেই হেতু অন্নও গুরুস্থানীয়; এই কারণে অন্নের নিন্দা করিবে না। উক্ত প্রকার ব্রহ্মবিদের পক্ষে ইহা ব্রতস্বরূপ উপদিষ্ট হইতেছে। অন্নের স্তুতি বা প্রশংসা বিজ্ঞাপনার্থই এইরূপ ব্রতোপদেশ। ব্রহ্মোপলব্ধির প্রকৃষ্ট উপায় বলিয়াই অন্ন এই প্রকার প্রশংসার যোগ্য। প্রাণই অন্ন; কারণ, উহা শরীরের অভ্যন্তরগত।(এখানে বুঝিতে হইবে,) যে যাহার অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত, তাহাই তাহার অন্ন হইয়া থাকে; প্রাণও শরীরের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত; সেই হেতু প্রাণ হইতেছে অন্ন, আর শরীর হইতেছে অন্নাদ। ভোক্ত। সেইরূপ শরীরও অন্ন, আবার প্রাণও অন্নাদ। ভাল কি নিমিত্ত-শরীর প্রাণে প্রতিষ্ঠিত? যেহেতু প্রাণই শরীর রক্ষার উপায়, সেই হেতু, শরীর ও প্রাণ, এতদুভয় অন্নও বটে, অন্নাদও বটে। যে ‘কারণে পরস্পর পরস্পরে প্রতিষ্ঠিত, সেই কারণেই উহারা অন্ন, আর যে কারণে উহাদের পরস্পরে প্রতিষ্ঠা বা স্থিতি হয়, সেই কারণে উহারা অন্নাদ-পদবাচ্য। সেই হেতু প্রাণ ও শরীর উভয়ে অন্নও বটে, অন্নাদও বটে। যে কোন লোক এইরূপে অন্নে প্রতিষ্ঠিত অন্নকে জানেন, তিনি অন্ন ও অন্নদাদরূপে প্রতিষ্ঠ (স্থিতি) লাভ করেন। আরও, পূর্বের ন্যায় তিনিও অন্নবান ও অন্নাদ হইয় থাকেন ॥ ১॥ ৪৭ ॥
ইতি ভৃগুবল্লীর সপ্তমানুবাকের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৭ ॥
অন্নং ন পরিষ্ক্ষীত। তদ্ব্রতম্। আপো বা অন্নম্। জ্যোতিরন্নাদম্। অপ্সু জ্যোতিঃ প্রতিষ্ঠিতম্। জ্যোতি- স্বাপঃ প্রতিষ্ঠিতাঃ। তদেতদন্নমন্নে প্রতিষ্ঠিতম্। স য এতদন্ন- মন্নে প্রতিষ্ঠিতং বেদ, প্রতিষ্ঠতি। অন্নবানন্নদো ভবতি। মহান্ ভবতি। প্রজয়া পশুভিব্রহ্মবর্চ্চসেন। মহান্ কীর্ত্যা ॥.॥৪৮৷৷ ইতি অষ্টমোহনুবাকঃ ॥৮॥
সরসার্থঃ। অন্নং(অদনীয়ং বস্তু) ন পরিচক্ষীত(ন পরিহরেৎ নোপে- ক্ষেত ইত্যর্থঃ)। তৎ(অন্নপরিহারাকরণং) ব্রতম্(ব্রভবৎ পালনীয়ম্।।[ইদানীম্ অন্নপদার্থো নিৰ্দ্দিশ্যতে-] আপঃ(জলানি) বৈ অন্নং; জ্যোতিঃ(অগ্নি- প্রভৃতি) অন্নাদং(অপ্স্বরূপান্নভোক্ত);[তচ্চ] জ্যোতিঃ অপ্সু প্রতিষ্ঠিতম; আপঃ[অপি] জ্যোতিষি প্রতিষ্ঠিতাঃ। তৎ এতৎ অন্নং অয়ে প্রতিষ্ঠিতং, (জ্যোতিরাপশ্চ এতদ্ উভয়ং অন্যোন্যপ্রতিষ্ঠমিত্যর্থঃ)। সঃ যঃ(যঃ কশ্চন)
এতৎ অন্নং অন্নে প্রতিষ্ঠিতং বেদ(জানাতি),[সঃ] প্রতিতিষ্ঠতি(লোকে প্রতিষ্ঠাং লততে), অন্নবান্(প্রচুরান্নসম্পন্নঃ) অন্নাদঃ(অন্নভোক্তা চ) ভবতি। [ অপি চ] প্রজয়া, পশুভিঃ, ব্রহ্মবর্চ্চসেন মহান্ ভবতি,[ তথা] কীর্ত্যা চ মহান্ ভবতি ॥ ১ ॥ ৪৮ ॥ মূলানুবাদ। অন্নকে উপেক্ষা করিবে না। ইহা একটা ব্রত— অবশ্য পালনীয় কৰ্ম্ম। জলই অন্ন; এবং জ্যোতিঃ অন্নাদ(সেই জলরূপী অন্নের ভোক্তা—শোষক)। জলের মধ্যে জ্যোতি: অবস্থান করে; আবার জ্যোতির মধ্যেও জল অবস্থিতি করে। এই উভয় অন্নই অন্নে প্রতিষ্ঠিত আছে। যে কোন লোক অন্নে প্রতিষ্ঠিত এই অন্নতত্ত্ব জানেন, তিনি সন্তান, পশু, ব্রহ্মবর্চ্চস দ্বারা মহত্ত্ব লাভ করেন, এবং কীর্ত্তি দ্বারাও গৌরবান্বিত হন ॥১॥৪৮৷৷
ইতি অষ্টমানুবাক ব্যাখ্যা ॥৮॥
শাঙ্করভাষ্যম্। অন্নং ন পরিচক্ষীত ন পরিহরেৎ। তৎ ব্রতং পূর্ব্ববৎ স্তুত্যর্থম্। তদেবং শুভাশুভকল্পনয়া অপরিহীয়মাণং স্তুতং মহীকৃতমন্নং স্যাৎ। এবং যতোক্তমুত্তরেঘপি অপো বা অন্নমিত্যাদিষু যোজয়েৎ ॥১॥৪৮৷৷
ইত্যষ্টানুবাক্যভাষ্যম্ ॥ ৮ ॥
ভাষ্যানুবাদ। অন্নকে পরিহার(উপেক্ষা) করিবে না। পূর্ব্বের ন্যায় এখানেও কার্য্যের প্রশংসার্থ ব্রত বলা হইয়াছে। এইরূপ ভালমন্দ বিচার- পূর্ব্বক অন্নকে উপেক্ষা না করিলে বস্তুতঃ অন্নেরই প্রশংসা বা স্তুতি সিদ্ধ হয়। পরবর্তী ‘আপো বৈ অন্নম্’ ইত্যাদি স্থলেও এই রীতির যোজনা করিবে ॥১॥৪৮৷৷
ইতি ভৃগুদেবীর অষ্টমাধ্যায়ের ভাষ্যঅনুবাদ ॥৮॥
অন্নং বহু কুব্বীত। তদ্ব্রতম্। পৃথিবী বা অন্নম্। আকাশোহন্নাদঃ। পৃথিব্যামাকাশঃ প্রতিষ্ঠিতঃ। আকাশে পৃথিবী প্রতিষ্ঠিতা। তদেতদন্নমন্নে প্রতিষ্ঠিতম্। স য এতদন্নমন্নে প্রতি ষ্ঠিতং বেদ, প্রতিতিষ্ঠতি। অন্নবানন্নাদো ভবতি। মহান্ ভবতি। প্রজয়া পশুভিব্রহ্মবর্চ্চসেন। মহান্ কীর্ত্যা ॥১৪৪৯৷৷
ইতি নবমোহনুবাকঃ ॥.৯॥
সরলার্থঃ। অন্নং বহু(প্রভৃতৎ) কুব্বীত। তৎ(অন্নস্য বহুকরণমেব) ব্রতম্।[কিং তদন্নম্? ইত্যাহ-] পৃথিবী বৈ অন্নং; আকাশঃ অন্নাদঃ
(তন্তোক্তা) আকাশঃ পৃথিব্যাং প্রতিষ্ঠিতঃ(সম্বদ্ধঃ), পৃথিবী চ আকাশে প্রতিষ্ঠিতা। তৎ এতৎ অন্নং অন্নে প্রতিষ্ঠিতম্। সঃ যঃ(যঃ কশ্চিৎ) এতদ্ অন্নং অন্নে প্রতিষ্ঠিতং বেদ(জানাতি),[সঃ] প্রতিতিষ্ঠতি।[অপি চ], অন্নবান্ অন্নাদঃ ভবতি; প্রজয়া পশুভিঃ ব্রহ্মবর্চ্চসেন মহান্ ভবতি, তথা কীর্ত্যা মহান্ ভবতি।[ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ] ॥ ১॥ ৪৯ ॥
মূলানুবাদ। অন্ন বহু(বিস্তৃত) করিবে। ইহা একটি দ্রুত। [অন্ন কি?] এই পৃথিবীই অন্ন; আকাশ তাহার ভোক্তা— অন্নাদ। আকাশ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত, পৃথিবীও আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এই উভয় অন্ন অন্নেতেই অবস্থিত। যিনি এই অন্নকে অন্নে প্রতিষ্ঠিত বলিয়া জানেন, তিনি প্রচুর অন্নসম্পন্ন ও অন্নভোক্তা হন, জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন, এবং প্রজা, পশু ও ব্রহ্মবর্চ্চসে গৌরবান্বিত ‘হন, আর কীর্ত্তি দ্বারাও মহত্ত্ব লাভ করেন।। ১।। ৪৯।।
ইতি নবমানুবাক ব্যাখ্যা ॥ ৯॥
শাঙ্করভাষ্যম্—অপ্সু জ্যোতিরিতি অবজ্যোতিষোঽন্নাদগুণত্বে- নোপাসকস্য অন্নস্য বহুকরণং ব্রতম্ ॥ ২৯ ॥
ইতি নবমানুবাকভাষ্যম্ ॥ ৯৫ ॥
ভাষ্যানুবাদ। পূর্বকণিত ‘অপ্সু জ্যোতিঃ’ এই শ্রুতি অনুসারে অপ্ ও জ্যোতিকে অন্ন ও অন্নাদগুণবিশিষ্টরূপে যিনি উপাসনা করেন, অন্নবৃদ্ধি করা তাহার একটা ব্রত-এই কথা এখানে বলা হইল ॥১॥৪৯৷৷
ইতি ভৃগুদেবীর নবমাধ্যায়ের ভাষ্যানুসারে ॥৯॥
ন কঞ্চন বসতো প্রত্যাচক্ষীত। তদ্ব্রতম্। তস্মাদ যয়া কয়া চ বিধয়া বহ্বন্নং প্রাপ্নুয়াৎ। অরাধ্যস্মা অন্নমিত্যাচক্ষতে। এতদ্বৈ মুখতোহন্নঞ্চ রাদ্ধম্। মুখতোহস্মা অন্নঞ্চ রাধ্যতে। এতদ্বৈ মধ্যতোহন্নঞ্চ রাদ্ধম্। মধ্যতোহস্মা অন্নঞ্চ ‘রাধ্যতে। এতদ্বা অন্ততোহন্নং রাদ্ধম্। অন্ততোহস্মা অন্নঞ্চ রাধ্যতে ॥ ৫০ ॥
সরলার্থঃ। বসতৌ(স্বগৃহে)[বাসলাভার্থমাগতং] কঞ্চন(কমপি) ন প্রত্যাচক্ষীত ন(নিবারায়ৎ)। তং(অত্যাগস্থানিবারণং) ব্রতম্।(ধম্মাৎ বলতি-
দানে কৃতে অন্নমপি তস্মৈ দাতব্যমেব], তস্মাৎ যয়া করা চ বিধয়া(যেন কেনচিৎ প্রকারেণ) বহু(প্রচুরং) অন্নং প্রাপ্নুয়াং(প্রভৃতান্নসংগ্রহং কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ)। [অতএব অন্নবন্ত বিশ্বাৎসঃ] অস্মৈ(অন্নার্থিনে অভ্যাগতায়) অন্নৎ অরাধি (সংগৃহীতং ময়া) ইতি আচক্ষতে(কথয়ন্তি)।[অথ দানকালীনবচন-প্রকার উচ্যতে-] এতৎ(দীয়মানম্) অন্নং মুখতঃ(মুখ্যয়া বৃত্ত্যা) রাদ্ধং(সংগৃহীতং ময়া) ইতু,ক্তা প্রযচ্ছন্তীতি ভাবঃ]। তাদৃশ-দানফলমুচ্যতে -] অস্মৈ(অন্ন- দাত্রে) মুখতঃ মুখ্যয়া বৃত্ত্যা এব অন্নং রাধ্যতে(যথাসংগ্রহং যথাদানং চ অন্নম্ উপতিষ্ঠতীতার্থ);। তথা(মধ্যতঃ মধ্যময়া বৃত্ত্যা) বৈ এতৎ অন্নং রাদ্ধম্ [ইত্যুক্তা প্রযচ্ছতি] অস্মৈ(অন্নদাত্রে) মধ্যতঃ(মধ্যময়া বৃত্তা এব) অন্নং রাধাতে(উপনমতে); তথা এতৎ অন্নং অন্ততঃ(জঘন্যয়া বৃত্ত্যা) রাদ্ধম্; অন্ততঃ(জঘন্যয়া এব বৃত্ত্যা) অস্মৈ অন্নং রাধ্যতে,(অন্নসংগ্রহানুসারেণ দাতুঃ পুনরন্নলাভো ভবতীতি ভাবঃ)।[‘মুখতঃ’ প্রভৃতি-পদানি বয়োহবস্থাপরাণ্যপি ব্যাখ্যায়ন্তে ব্যাখ্যাতৃতিঃ] ॥১॥ ৫০ ॥
মূলানুবাদ।[পূর্ব্বোক্ত নিয়মে অন্নসংগ্রাহক উপাসকের পক্ষে আরও বিশেষ বিধি বলিতেছেন-] বাড়ীতে বাসের জন্য আগত কোন ব্যক্তিকেই প্রত্যাখ্যান করিবে না, ইহাই একটি ব্রত।[যেহেতু গৃহাগত অতিথিকে অন্নদান করিতেই হয়,] সেই হেতু, যে কোন প্রকারে অন্নসংগ্রহ করিবে।[এই জন্য পণ্ডিতগণ] বলিয়া থাকেন, ইঁহার উদ্দেশ্যেই অন্ন সংগ্রহ করিয়াছি।[দান কালেও] এই অন্ন আমি মুখ্য বৃত্তি দ্বারা অর্থাৎ ধনোপার্জনের জন্য যাহার পক্ষে যেরূপ বৃত্তি শ্রেষ্ঠ বলিয়া বিহিত, সেইরূপ বৃত্তিদ্বারাই সংগ্রহ করি- য়াছি,[এই বলিয়া অন্ন প্রদান করেন]। তাহার ফলে, সেইরূপ মুখ্য বৃত্তিতেই তাহার ধনাগম হইয়া থাকে। এই অন্ন মধ্যম(যাহা অপকৃষ্ট নহে, এইরূপ] বৃত্তি দ্বারা সংগৃহীত,[এই বলিয়া দান করেন], এবং এই অন্ন অন্তিম বা নিকৃষ্ট বৃত্তি দ্বারা সংগৃহীত হইয়াছে,[এই বলিয়া দান করেন]। তাহার ফলে, মধ্যম ও অপকৃষ্ট বৃত্তিতে তাহার পুনরায় ধনাগম হইয়া থাকে ॥ ১॥ ৫০॥ শাক্ষরভাষ্যম্। তথা পৃথিব্যামকাশোপাসকস্য বসতৌ বসতি- নিমিত্তং কঞ্চন কঞ্চিদপি ন প্রত্যাচক্ষীত বসত্যর্থমাগতং ন নিবারয়েদিত্যর্থঃ।
বাসে চ দত্তে অবশ্যং হ্যশনং দাতব্যম্, তস্মাদয়য়া করা চ বিধয়া—যেন কেন প্রকারেণ বহ্বন্নৎ প্রাপ্নুয়াৎ বহ্বন্নসংগ্রহং কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ। তস্মাদন্নবন্তো বিদ্বাংসঃ অভ্যাগতায়ান্নার্থিনে অরাধি সংসিদ্ধমম্মৈ অন্নমিতাচক্ষতে, ন নাস্তীতি প্রত্যাখ্যানং কুর্ব্বন্তি, তস্মাচ্চ হেতোর্ব্বহ্বন্নং প্রাপ্নুয়াদিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। অপি চ, অন্নদানস্য মাহাত্ম্যমুচ্যতে-যথা যৎকালং প্রযচ্ছত্যন্নম, তথা তৎকালমেব প্রত্যুপনমতে। কথমিতি, তদেতদাহ-এতদ্বৈ অন্নং মুখতঃ মুখ্যে প্রথমে বয়সি, মুখ্যয়া বা বৃত্ত্যা পূজাপুরঃসরমভ্যাগতায়ান্নার্থিনে রাদ্ধং সংসিদ্ধং প্রয়চ্ছতীতি বাক্যশেষঃ। তস্য কিং ফলং স্যাদিতি, উচ্যতে-মুখতঃ পূর্ব্বে বয়সি মুখ্যয়া বা বৃত্ত্যা অস্মৈ অন্নদায় অন্নং রাধ্যতে, যথাদত্তমুপতিষ্ঠত- ইত্যর্থঃ। এবং মধ্যতঃ মধ্যমে বয়সি, মধ্যমেন চোপচারেণ; তথা অন্ততঃ অস্তে বয়সি জঘন্যেন চ উপচারেণ পরিভবেন, তথৈবাস্মৈ রাধ্যতে সংসিধ্যত্যন্নম্ ॥ ১ ॥ ৫০ ॥ ভাষ্যানুবাদ। পূর্ব্বোক্ত প্রকারে পৃথিবী ও আকাশকে যিনি অন্ন ও অন্নাদভাবে উপাসনা করেন, তাহার] আরও একটা ব্রত আছে। তাহা এই-] পৃথিবী ও আকাশোপাসকের নিকট বসতির নিমিত্ত আগত কোন লোককেই তিনি প্রত্যাখ্যান করিবেন না, অর্থাৎ বাসপ্রাপী হইয়া আগত কোন লোককেই বারণ করিবেন না। বাসের নিমিত্ত স্থান দিলে তাহাকে ভোজনার্থ অন্নদান করাও আবশ্যক। সেই কারণে, যে কোন রকমে হউক বহু অন্ন প্রাপ্ত হইবে অর্থাৎ প্রচুর পরিমাণে অন্নসংগ্রহ করিবে। যেহেতু অন্নসম্পন্ন বিদ্বানগণ অন্নার্থে অভ্যাগত ব্যক্তিকে বলিয়া থাকেন যে, ইঁহার উদ্দেশ্যেই এই অন্ন সংগৃহীত হইয়াছে; কখনও ‘অন্ন নাই’ বলিয়া প্রত্যাখ্যান করেন না, সেই হেতু বহু অন্ন সঞ্চয় করিবে।
আরও এক কথা, অন্নদানের মাহাত্ম্য বলা হইতেছে—[উক্ত উপাসক] যে সময় যে ভাবে অন্ন প্রদান করেন, ‘ঠিক সেই সময় সেই ভাবেই তাহার অন্ন উপস্থিত হইয়া থাকে।[দানের অবস্থানুসারেই যে, ফল লাভ হয়, তাহা জ্ঞাপনের নিমিত্ত বলিতেছেন—] এই অন্ন মুখ্য বয়সে অর্থাৎ প্রথম বয়সে কিংবা মুখ্য বৃত্তি দ্বারা(শাস্ত্রোক্ত শ্রদ্ধাদি সহকারে, আদরপূর্ব্বক অভ্যাগত অন্নার্থীকে প্রদত্ত হইতেছে,[এই বলিয়া গৃহস্থ] অন্নদান করেন। তাহার কি ফল হয়, বলা হইতেছে—মুখ্য বয়সে বা উৎকৃষ্ট বৃত্তিতে এই অন্নদাতার নিকট অন্নও সেইভাবেই আসিয়া উপস্থিত হয়। ফল কথা, যে ভাবে দান করা হয়, সেই
২৩
ভাবেই অন্ন প্রাপ্তি হয়। এইরূপ মধ্যম বয়সে বা মধ্যম উপচারে—স কার প্রভৃতি দ্বারা, এবং অন্তিম বয়সে কিংবা পরপরিভবাদি জঘন্য বৃত্তিতে। যদি এই অন্ন প্রদত্ত হইয়া থাকে, তবে; সেই ভাবেই অন্নদাতার নিকট অন্ন উপস্থিত হইয়া থাকে ॥১॥১॥৫০॥
ষ এবং বেদ। ক্ষেম ইতি বাচি। যোগক্ষেম ইতি প্রাণাপানয়োঃ। কর্ম্মেতি হস্তয়োঃ। গতিরিতি পাদয়োঃ। বিমুক্তিরিতি পায়ৌ। ইতি মানুষীঃ সমাজ্ঞাঃ। অথ দৈবীঃ। তৃপ্তিরিতি বৃষ্টো। বলমিতি বিদ্যুতি ॥ ২।৫১ ॥
সরলার্থঃ। যঃ এবং বেদ(অন্নস্য যথোক্তং মাহাত্ম্যৎ, তদ্দানন্ত চ ফলং জানাতি),[তস্য পূর্ব্বশ্রুত্যুক্তং ফলং সম্পদ্যতে ইতি শেষঃ]।[অতঃপরং ব্রহ্মণ উপাসনাপ্রকারঃ কথ্যতে-] বাচি(বাক্যে) ক্ষেম ইতি(প্রাপ্তস্য রক্ষণৎ ক্ষেমঃ, ব্রহ্ম তদ্রূপেণ বাচি প্রতিষ্ঠিতম্ ইত্যুপাস্যম্) প্রাণাপানয়োঃ যোগ- ক্ষেম ইতি,(প্রাণাপানয়োঃ যোগ-ক্ষেমাত্মনা প্রতিষ্ঠিতমিতি ব্রহ্ম উপাসীত)। হস্তয়োঃ কর্মেতি(কর্মাত্মনা), পাদয়োঃ গতিরিতি(গমনাত্মনা), পায়ৌ (মলদ্বারে) বিমুক্তিঃ(মলাদিত্যাগরূপেণ)[প্রতিষ্ঠিতমিতি, ব্রহ্ম উপাসীত ইতি সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে]। ইতি(এতাঃ) মানুষী: মনুষ্যেযু ভবাঃ মানুষ্যাঃ, সমাজ্তাঃ (জ্ঞানানি উপাসনানীত্যর্থঃ)। অথ(অনন্তরং) দৈবীঃ(দৈব্যঃ দেবেষু ভবাঃ) সমাজ্তাঃ(উপাসনানি)[উচ্যন্তে-] বৃষ্টৌ তৃপ্তিঃ(অন্নাদিদ্বারা তৃপ্তিসাধনত্বাৎ তৃপ্তিঃ) ইতি, বিদ্যুতি বলং ইতি -॥২॥৫১৷৷
মূলানুবাদ। যিনি এইরূপে অন্নদান ও অন্ন মাহাত্ম্য জানেন,[তিনি পূর্ব্বোক্ত সমস্ত ফল লাভ করেন। এখন প্রকারান্তরে
(১) তাৎপর্য্য—এইরূপ উপাসকের নিকট কখনও যদি ব্রাহ্মণ হইতে চণ্ডাল পর্যন্ত কোন লোক আসিয়া “আমি তোমার গৃহে বাস করিব” বলিয়া বাসস্থান প্রার্থনা করে, তাহা হইলে তাহাকে উপযুক্ত বাসস্থান দিবে, এবং তাহার ভক্ষণযোগ্য অল্পও দিবে; বাসাখীকে কখনও ফিরাইয়া দিবে না; এবং বাসস্থান দিয়া উপবাসীও রাখিবে না, ইহা গৃহস্থমাত্রেরই অবশ্য পালনীয় ব্রতবিশেষ বলিয়া মনে করিতে হইবে। তাহার পর, অন্নদানের কালে গৃহস্থ সেই অভ্যাগতের প্রতি যেরূপ আদর দেখাইবে, ঠিক সেইরূপ আদরের সহিতই তিনি সকল স্থানে অন্নলাভ করিবেন। অনাদর পূর্ব্বক দান করিলে, তিনিও যখন যেখানে যাহা কিছু অন্ন পাইবেন, অনাদরপূর্ব্বকই পাই- বেন। অতএব অভ্যাগতকে যেমন বাসস্থান দিতে হইবে, তেমনি অন্নও দিতে হইবে, তেমনি আবার আদর পূজাও প্রদর্শন করিতে হইবে। ইহার ফলে ক্রমে তাহার চিত্তশুদ্ধি হয়, এবং ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকার লাভ হয়।
ব্রহ্মোপাসন। বর্ণিত হইতেছে—বাক্যে ক্ষেমরূপে, প্রাণ ও অপান বায়ুতে যোগ ক্ষেমরূপে, হস্তদ্বয়ে কর্ম্মরূপে, পাদদ্বয়ে গতিরূপে এবং মলদ্বারে ত্যাগরূপে অবস্থিত বলিয়া ব্রহ্মের উপাসনা করিবে। এ সমস্ত উপাসনা মনুষ্য সম্পর্কিত, অতঃপর দৈবী উপাসনা[ কথিত হইতেছে—] বৃষ্টিতে তৃপ্তিরূপে, বিদ্যুতে বলরূপে অবস্থিত বলিয়া ব্রহ্মের উপাসনাকরিবে ॥ ২॥ ৫১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। য এবং বেদ—য এবমন্নস্ত যথোক্তং মাহাত্ম্যৎ বেদ, তদ্দানস্য চ ফলং, তস্য যথোক্তং ফলমুপনমতে। ইদানীং ব্রহ্মণ উপাসন প্রকার উচ্যতে।—ক্ষেম ইতি বাচি।১
ক্ষেমো নামোপাত্তপরিরক্ষণং, ব্রহ্ম বাচি ক্ষেমরূপেণ প্রতিষ্ঠিতমিত্যুপাস্যম্। যোগক্ষেম ইতি, যোগোহনুপাত্তস্যোপাদানম্। তৌ হি যোগক্ষেমৌ প্রাণাপান- ‘য়োর্বলবতোঃ সতোর্ভবতো যদ্যপি, তথাপি ন প্রাণাপাননিমিত্তাবেব; কিন্তুহি? ব্রহ্মনিমিত্তৌ। তস্মাদ ব্রহ্ম যোগক্ষেমাত্মনা প্রাণাপানয়োঃ প্রতিষ্ঠিতমিত্যুপাস্যম্। এবমুত্তরেঘন্যেষু তেন তেনাত্মনা ব্রহ্মৈবোপাস্যম্। ২
কর্ম্মণো ব্রহ্মনির্ব্বর্ত্যত্বাদ্ধস্তয়োঃ কর্ম্মাত্মনা ব্রহ্ম প্রতিষ্ঠিতমৃপাস্যম্। গতি- রিতি পাদয়োঃ, বিমুক্তিরিতি পায়ৌ। ইত্যেতা মানুষী মনুষ্যেযু ভবাঃ মানুষ্যাঃ সমাজ্ঞাঃ, আধ্যাত্মিক্য: সমাজ্ঞাঃ জ্ঞানানি বিজ্ঞানানুপাসনানীত্যর্থঃ। অথ অনন্তরং দৈবী দৈব্যো দেবেষু ভবাঃ সমাজ্ঞা উচ্যন্তে। তৃপ্তিরিতি বৃষ্টৌ। বৃষ্টেরন্নাদিদ্বারেণ তৃপ্তিহেতুত্বাদব্রহ্মৈব তৃপ্ত্যাত্মনা বৃষ্টৌ ব্যবস্থিতমিত্যুপাস্যম। তপা অন্যেষু তেন তেনাত্মনা ব্রহ্মৈবোপাস্যম্। তথা বলরূপেণ বিদ্যুতি ॥২॥৫১॥
ভাষ্য’ নুনাদ। ‘য এবং বেদ’ অর্থ যে লোক উক্ত প্রকারে অন্নের মাহাত্ম্য এবং অন্নদানের যথোক্ত ফল জানেন, তাহার উক্ত প্রকার ফল নিষ্পন্ন হইয়া থাকে। অতঃপর ব্রহ্মোপাসনার প্রকারভেদ কথিত হইতেছে,—‘ক্ষেম ইতি বাচি’ ইতি ॥১॥
ক্ষেম অর্থ প্রাপ্ত বস্তুর সংরক্ষণ। ব্রহ্মই বাক্যেতে ক্ষেমরূপে অবস্থিত, এইরূপ তাঁহার উপাসনা করিবে। ‘যোগ ক্ষেম ইতি।’ যোগ অর্থ অপ্রাপ্ত বস্তুর প্রাপ্তি; যদিও বলশালী প্রাণ ও অপান বায়ু বিদ্যমান থাকিলেই উক্ত যোগ-ক্ষেম সম্পাদন সম্ভবপর হয় সত্য, তথাপি[বুঝিতে হইবে যে,! কেবল প্রাণাপানই ঐ উভয়ের স্থিতিকারণ নহে, তবে কি না, ব্রহ্মই উহাদের স্থিতির মুখ্য কারণ। সেই জন্য, ব্রহ্মই যোগ-ক্ষেমরূপে প্রাণ ও অপান বায়ুতে প্রতিষ্ঠিত আছেন, এইরূপে
উপাসনা করিতে হইবে। এইরূপ পরবর্তী স্থান সমূহেও ব্রহ্মকেই তত্তৎরূপে উপাস্য বুঝিতে হইবে। ২ কৰ্ম্মমাত্রই ব্রহ্মদ্বারা সম্পাদিত হয়; এইজন্য, হস্তদ্বয়ে কৰ্ম্মরূপে প্রতিষ্ঠিত বলিয়া ব্রহ্মের উপাসনা করিবে। পাদদ্বয়ে গতিরূপে, এবং পায়ুতে(মলদ্বারে) বিমুক্তিরূপে(মলাদি-ত্যাগরূপে) উপাসনা করিবে। এ সমুদয় হইতেছে মনুষ্য- সম্পর্কিত—মানুষী সমাজ্ঞা—আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্থাৎ উপাসনাত্মক বিজ্ঞান। অতঃ- পর দৈবী সমাজ্ঞা অর্থাৎ দেবতাবিষয়ক উপাসনা-প্রকার কথিত হইতেছে। বৃষ্টিতে তৃপ্তিরূপে অধিষ্ঠিত; কারণ, বৃষ্টি হইতে অন্ন হয়, সেই অন্নদ্বারা লোকের তৃপ্তি হয়, ব্রহ্মই সেই তৃপ্তিরূপে বৃষ্টিতে অবস্থিত আছেন, এইরূপে তাঁহার উপাসনা করিবে। অন্যান্য বিষয়েও তত্তৎরূপে ব্রহ্মই উপাস্য। এইরূপ বিদ্যুতের মধ্যে বলরূপে[অধিষ্ঠিত বলিয়া উপাসনা করিবে।] ॥৪॥৫১৷৷ যশ ইতি পশুষু। জ্যোতিরিতি নক্ষত্রেষু। প্রজাতির- মৃতমানন্দ ইত্যুপস্থে। সর্বমিত্যাকাশে। তৎ প্রতিষ্ঠেত্যু- পাসীত। প্রতিষ্ঠাবান্ ভবতি। তন্মহ ইত্যুপাসাত। মহান্ ভবতি। তন্মন ইত্যুপাসীত। মানবান্ ভবতি ॥ ৩॥৫২৷৷
সরলার্থঃ। পশুষু যশ ইতি, নক্ষত্রেযু জ্যোতিঃ ইতি, উপস্থে (জননেন্দ্রিয়) প্রজাতিঃ(পুত্রাদিজন্ম), অমৃতং(অনাদিজাতা তৃপ্তিঃ), আনন্দঃ(পুত্রজননদ্বারা ঋণশোধনজং সুখম্), ইতি(অনেন প্রকারেণ ব্রহ্ম উপাস্যম্) তথা আকাশে সর্ব্বম্ ইতি(আকাশে, যৎসর্ব্বং প্রতিষ্ঠিতং, তৎসর্ব্বং ব্রহ্মৈব ইত্যনেন প্রকারেণ, তৎ(ব্রহ্ম) প্রতিষ্ঠাৎ(সর্ব্বাধারঃ) ইতি উপাসীত। ‘সর্ব্বত্র উপাস্যং উপাসীত বা ইত্থং ক্রিয়া যোজনীয়া]।[উপাসনায়াঃ ফলমুচ্যতে] [যথোক্তোপাসকঃ। প্রতিষ্ঠাবান্(অন্যেষাৎ আশ্রয়ঃ) ভবতি। তৎ(ব্রহ্ম) মহঃ(চতুর্থী ব্যাহৃতিঃ, জ্যোতিঃ বা) ইতি(অনেন প্রকারেণ) উপাসীত। [ততশ্চ] মহান্(মহত্ত্বগুণবান্, জ্যোতিস্বান্বা) ভবতি। তৎ(ব্রহ্ম) মন ইতি(মননরূপেণ) উপাসীত।[তেন চ উপাসকঃ] মানবান্(মননসমর্থঃ, মাননীয়ঃ বা) ভবতি ॥৩৷৷৫২॥
মূলানুবাদ। পশুগণে যশোরূপে, নক্ষত্রে জ্যোতিস্বরূপে, উপস্থনামক জননেন্দ্রিয় প্রজাতিরূপে(পুত্রাদি উৎপাদনরূপে), অমৃতরূপে:(আলিঙ্গনাদিজনিত তৃপ্তিরূপে), এবং পুত্রোৎপত্তির ফলে ঋণপরিশোধজনিত আনন্দরূপে, আর আকাশে অবস্থিত সর্ব্ব বস্তু-
রূপে, এবং প্রতিষ্ঠা বা সর্ব্বাধার রূপে ব্রহ্মের উপাসনা করিবে। তাহার ফলে উপাসক প্রতিষ্ঠাবান্(সকলের আশ্রয়) হন। পুনশ্চ, সেই ব্রহ্মকে মহরূপে(মহ অর্থ ব্যাহৃতি বা জ্যোতিঃ, তদ্রূপে) উপাসনা করিবে। তাহার ফলে উপাসকও মহত্ত্ব বা তেজস্বিতা লাভ করেন। তাহাকে মনঃ অর্থাৎ চিন্তাবৃত্তিরূপে উপাসনা করিবে। তাহা দ্বারা উপাসক নিজেও মানবান্(চিন্তাশক্তিসম্পন্ন) হইয়া থাকেন ॥৩।৫১॥
শাঙ্করভাষ্যম্। যশোরূপেণ পশুষু। জ্যোতীরূপেণ নক্ষত্রেযু। * জাতিঃ অমৃতমমৃতত্বপ্রাপ্তিঃ, পুত্রেণ ঋণবিমোক্ষদ্বারেণানন্দঃ সুখমিত্যেতৎ সর্ব্বমু- পস্থনিমিত্তং ব্রহ্মৈব, অনেনাত্মনা উপস্থে প্রতিষ্ঠিতমিত্যুপাস্যম্। সর্ব্বং হি আকাশে প্রতিষ্ঠিতম্; অতো যৎ সর্ব্বমাকাশে, তদ্ব্রহ্মৈবেত্যুপাস্যম্। তচ্চাকাশং ব্রহ্মৈব। তস্মাৎ তৎ সর্ব্বস্য প্রতিষ্ঠেত্যুপাসীত। প্রতিষ্ঠা গুণোপাসনাৎ প্রতিষ্ঠাবান্ ভবতি। এবং পূর্ব্বেঘপি। ১।
. যদ্ যত্রাধিগতং ফলং, তত্ত্বহ্মৈব, তদুপাসনাৎ তদ্বান্ ভবতি, ইতি দষ্টব্যম্। শ্রুত্যন্তরাচ্চ “তৎ যথাযথোপাসতে, তদেব ভবতি” ইতি। তন্মহ ইত্যুপাসীত। মহঃ মহত্ত্বগুণবং তদুপাসীত। মহান্ ভবতি। ‘তন্মন ইত্যুপাসীত। মননং মনঃ, মানবান্ ভবতি মননসমর্থো ভবতি ॥ ৩॥ ৫২ ॥
ভাষ্যানুবাদ। পশুগণে যশোরূপে, নক্ষত্রমণ্ডলে জ্যোতিঃস্বরূপে। (ব্রহ্মের উপাসনা করিবে)। প্রজাতি-অমৃত অর্থ—অমৃতত্ব প্রাপ্তি(তৃপ্তিলাভ), আর পুত্রোৎপত্তি দ্বারা পিতৃঋণ পরিশোধ হওয়ায় যে সুখ হয়, তাহাই আনন্দ, উপস্থই(জননেন্দ্রিয়ই) এ সমস্তের নিদান; এ সমস্তই বস্তুতঃ ব্রহ্মস্বরূপ; এইরূপে উপস্থে প্রতিষ্ঠিত বলিয়া ব্রহ্মের উপাসনা করিবে। সমস্ত বস্তুই আকাশে অবস্থিত আছে; অতএব আকাশে যাহা কিছু বর্তমান আছে, সে সমস্ত বস্তুকে ব্রহ্মবুদ্ধিতে উপাসনা করিবে। সেই সর্ব্বাধার আকাশও বন্ধই, তদতিরিক্ত নহে), অতএব আকাশকে ‘সর্ব্বপ্রতিষ্ঠা’ বলিয়া উপাসনা করিবে। অন্য সকল স্থানেও এই প্রকার অর্থই বুঝিতে হইবে।
যেখানে যেরূপ ফল প্রাপ্ত হওয়া যায়, বস্তুতঃ তাহাও ব্রহ্মই, সুতরাং তাদৃশ উপাসনার ফলে উপাসকও তাদৃশ ফলই লাভ করিয়া থাকেন, ইহা বুঝিতে হইবে। যেহেতু অপর শ্রুতি বলিতেছেন—‘তাঁহাকে(ব্রহ্মকে) যেভাবে যে- ভাবে উপাসনা করে, ‘পাসক সেইরূপই হইয়া থাকেন।’ তাঁহাকে ‘মঃ’ এইরূপে উপাসনা করিবে। মহ অর্থ মহত্ত্ব গুণসম্পন্ন, তাহার উপাসনা করিবে। তাহার
ফলে উপাসক মহান্ হন। তাঁহাকে ‘মন’ বলিয়া উপাসনা করিবে। মন অর্থ মনন(চিত্তাবৃত্তি)। মানবান্ হন অর্থ মনন করিতে সমর্থ হন ॥৩৷৫২৷৷
তন্নম ইত্যুপাসীত। নম্যন্তেহস্মৈ কামাঃ। তদ্রব্রহে- ত্যুপাসীত। ব্রহ্মবান্ ভবতি। তদ্ব্রহ্মণঃ পরিমর ইত্যু- পাসীত। পর্য্যেণং ম্রিয়ন্তে দ্বিষন্তঃ সপত্নাঃ। পরি যেহপ্রিয়া ভ্রাতৃব্যাঃ। স যশ্চায়ং পুরুষে। যশ্যাসাবাদিত্যে। স একঃ ॥ ৪।৫৩ ॥
সরলার্থঃ। তৎ(ব্রহ্ম) নম ইতি উপাসীত।[তথোপাসনাৎ] কামাঃ(ভোগ্যা বিষয়াঃ অস্মৈ(উপাসকায়, নম্যন্তে(উপনতা ভবন্তি)। তৎ(ব্রহ্ম) ব্রহ্মেতি(প্রভুশক্তিমৎ ইতি) উপাসীত।[ততশ্চ][উপাসকঃ] ব্রহ্মবান্(প্রভুশক্তিসম্পন্নঃ) ভবতি। তদ্ব্রহ্মণঃ পরিসর ইতি উপাসীত(পরিম্রি- রন্তে বিনশ্যন্তি অশ্বিন্ বিদ্যুৎ বৃষ্টি: চন্দ্রঃ আদিত্যঃ অগ্নিশ্চ-ইতি পরিমরঃ-বায়ুঃ, সচ আকাশেন মিলিত ইতি আকাশ এব ব্রহ্মণঃ পরিমরত্বেনোপাস্ত্যঃ)। এবং (উপাসকং) দ্বিষন্তঃ সপত্নাঃ(শত্রবঃ বাহ্যাঃ আন্তরাঃ বা কামাদয়ঃ। পরিম্রিয়ন্তে বিনশ্যন্তি)। | তথা। যে অস্য(উপাসকঙ্গ) অপ্রিয়াঃ ভ্রাতৃব্যাঃ শত্রবঃ, তে অদ্বিষন্তোহপি ম্রিয়ন্তে ইতি শেষঃ]।[ইদানীমুক্তার্থমুপসংহরতি] যঃ চ অয়ং পুরুষে, যশ্চ অসৌ আদিত্যে প্রতিষ্ঠিততঃ পরমাত্মা], সঃ একঃ(অভিন্নঃ)। ব্যাখ্যাতমন্যৎ ॥৪॥ ৩৷৷
মূলানুবাদ। তাঁহাকে ‘নমঃ’ বলিয়া উপাসনা করিবে; তাহার ফলে সমস্ত কাম্য বিষয় তাহার নিকট উপনত হয়। তাঁহাকে ব্রহ্ম—প্রভুশক্তিবিশিষ্টরূপে উপাসনা করিবে। তাহার ফলে উপাসক ব্রহ্মবান্ হন। তাহাকে ব্রহ্ম-পরিমর আকাশরূপে উপাসনা করিবে; তাহার ফলে উপাসকের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন শত্রুগণ মরিয়া যায় এবং যাহারা বিদ্বেষ না করিয়াও শত্রুদলভুক্ত, ‘তাহারাও বিনষ্ট হয়। পুরুষের মধ্যেও সেই যে পরমাত্মা’, এবং আদিত্যমণ্ডলেও যে পরমাত্মা, এই উভয়ই বস্তুতঃ এক—অভিন্ন॥ ৪।৫৩॥
শাক্ষরভাষ্যম্। তৎ মইত্যুপাসীত। নমনং ননমঃ নমনগুণবৎ তদুপাসীত। নম্যন্তে প্রবীতবন্তি, অস্মৈ উপাসিত্রে কামাঃ-কাম্যন্ত ইতি
ভোগ্যা বিষয়া ইত্যর্থঃ। তদ্ব্রহ্মেত্যুপাসীত। ব্রহ্ম পরিবৃঢ়তমমিত্যুপাসীত। ব্রহ্মান্ তদ্গুণো ভবতি। তদ্ব্রহ্মণঃ পরিমর ইত্যুপাসীত। ব্রহ্মণঃ পরিমরঃ— পরিম্রিয়ন্তেহস্মিন্ পঞ্চ দেবতাঃ বিদ্যুদ্বৃষ্টিশ্চন্দ্রমা আদিত্যোহগ্নিরিত্যেতাঃ। অতো বায়ুঃ পরিমরঃ, শ্রুত্যন্তরপ্রসিদ্ধেঃ। স এবায়ং বায়ুরাকাশেনানন্যঃ, ইত্যাকাশো ব্রহ্মণঃ পরিমরঃ, তমাকাশং বাযাত্মানং ব্রহ্মণঃ পরিমর ইত্যুপাসীত। ১
এনমেবং বিদৎ প্রতিস্পন্ধিনঃ দ্বিষন্তঃ অদ্বিষন্তোহপি সপত্না যতো ভবন্তি, অতো বিশিষ্যন্তে দ্বিষন্ত: সপত্না ইতি। এনং দ্বিবন্তঃ সপত্নাঃ তে পরিম্রিয়ন্তে প্রাণান্ জহতীত্যর্থঃ। কিঞ্চ, যে চাপ্রিয়া অন্য ভ্রাতৃব্যাঃ, অদ্বিষন্তোহপি, তে চ পরিত্রিয়ন্তে। “প্রাণো বা অন্নং শরীরমন্নাদম্” ইত্যায়ভ্য আকাশান্তস্য কার্য্যস্যৈব অন্নান্নাদত্বমুক্তম্। উক্তং নাম-কিং তেন? তেনৈতৎ সিদ্ধং ভবতি - কার্য্যবিষয় এব ভোজ্যভোক্তৃত্বকৃতঃ সংসারঃ, নত্বাত্মনীতি; আত্মনি তু ভ্রান্ত্যোপচর্য্যতে। ননু আত্মাপি পরমাত্মনঃ কার্য্যম্, ততো যুক্তস্তস্য সংসার ইতি। ন; অসংসারিণ এব প্রবেশশ্রুতেঃ। “তৎ সৃষ্ট্বা তদেবানুপ্রাবিশৎ” ইত্যাকাশাদি- কারণস্থ হি অসংসারিণ এব পরমাত্মনঃ কায্যেয়মুপ্রবেশঃ ক্রয়তে। তস্মাৎ কাৰ্য্যানুপ্রবিষ্টো জীব আত্মা পর এবাসংসারী। সৃষ্ট্বা অনুপ্রাবিশদিতি সমান- কর্তৃত্বোপপত্তেশ্চ। সর্গপ্রবেশক্রিয়য়োশ্চৈকশ্চেৎ কর্তা, ততঃ ক্বাপ্রত্যয়ো যুক্তঃ। ৩.
প্রবিষ্টস্য তু ভাবান্তরাপত্তিরিতি চেৎ; ন, প্রবেশস্যানার্থত্বেন প্রত্যাখ্যরতত্ত্বাৎ। “অনেন জীবেন” ইতি বিশেষশ্রুতেঃ। ধর্মান্তরেণানুপ্রবেশ ইতি চেৎ; ন, “তত্ত্ব মসীতি পুনস্তম্ভাবোক্তেঃ। ভাবান্তরাপন্নস্থৈব তদপোহার্থা সম্পদিতি চেৎ; ন, “তৎ সত্যং, স আত্মা, তত্ত্বম্ অসি” ইতি সামানাধিকরণ্যাৎ। দৃষ্টং জীবন্ত সংসারিত্বমিতি চেৎ; ন, উপলব্ধ রনুপলভ্যত্বাৎ। সংসারধর্মবিশিষ্ট আত্মোপলভ্যত- ইতি চেৎ; ন, ধর্ম্মাণাং ধৰ্ম্মিণোহব্যতিরেকাৎ কৰ্ম্মত্বানুপপত্তেঃ। উষ্ণ প্রকা- শয়োদ্দাহ্য-প্রকাশ্যত্বানুপপত্তিবৎ। ৪।
ত্রাসাদিদর্শনাদ্দুঃ খিত্বাদ্যনুমীয়ত ইতি চেৎ; ন, ত্রাসাদেদ্দঃখস্ত চোপলভ্যমান- ত্বান্নোপলব্ধ ধর্ম্মত্বম্। কাপিলকাণাদাদিতর্কশাস্ত্রবিরোধ ইতি চেৎ; ন, তেষাৎ মূলাভাবে বেদবিরোধে চ ভ্রান্তত্বোপপত্তেঃ। শ্রুত্যুপপত্তিভ্যাঞ্চ সিদ্ধমাত্মনো হ- সংসারিত্বম্। একত্বাচ্চ। কথমেকত্বমিতি? উচ্যতে -- স যশ্চায়ং পুরুষে, যশ্চাসা- বাদিত্যে, স এক ইত্যেবমাদি পূর্ব্ববৎ। ৩॥ ৫৩॥
ভ্যাভানুবাদ। তাঁহাকে ‘নম’ বলিয়া উপাসনা করিবে। নম
অর্থ নমন(নত হওয়া)। সেই নমনগুণযুক্ত বলিয়া তাঁহার উপাসনা করিবে। কাম সমূহ অর্থাৎ ভোগ্যরূপে প্রার্থনীয় বিষয় সমূহ-সেই উপাসকের নিকট উপনত হয়, অর্থাৎ বশীভূত থাকে। ‘তদ্ব্রহ্ম ইতি উপাসীত, এ কথার অর্থ—ব্রহ্মকে প্রধান বা প্রভু বলিয়া উপাসনা করিবে। তাহার ফলে উপাসক ব্রহ্মবান্ অর্থাৎ উক্ত ব্রহ্ম- গুণসম্পন্ন হন। বিদ্যুৎ, বৃষ্টি, চন্দ্র, আদিত্য ও অগ্নি, এই পাঁচটী দেবতা যাহার মধ্যে লীন হইয়া থাকে, তাহার নাম ‘পরিমর’। উক্ত পঞ্চ দেবতা বায়ু মধ্যে এই- রূপে থাকেন বলিয়া বায়ুর নাম পরিমর, অন্য শ্রুতিতেও বায়ুর পরিমরত্ব প্রসিদ্ধ আছে। সেই বায়ু আবার আকাশ হইতে অপৃথক্; এইজন্য আকাশ হইতেছে —ব্রহ্মের পরিমর। অতএব বায়ু হইতে অপৃথকৃত আকাশকে ব্রহ্মের পরিমর বলিয়া উপাসনা করিবে। ১
এবং বিধ উত্থাসকের প্রতি স্পর্দ্ধাকারী দ্বেষসম্পন্ন শত্রুগণ প্রাণত্যাগ করে। শত্রুর মধ্যেও দ্বেষবিহীন লোক থাকিতে পারে; এইজন্য শত্রুর ‘দ্বিষন্তঃ’ (দ্বেষকারী) বিশেষণ প্রদত্ত হইয়াছে। আরও; তাহার প্রতি যে সকল শত্রু দ্বেষ করে না, তাহারাও প্রাণত্যাগ করিয়া থাকে।
এ পর্যন্ত ‘প্রাণই অন্ন, শরীর অন্নাদ’ এই হইতে আরম্ভ করিয়া আকাশ পর্যন্ত যত কিছু কার্য্য বা সৃষ্ট বস্তু আছে, সে সমস্ত অন্ন ও ‘অন্নাদ’ বলিয়া উক্ত হইয়াছে। ভাল, উক্তত হইয়াছে, তাহাতে কি হইল? হাঁ, তাহা দ্বারা ইহাই প্রমাণিত হইতেছে যে, এই যে, ভোগ্য-ভোক্তৃভাবঘটিত(একটা ভোগ্য, অপরটা তাহার ভোক্তা, এইরূপ ভাবে কল্পিত) সংসার, তাহা কেবল কার্য্য জগতেই সীমাবদ্ধ; কিন্তু আত্মাতে তাহার কোন সম্বন্ধই নাই; কেবল ভ্রান্তি বশত আত্মাতে সেই ভোগ্য-ভোক্তৃভাবের উপচার বা আরোপ হয় মাত্র। ভাল কথা, আত্মাও ত(জীবও ত) পরমাত্মারই কার্য্য অর্থাৎ, জীবাত্মা ত পরমত্মা হইতেই আসিয়াছে; সুতরাং তাহাকে আকাশাদির ন্যায় পরমাত্মার কার্য্য বলা যাইতে পারে, অতএব তাহার পক্ষে সংসার সম্বন্ধ ত যুক্তিযুক্তই হয়।’ না, তাহা হয় না। কারণ, শ্রুতিতে অসংসারীবই প্রবেশের কথা আছে। ‘তিনি আকাশাদি পদার্থ সৃষ্ট করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন’ ইত্যাদি বাক্যে আকাশাদি কার্য্য-প্রপঞ্চের কারণস্বরূপ অসংসারী(ভোক্তৃভাবরহিত) পরমাত্মারই কার্য্য মধ্যে প্রবেশ এত আছে। অতএব বলিতে হইবে যে, দেহাদি কার্য্যমধ্যে প্রবিষ্ট জীবাত্মা বস্তুতঃ অসংসারী পরমাত্মাই; নচেৎ ‘সৃষ্টি করিয়া অনুপ্রবিষ্ট হইলেন’ এই বাক্যে সমানকর্তৃত্ব অর্থাৎ সৃষ্টি ও প্রবেশের ‘এককর্তৃকত্ব উপপন্ন হইতে পারে না। যিনি সৃষ্টির কর্তা, তিনিই যদি প্রবেশের কর্তা হন, তাহা হইলেই ‘ক্তা’ প্রত্যয়
(সৃষ্টাপদ) হইতে পারে, নচেৎ নহে।[কারণ, এককর্তৃত্ব অর্থেই ‘ক্তা’ প্রত্যয় বিহিত আছে]। ৩.
যদি বল, প্রবেশের পরে, জীবের অবস্থান্তরও ঘটিতে পারে; না, তাহাও বলিতেম্পার না; কারণ, প্রবেশের উদ্দেশ্য অন্যপ্রকার,(ভাবান্তর প্রাপ্তি নহে;) সুতরাং তাহা দ্বারাই এ আপত্তি বা আশঙ্কা খণ্ডিত হইয়া যায়। যদি বল, সৃষ্টি- বাক্যে ‘অনেন জীবেন’ এইরূপ বিশেষ অবস্থার উল্লেখ থাকায় ধর্মান্তর গ্রহণ- পূর্ব্বকই প্রবেশ বুঝা যাইতেছে; না, তাহাও নহে; কেন না,[এই প্রকরণেই] ‘তিনি সত্যস্বরূপ’ ‘তিনিই আত্মা’ এবং ‘তুমি(শ্বেতকেতু) তৎস্বরূপ’ ইত্যাদি বাক্যে জীব ও পরমাত্মার সামানাধিকরণ্য বা অভেদোক্তি রহিয়াছে।[কাজেই প্রবেশের পরেও ধর্মান্তর প্রাপ্তি বলিতে পারা যায় না। যদি বল, জীবের সংসারভাবত প্রত্যক্ষসিদ্ধ); না; সে কথাও সত্য নহে; কারণ, জীব নিজেই যখন উপলব্ধির কর্তা(জ্ঞাতা), তখন সে নিজেই নিজকে উপলব্ধি’ করিতে পারে না। অভিপ্রায় এই যে, জীব উপলব্ধিই করিয়া থাকে, কিন্তু নিজে কখনও উপলভ্য- উপলব্ধের বিষয় হইতে পারে না। ভাল,[জীব স্বরূপতঃ উপলব্ধ্য না হইলেও] সংসারবিশিষ্ট রূপে ত উপলব্ধির বিষয়(উপলভ্য) হইতে পারে? না, তাহাও বলিতে পার না; কারণ, ধর্মমাত্রই ধর্মী হইতে অনতিরিক্ত, অর্থাৎ সংসারিত্বরূপ ধম্মটা জীবকে আশ্রয় করিয়া থাকে; সুতরাং তোমার মতে জীব সংসারধর্মী (সংসারধর্মবিশিষ্ট), কিন্তু ধৰ্ম্মও ধর্মী যখন পৃথক্ পদার্থ নহে, তখন সংসারধর্ম কখনই(জীবের পক্ষে) উপলব্ধির কৰ্ম্ম উপলভ্য হইতে পারে না। উষ্ণ পদার্থ যেমন দাহ্য হয় না, এবং প্রকাশস্বভাব পদার্থও যেমন অপরের প্রফান্ত হয় না, ইহাও তদ্রূপ। ৪
যদি বল, আত্মাতে যখন ত্রাস ও ভয় প্রভৃতির সম্ভাব দেখা যায়, তখন আত্মাতে সংসারধর্ম্মঃখাদি থাকাও অনুমিত হয়;[এবং আত্মাই তাহার উপলব্ধি করিয়া থাকে; সুতরাং আত্মধর্ম্মেরও উপলব্ধ্যত্ব সিদ্ধ হইতেছে।] না, তাহা নহে; কারণ, ত্রাস ভয়াদি ও দুঃখ প্রভৃতির উপলব্ধি হয় বলিয়াই বুঝিতে হইবে যে, উহারা আত্মার ধর্ম্ম নহে(১)।
(১) তাৎপর্য্য—আত্মার উপলব্ধ্য রস গন্ধ প্রভৃতি বিষয়সমূহ যেমন আত্মার ধর্ম্ম নহে—অনাত্মার ধর্ম্ম, তেমনি ত্রাস ও দুঃখ প্রভৃতি বিষয়গুলিও আত্মার উপলব্ধ্য বা অনুভবের বিষয় বলিয়াই বুঝিতে হইবে যে, উহারাও আত্মার ধর্ম্ম নহে, পরন্তু অনাত্মা— বুদ্ধির ধর্ম্ম, কাজেই ইহা দ্বারা পূর্ব্ব কথার বাধা ঘটে না।
২৭
২১০
যদি বল, তথাপি কপিল ও কণাদ প্রভৃতির প্রণীত তর্কশাস্ত্রের সঙ্গে বিরোধ উপস্থিত হয়,[কারণ, তাঁহারা আত্মার সুখ দুঃখাদি ধর্ম্ম স্বীকার করিয়াছেন।। না, তাহাও বলিতে পার না’; কারণ, তাঁহাদের সিদ্ধান্ত যখন ছিন্নমূল বা অমৌলিক, এবং বেদবিরুদ্ধ, তখন তাঁহাদিগকে ভ্রান্ত বলা অসঙ্গত হয় না। আত্মার অসংসারিত্বস্বভাব শ্রুতি ও যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত, এবং একত্ব দ্বারাও সমর্থিত। ভাল, আত্মার একত্বই বা সিদ্ধ হয় কিসে? তদুত্তরে বলিতেছেন—‘স বশ্চায়ং পুরুষে, যশ্চাসৌ আদিত্যে, স একঃ’ এই শ্রুতি দ্বারা এই সকল শ্রুতির ব্যাখ্যা পূর্ব্বেই প্রদর্শিত হইয়াছে ॥ ৪ ॥ ৫৩ ॥
স য এবংবিৎ। অস্মাল্লোকাৎ প্রেত্য। এতমন্নময়- মাত্মানমুপসংক্রম্য। এতং প্রাণময়মাত্মানমুপসংক্রম্য। এতং মনোময়মাত্মানমুপসংক্রম্য। এতং বিজ্ঞানময়মাত্মানমুপ- সংক্রম্য। এতমানন্দময়মাত্মানমুপসংক্রম্য। ইমাল্লোকান্ কামান্নী কামরূপ্যনুসঞ্চরন্। এতৎ সায় গায়ন্নাস্তে। হা ৩ বু, হা ৩ বু, হা ৩ বু ॥ ৫ ॥৫৪ ॥
সরলার্থঃ। সঃ যঃ এবংবিৎ(যথোক্তবিদ্যাং জানাতি),[সঃ] অস্মাৎ লোকাৎ(পৃথিবী-লোকাৎ) প্রেত্য(বিরক্তো) ভূত্বা এবং(অনন্তরোক্তম্) অন্নময়ং আত্মানং(‘আত্মত্বেন কল্পিতং অন্নময়ং দেহং) উপসংক্রম্য(জ্ঞাত্বা),[ততশ্চ] এতৎ প্রাণময়ং আত্মানম্ উপসংক্রস্য, এতৎ মনোময়ম্ আত্মানং উপসংক্রম্য, এতৎ বিজ্ঞানময়ং আত্মানং উপসংক্রম্য, এতৎ আনন্দময়ং আত্মানং উপসংক্রম্য, কামানী
(কামতঃ অন্নং অন্য—কামনানুসারেণান্নবান্), কামরূপী(কামনানুসারেণ রূপানি গৃহ্ণন্) ইমান্(ভূ প্রভৃতীন্) লোকান্ অনুসঞ্চরন্, তথা এতৎ সাম(সর্ব্বতঃ সমৎ ব্রহ্ম) গায়ন্(কীর্ত্তয়ন্) হা ৩ বু, হা ৩ বু, হা ৩ বু,(অহো! অহো! অহো! ইতি পদত্রয়েণ লোকত্রয়ীস্থিতান্ প্রাণিনঃ সম্বোধয়ন্) আস্তে(তিষ্ঠতি)।(বিস্ময়া- ধিক্য জ্ঞাপনার্থং পদত্রয়েহপি প্লুতিঃ বিজ্ঞেয়া) ॥৫৪৫৪॥
মূলানুবাদ।[ এখন পূর্বোক্ত বিষয়ের উপসংহার করা হইতেছে-] সেই যে, এবংবিধ বিদ্যাসম্পন্ন লোক, তিনি ইহলোক হইতে প্রস্থান করিয়া অর্থাৎ দেহাদি সর্ব্ববিষয়ের আসক্তি দূর করিয়া, প্রথমে এই অন্নময় আত্মাতে উপগত হন; পরে এই প্রাণময় আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া ক্রমে এই মনোময় আত্মাকে প্রাপ্ত হন, শেষে
বিজ্ঞানময় আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া এই আনন্দময় আত্মাতে উপ- সংক্রান্ত হন, তাহার পর যথেচ্ছ অন্নসম্পত্তি ও যথেচ্ছ রূপ-সম্পত্তি প্রাপ্ত হইয়া এই পৃথিবী প্রভৃতি লোকে বিচরণ করেন এবং ব্রহ্মসাম্য কীর্ত্তন করত—হা-বু, হা-বু, হা-বু, এইশব্দ উচ্চারণ দ্বারা বিস্ময় প্রকাশপূর্ব্বক অবস্থান করেন ॥ ৫॥৫৪॥ শাস্ত্রমতান্তরে। শাঙ্করভাষ্যম্। সর্ব্বং অন্নময়াদিক্রমেণানন্দময়মাত্মানমুপসংক্রম্যৈ- তৎ সাম গায়ন্নাস্তে। “সত্যং জ্ঞানম্” ইত্যস্যা ঋচোহথো ব্যাখাতো বিস্তরেণ” তদ্বিবরণভূতয়া আনন্দবল্ল্যা। “সোহশ্নুতে সর্ব্বান্ কামান্ সহ ব্রহ্মণা বিপশ্চিতা” ইতি তস্য ফলবচনস্য অর্থবিস্তারো নোক্তঃ—কে তে, কিংবিষয়া বা সর্ব্বে কামাঃ? কথং বা ব্রহ্মণা সহ সমশ্নুতে? ইত্যেতদ্বক্তব্যমিতীদমিদানীমারভ্যতে। ১. তত্র পিতাপুত্রাখ্যায়িকায়াং পূর্ব্ববিদ্যাশেষভূতায়াং তপো ব্রহ্মবিদ্যাসাধনমুক্তম্; প্রাণাদেরাকাশান্তস্য চ কার্য্যস্যান্নান্নাদত্বেন বিনিয়োগশ্চোক্তঃ; ব্রহ্মবিষয়োপাস- নানি চ। যে চ সর্ব্বে কামাঃ প্রতিনিয়তানেকসাধনসাধ্যা আকাশাদিকার্য্যভেদ- বিষয়াঃ, এতে দর্শিতাঃ। একত্বে পুনঃ কাম-কামিত্বানুপপত্তিঃ, ভেদজাতস্য সর্ব্বস্যাত্মভূতত্ত্বাৎ। তত্র কথং যুগপদ্ব্রহ্মস্বরূপেণ সর্ব্বান্ কামান্ এবংবিৎ সমশ্নুতে ইতি? উচ্যতে—সর্ব্বাত্মত্বোপপত্তেঃ। ২ কথং সর্ব্বাত্মতোপপত্তিঃ? ইত্যাহ-পুরুষাদিত্যস্থা দ্বৈকত্ববিজ্ঞানেনঅপোহোৎ- কর্ষাপকর্ষৌ অবন্নময়াদীন আত্মনোহবিদ্যাকল্পিতান্ ক্রমেণ সংক্রম্য আনন্দময়ান্তান, সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম অদৃষ্ট্যাদিধৰ্ম্মকং স্বাভাবিকমানন্দমজমমৃতমভরমদ্বৈতৎ ফলভূতমাপন্ন ইমাল্লোকান্ ভূরাদীননুসঞ্চরন্নিতি ব্যবহিতেন সম্বন্ধঃ। ৩। কথমনুসঞ্চরন্? কামান্নী কামতোহন্নমন্যেতি কামান্নী; তথা কামতো রূপাণ্যস্যেতি কামরূপী; অনুসঞ্চরন্-সর্ব্বাত্মনা ইমাঙ্কোকানাত্মত্বেনানুভবন্, কিম্? এতৎ সাম গায়ন্নাস্তে। সমত্বাদ ব্রহ্মৈব সাম সর্ব্বানন্যরূপং গায়ন্ শব্দয়ন্ আত্মৈকত্বং প্রখ্যাপয়ন্ লোকানুগ্রহার্থং তদ্বিজ্ঞানফলং চ অতীব কৃতার্থত্বং গায়ন্নাস্তে তিষ্ঠতি। কথম্? হা ৩ বু, হা ৩ বু, হা ৩ বু। অহো ইত্যেতস্মিন্নর্থেই- ত্যন্ত বিস্ময়খ্যাপত্যন্ত নার্থম্ ॥ ৫ ॥ ৫৪ ॥ ভাষ্যানুবাদ।[এবংবিধ বিদ্বান্ পুরুষ] অন্নময়াদি পরম্পয়াক্রমে ব্রহ্মানন্দময় আত্মাকে লাভ করিয়া এই সাম। সমতাব্যঞ্জক শব্দ, গান করত অবস্থান করেন, এইরূপ বাক্য যোজনা করিতে হইবে। প্রথমতঃ ‘সত্যং জ্ঞানম্’ ইত্যাদি মন্ত্রের বিবরণ বা ব্যাখ্যাস্বরূপ এই
আনন্দবল্লীই এই মন্ত্রের অর্থ বিস্তৃত ভাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। কিন্তু সেই মন্ত্রেরই ফলপ্রকাশক “সঃ অশ্বতে সর্ব্বান্ কামান্ সহ ব্রহ্মণা বিপশ্চিতা” এই বাক্যের অর্থ বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয় নাই যে, তাঁহারা কে? সমস্ত কাম ও কামের বিষয়ীভূত বিষয়সমূহ কি কি? এবং কিপ্রকারেই বা ব্রহ্মের সহিত ভোগ করেন? সে সমুদয় কথাও বলা আবশ্যক; এইজন্য, এখন এই বাক্য আরব্ধ হইতেছে। ১ প্রথমতঃ পূর্ব্বোক্ত বিদ্যারই শেষ বা অংশরূপে কল্পিত পিতা-পুত্রঘটিত উপাখ্যানে তপস্যাকে ব্রহ্মবিদ্যার সাধন বলা হইয়াছে; এবং প্রাণ হইতে আকাশ পর্যন্ত সমস্ত উৎপন্ন পদার্থকেই অন্ন ও অন্নাদরূপে চিন্তা করিবার উপদেশ উক্ত হইয়াছে, তাহার পর ব্রহ্মবিষয়ক বিবিধ উপাসনাও কথিত হইয়াছে আর আকা- শাদি বিভিন্ন জন্য বস্তুবিষয়ে যে সমস্ত কামনা নিয়মিতভাবে অনেক প্রকার সাধন- সাপেক্ষরূপে নির্দিষ্ট আছে, সে সমুদয়ও প্রদর্শিত হইয়াছে। কিন্তু একত্ব পক্ষে উক্ত কাম-কামি-ভাব অর্থাৎ একজন কাময়িতা, তদ্ভিন্ন অপ্ররে তাহার কাম্য, এইরূপ পার্থক্য ব্যবহার সঙ্গত হয় না; যেহেতু ভেদ-প্রপঞ্চ সমস্তই তাহার আত্মভূত বা কাময়িতারই স্বরূপভূত। তাহা যদি হয়, তবে উক্ত প্রকার বিদ্বান্ পুরুষ একই সময়ে ব্রহ্মস্বরূপ সমস্ত কাম্য বিষয় কিরূপে ভোগ করিতে পারেন? অভি- প্রায় এই যে, যে সময়ে একাত্মবোধ থাকে, ঠিক সেই সময়েই কি করিয়া তাঁহার ভেদবুদ্ধি-সাপেক্ষ সর্ব্ব-কামভোক্তৃত্ব সম্ভবপর হয়? তদুত্তরে বলিতেছেন— সর্ব্বাত্মভাব সম্ভবপর হয় বলিয়াই[তাহার ভোক্তাত্বও সম্ভবপর হয়।] ২
ভাল, তাঁহার সর্ব্বাত্মভাবই বা সম্ভবপর হয় কিপ্রকারে? তদুত্তরে বলা হইতেছে—সেই বিদ্বান্ পুরুষ প্রথমে পুরুষ(জীবদেহ) ও আদিত্যমণ্ডলে আত্মার একত্ব অবগত হন; সেই ‘একত্ব বিজ্ঞানের ফলে তদুভয়গত উৎকর্ষা- -পকর্ষবুদ্ধ পরিত্যাগ করেন, এবং ক্রমে ক্রমে স্বীয় অজ্ঞানবশে পরিকল্পিত অন্নময় হইতে আরম্ভ করিয়া আনন্দময় পর্যন্ত পঞ্চ কোষে পর পর আত্মত্ব স্থাপনপূর্ব্বক অবশেষে সর্ব্ববিজ্ঞানের ফলস্বরূপ এবং স্বাভাবিক(অকৃত্রিম) আনন্দস্বরূপ এবং জন্মজরামরণভয়রহিত ও সর্ব্ববিধ ভয়ের অবসানভূমি সত্য জ্ঞান ও আনন্দ স্বরূপ ব্রহ্মকে লাভ করত এই ভূঃপ্রভৃতি লোকে(ত্রিলোকে) বিচরণ করত—। ‘বিচরণ’ শব্দটা ব্যবধানে থাকিলেও এখানে তাহার সহিত অন্বয় করিতে হইবে। ৩
তিনি কি ভাবে সঞ্চরণ করেন? কামান্নী ইচ্ছানুসারে অন্ন লাভ করিয়া এবং কামরূপী ইচ্ছামত নানাবিধ রূপ পরিগ্রহ করিয়া অনুসঞ্চরণ করত
অর্থাৎ আত্মস্বরূপে, সমস্ত জগৎ অবলোকন করত-কি[করেন]? এই সামগান পূর্ব্বক অবস্থান করেন। সাম, অর্থ ব্রহ্ম; কেন না, তিনিই সর্ব্বত্র সম(সমান)। লোকানুগ্রহার্থ সেই সর্ব্বসম আত্মৈকত্ব প্রচার করিয়া, এবং আত্মৈকত্ব বিজ্ঞানের ফলস্বরূপ আপনার নিরতিশয় কৃতার্থতা উচ্চৈঃস্বরে কীর্তন করিয়া অবস্থান করেন। তাঁহার অবস্থানের প্রকার কিরূপ, তাহা বলা যাইতেছে—হা ৩ বু, হা ৩ বু, হা ৩ বু—এই প্রকারে(কীর্তন করত অবস্থান করেন)। ‘হা বু,’ শব্দটা বিস্ময়প্রকাশক ‘অহো’ অর্থে প্রযুক্ত হইয়াছে। বিস্ময়ের আধিক্য সূচনার নিমিত্ত প্লুত বা দীর্ঘ স্বর ব্যবহৃত—‘হা ৩ বু’ হইয়াছে ॥৫॥ ১॥ অহমন্নমহমন্নগহমন্নম্। অহমন্নাদে। ৩ হহমন্নাদো ৩ ইহ- মন্নাদঃ। অহ ঁ শ্লোককৃদহণ্ শ্লোকরুদহটশ্লোককৃৎ। অহমস্মি . প্রথমজা ঋতা ৩ স্যু। পূর্ব্বং দেবেভ্যোহমৃতস্য না ৩ ভায়ি। যো মা দদাতি, স ইদেবমা ৩ বাঃ। অহমন্নমন্নমদন্তমা ৩ স্মি। অহং বিশ্বং ভুবনমভ্যভবা ৩ ম্। সুবর্ন জ্যোতীঃ। য এবং বেদ। ইত্যুপনিষৎ ॥৬॥৫৫৷৷
ইতি ভৃগুবল্ল্যাং দশমোহনুবাকঃ ॥ ১০ ॥[ভৃগুস্তস্মৈ যতো বিশন্তি তদ্বিজিজ্ঞাসম্ব ত্রয়োদশান্নং প্রাণে মনো বিজ্ঞানং দ্বাদশ দ্বাদশানন্দো দশান্ন ন নিন্দ্যাদ ন পরি- চক্ষীতান্নং বহু কুব্বীতৈকাদশৈকাদশ। ন কঞ্চনৈকষষ্টি- দশ ॥০॥(অয়মংশঃ কচিদধিকঃ পঠিতঃ।) সরলার্থঃ।[অথ তস্য বিস্ময়প্রকার প্রদর্শ্যতে-অহমিত্যা- দিভিঃ]। অহং(তাদৃশবিদ্বান) অন্নম্ অহমন্নম্ অহম্-অন্নম্। বিস্ময়াধিক্য প্রদর্শনায় ত্রিরুক্তিঃ, এবমন্যত্রাপি]। অহম্ অন্নাদঃ ৩-অহম্ অন্নাদঃ ৩, অহম্ অন্নাদঃ ৩। তথা, অহং শ্লোককৃৎ। অহং শ্লোকরুৎ, অহং শ্লোককৃৎ;(শ্লোকঃ অন্নান্নাদয়োঃ সংঘাতঃ চেতনাবান্ জীবদেহঃ, তস্য কর্তা)। অহং প্রথমজা (প্রথমজঃ-সর্ব্বেভ্যঃ পূর্ব্বমুৎপন্নঃ), ঋ 1 ত স্যু(ঋতস্য প্লুতত্বাৎ দীর্ঘঃ, ঋতস্ত সত্যস্যেত্যর্থ:,[মূর্তামূর্তরূপস্য জগতঃ] দেবেভ্যঃ[চ; পূর্ব্বং(পূর্ববর্তী), অমৃতস্য(অমৃতত্বস্য মোক্ষস্য) নাভিঃ(মধ্যং মুক্ত্যধিষ্ঠানম্) অগ্নি (ভবামি)।[ইদানীং দানফলমুচ্যতে-] যঃ(জনঃ) মাং(অন্ন-
রূপিণং) দদাতি(অন্নার্থিভ্যঃ প্রযচ্ছতি), সঃ[দাতা] ইৎ(ইখং) এব (নিশ্চয়ে) মা?(মাং) অবাঃ(অবতি যথাভূতং রক্ষতীত্যর্থঃ)। যঃ[পুনঃ] অন্নং মাং অদত্বা অত্তি(ভক্ষয়তি), অন্নম্ অদন্তং; তক্ষয়ন্তং) তৎ(জনং) অহং অস্মি(ভক্ষয়ামি)। তথা সুবঃ(আদিত্যঃ) ‘ন’(ইব) জ্যোতীঃ(জ্যোতিঃ- স্বরূপঃ) অহং বিশ্বং(সমস্তং) ভুবনং(জগৎ—জগদাত্মনা, অভ্যভবাম্(অতি - সম্যক্, ভবামি)। ইতি(ইখং বল্লীদ্বয়বিহিতা) উপনিষদ্(ব্রহ্মবিদ্যা উক্তা); যঃ এবং(যথোক্তরূপাম্ উপনিষদং) বেদ(সম্যক্ জানাতি),(তস্য মোক্ষঃ ফলং সিধ্যতীতিশেষঃ) ॥৬৷৫॥
শ্রীদুর্গাচরণোদীর্ণা সরলা স্যাৎ সতাং মুদে ॥ ॥
মূলানুবাদ -[অতঃপর সেই বিদ্বানের বিস্ময়প্রকার প্রদর্শিত হইতেছে-[তিনি অনুভব করেন যে,] আমিই পূর্ব্বকথিত অন্ন, (বিস্ময়সূচনার্থ তিনবার উক্তি), আমিই পূর্ব্বোক্ত অন্নাদ; আমিই শ্লোককৃৎ অর্থাৎ অন্ন ও অন্নাদের সমবায়ে যে, চেতন দেহসংঘাত রচিত হইয়াছে, আমিই তাহার কর্তা এবং আমিই প্রথমোৎপন্ন স্কুল সুক্ষ্ম জগতের এবং দেবগণেরও পূর্ববর্তী, এবং আমিই অমৃতত্বের নাভিস্বরূপ অর্থাৎ অমৃতত্বনামক মোক্ষ আমাতেই প্রতিষ্ঠিত।
যে লোক অন্নরূপী আমাকে অন্নাথীগণের উদ্দেশ্যে দান করেন, তিনি এই ভাবেই—অন্নার্থীতে আমার সম্প্রদান দ্বারাই আমাকে রক্ষা করেন, অর্থাৎ আত্মার সর্বাত্মভাব পোষণ করেন, আর যিনি অন্নরূপী আমাকে দান না করিয়া অন্ন ভক্ষণ করেন, আমি তাহাকে ভক্ষণ করি। আদিত্যের ন্যায় জ্যোতিঃস্বরূপ আমিই সমস্ত জগদাকারে অভিব্যক্ত আছি। ইহাই উপনিষৎ, অর্থাৎ অতীত দুইটা বল্লীর সারভূত ব্রহ্মবিদ্যা। যিনি এই উপনিষদ জানেন, তাহার মুক্তিফল লাভ হয়। ৬।৫৫॥
ইতি তৈত্তিরিয়োপনিষদ্ ভৃগুবল্ল্যাং দশমানুবাকব্যাখ্যা ॥১০॥ তৈত্তিরীয়োপনিষদ্-ব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কঃ পুনরসৌ বিস্ময় ইতি, উচ্যতে-অদ্বৈত আত্মা নিয়ঞ্জনোঽপি সন্ অহমেবান্নমন্নাদশ্চ। কিঞ্চ, অহমেব শ্লোককৃৎ। শ্লোকো
নাম আন্নান্নদয়োঃ সঙ্ঘাতঃ, তস্য কর্তা চেতনাবান্। অন্নস্যৈব বা পরার্থস্যান্নাদার্থস্য সতোহ নেকাত্মকস্য পারার্থ্যেন: হতুনা সঙ্ঘাতকৃৎ। ত্রিরুক্তির্ব্বিস্মত্বখ্যাপনাথা।। অহমস্মি ভবামি। প্রথমজাঃ প্রথমজঃ প্রথমোৎপন্নঃ। ঋতস্য সত্যস্য মূর্তা- মূর্ত্তস্যাস্তু জগতঃ দেবেভ্যশ্চ পূর্ব্বম্, অমৃতত্বস্য নাভিঃ অমৃতস্য নাভিঃ মধ্যং মৎসংস্থমমৃতত্বং প্রাণিনামিত্যর্থঃ। যঃ কশ্চিৎ মা মাম্ অন্নমন্নাথিভ্যো দদাতি- প্রবচ্ছতি—অম্লাত্মনা ব্রবীতি, স ইৎ ইথমেব ইত্যর্থঃ, এবমবিনষ্টং যথাভূতং মাং আবাঃ অবতীত্যর্থঃ। যঃ পুনরন্যো মামদত্বা আর্থিভ্যঃ কালে প্রাপ্তেঽয়মত্তি, তমন্নমদন্তম্ ভক্ষয়ন্তং পুরুষং অহমন্নমের সংপ্রত্যস্মি ভক্ষয়ামি। ২ অত্রাহ --এবং তরি বিভেমি সর্ব্বাত্মপ্রাপ্তেম্মোক্ষাৎ; অস্ত সংসার এব, যতো মুক্তোহপ্যস্থমন্নভূতঃ অদ্যঃ স্যামন্যস্যৈব। এবং মা ভৈষীঃ, সংব্যবহারবিষয়দ্বাৎ সর্ব্বকামাশনস্য। অতীত্যায়ং সংব্যবহারবিষয়মন্নান্নাদাদিলক্ষণম্ বিদ্যাকৃতং বিদ্যা ব্রহ্মত্বমাপন্নো বিদ্বান্; তস্য নৈব দ্বিতীয়ং বস্তুন্তরমস্তি, যতো’ বিভেতি; অতো ন ভেতব্যৎ মোক্ষাৎ। এবং তহি কিমিদমাহ- অহমন্নমহমন্নাদ ইতি? উচ্যতে- যোহহমন্নান্নাদাদিলক্ষণঃ সংব্যবহার: কার্য্যভূতঃ স সংব্যবহারমাত্রমেব, ন পরমার্থবস্তু। স এবস্তুতোহপি ব্রহ্মনিমিত্তো ব্রহ্মব্যতিরেকেণাসন্নিতি কৃত্বা ব্রহ্মবিদ্যাকার্য্যস্য সর্ব্বভাবস্য স্বত্যর্থমুচ্যতে অহমন্নমঃমন্নমহমন্নম্। অহমন্নাদোহহ- মন্নাদোহহমন্নাদঃ’ ইত্যাদি এতে ভয়াদিদোষগন্ধোহপ্যবিদ্যানিমিত্তেঃ, অবিদ্যোচ্ছেদাৎ ব্রহ্মভূতস্য নাস্তীতি। ৩ অহং বিশ্বং সমস্তৎ ভূবনং ভূতৈঃ সম্ভজনীয়ং ব্রহ্মাদিভিঃ, ভবস্থীতি বা অস্মিন্ ভূতানীতি ভুবনম্ অভ্যভবাম্ অভিভবামি পরেণেশ্বরেণ স্বরূপেণ! সুবর্ণ জ্যোতিঃ, সুবঃ আদিত্যঃ, নকার উপমার্থে, আদিত্য ইব সরুদ্বিতাত- মম্মদীয়ং জ্যোতীঃ জ্যোতিঃ প্রকাশ ইত্যর্থঃ। ইতি বঙ্গীদ্বয়বিহিতোপনিষৎ পরমাত্মজ্ঞানম্। তামেতাৎ যথোক্তামুপনিষদং শান্তো দান্ত উপরতস্তিতিক্ষুঃ সমাহিতো ভূত্বা ভৃগুবৎ তপে। মহদাস্থায় য এবং বেদ তস্যেদং ফলং যথোক্তমোক্ষ ইতি ॥ ৬॥ ৫৫ ॥
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ তৈত্তিরীয়োপনিষদ্ভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥ ভাষ্যানুবাদ। এই বিষয় আবার কি প্রকার, তাণ বলিতেছেন—
অদ্বৈত আত্মা স্বরূপতঃ নিরঞ্জন বা নির্লেপ হইলেও এবং আমি তৎস্বরূপ হইলেও, আমিই ‘অন্ন ও অন্নাদ। অধিকন্তু আমিই শ্লোককৃৎ। শ্লোক’অর্থ-অন্ন ও অন্নাদের সংঘাত বা সম্মিলিতাবস্থা, তাহার কর্তা-চেতনাসম্পন্ন। অথবা, অন্ন স্বভাবতই পরার্থ --অন্নভক্ষকের জন্য সৃষ্ট বলিয়াই অনেকাত্মক-অনেক অংশ- যুক্ত; এইজন্যই পরার্থ; পরার্থত্ব নিবন্ধনই দেহসংঘাতের রয়িতা। মূল শ্রুতিতে যে, এই কথার তিনবার উক্তি, তাহার উদ্দেশ্য বিস্ময়াধিক্য প্রকাশন। ১
‘অহম্ অস্মি’ ‘অহং’ অর্থ—আমি, ‘অস্মি’ অর্থ হই।—প্রথমজা( প্রথমজ) প্রথমোৎপন্ন, ও ‘ঋত’ শব্দবাচ্য মূর্তামূর্ত্ত( স্থূলসূক্ষ্ম) জগতের এবং দেবগণেরও পূর্ব্ববর্তী, আর অমৃতত্বের বা মোক্ষের নাভি—মধ্যস্থল অর্থাৎ প্রাণিগণের যে, অমৃ- তত্ব, তাহা আমাতেই প্রতিষ্ঠিত আছে। যে কোন লোক অন্নরূপী আমাকে অম্ল- প্রার্থী লোকের উদ্দেশ্যে প্রদান করে, অর্থাৎ আপনার অন্নাত্মভাব প্রকাশ করে, সেই দাতা এই ভাবেই অম্লকে অবিনষ্ট ও যথাযথরূপে রক্ষা করিয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, অন্নের জন্য প্রার্থী লোককে অন্নদান করিলেই বস্তুতঃ অম্লরূপী আমাকে রক্ষা করা হয়। পক্ষান্তরে, অন্য যে লোক অর্থীগণের উদ্দেশ্যে অম্লরূপী আমাকে দান না করিয়া উপযুক্ত সময়ে অম্লভক্ষণ করে, সেই অম্লভক্ষককে অম্লরূপী সেই আমিই এখানে ভক্ষণ করিয়া থাকি। ২
মুমুক্ষু পুরুষ এখানে জিজ্ঞাসা করিতেছেন যে,-ভাল, এইরূপই যদি হয়, তবে সর্ব্বাত্মভাব প্রাপ্তিরূপ মোক্ষ হইতে আমি ভয় পাইতেছি; মোক্ষের প্রয়োজন নাই, সংসারই আমার থাকুক, যেহেতু মুক্ত হইয়াও আমি অন্নরূপে অন্যের ভক্ষণীয় হইব! না, এরূপে ভয় পাইও না; কারণ, ভোগমাত্রই সাংব্যবহারিক অজ্ঞানমূলক ব্যবহার-কল্পিত, উহা পারমার্থিক নহে। উক্ত বিদ্বান্ পুরুষ ব্রহ্মবিদ্যা প্রভাবে অবিদ্যাকৃত অন্ন ও অন্নভক্ষক ইত্যাদি ব্যবহারা- ধিকার অতিক্রম করিয়া ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহার আর দ্বিতীয় কোন ‘বস্তুই নাই, যাহা হইতে ভয় হইবে; অতএব মোক্ষ হইতে ভয় করিতে নাই। ভাল, এইরূপ অভিপ্রায় হইলে ‘আমি অন্ন, আমি অন্নাদ’ ইত্যাদি বলা হয় কেন? ইহার উত্তর বলা হইতেছে-এই যে, অন্ন ও অন্নাদ প্রভৃতিরূপ অর্থাৎ এই যে, ভক্ষ্য ভক্ষকাদি কাৰ্য্য ব্যবহার, ইহা কেবল ব্যবহারই মাত্র, বস্তুতঃ ইহা পরমার্থ বা প্রকৃত সত্য বস্তু নহে। সেই ব্যবহার অপারামার্থিক হইলেও ব্রহ্মনিমিত্ত অর্থাৎ মূলতঃ ব্রহ্মই এইরূপ ব্যবহারের প্রবর্তক; ব্রহ্মব্যতিরেকে এই ব্যবহারের অস্তিত্বই নাই, এইরূপ মনে করিয়া ব্রহ্মভাব বা ব্রহ্মত্ব প্রাপ্তির মহিমা কীর্তনের জন্য বলা হইতেছে-‘অহমন্নমহমন্নমহমন্নম্’ এবং ‘অহমন্নাদঃ, অহমন্নাদ:,
অহমন্নাদঃ’, ইত্যাদি। অতএব ব্রহ্মভাবাপন্ন পুরুষের অবিদ্যা-সমুচ্ছেদ হওয়ায় অবিদ্যামুলক ভয়াদি দোষের গন্ধমাত্রও থাকে না। ৩
আমিই পরমেশ্বররূপে সমস্ত ভুবন—ব্রহ্মাদি, প্রাণিগণের ভজনীয় (আরাধ্য), অথবা ভূতগণ যেখানে প্রাদুর্ভূত হয়, সেই জগদাকারে অভিব্যক্ত আছি। আদিত্যের ন্যায় আমাদের জ্যোতিঃপ্রকাশও সকৃদ্বিতাত অর্থাৎ নিত্য প্রকাশমান। ‘সুবঃ ন’(সুবর্ন) এই ‘ন’ অক্ষরটা উপমার্থে প্রযুক্ত হইয়াছে। ইহাই অতীত দুইটী বল্লীর সারভূত উপনিষৎ—পরমাত্ম-জ্ঞান। যিনি শান্ত, দান্ত, উপরত, তিতিক্ষু ও দ্বন্দ্বসহিষ্ণু হইয়া(১) এবং ভৃগুমুনির ন্যায় পরম তপস্যা অবলম্বন করিয়া এই উপনিসিদ্ধ অবগত হন, তাঁহার ফল হয়—যপোক্তপ্রকার মোক্ষ-লাভ ইতি ॥৬৷৷৫৫॥
ইতি কৃষ্ণবর্দ্ধন দশমানুবাক্যের ভাষ্যভাষ্য ॥১০॥ ইতি তৈত্তিরীয়োপনিষদের শাঙ্করভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥ ইতি কৃষ্ণযজুর্ব্বেদীয়-তৈত্তিরীয়োপনিষৎ সমাপ্তা ॥০॥ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য্যং করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্তু। মা বিদ্বিষাবহৈ ॥ *
শং নো মিত্রঃ শং বরুণঃ শং নো ভবষ্টর্য্যামা। শং ন ইন্দ্রো বৃহস্পতিঃ। শং নো বিষ্ণুরুরুক্রমঃ ॥ নমো ব্রহ্মণে। নমস্তে বায়ো। হমের প্রত্যক্ষং ব্রহ্মাসি ॥ হামের প্রত্যক্ষাং ব্রহ্মাবাদিষম্। ঋতমবাদিষম্। সত্যমবাদিষম্। তন্মামাবীৎ। তদ্বক্তারামাবীৎ ॥ আবীম্মাম্। আবীদ্বক্তারম্ ॥ ॥ ওঁম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ওঁম্ ॥ ॥ * ॥ ওঁম্ হরিঃ ওঁম্ ॥ * ॥ ইতি ভৃগুবল্লী তৃতীয়াধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥ ৩ ॥